আনন্দীর গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে গুল বাহাদুর ভাবলেন, এসব জাত-বেজাত আর তাদের ফ্যাচাঙ-ফেউ শিখতেই তো যাবে একটা আস্ত জীবন। তা আর কী করা যায়, অন্য কোনও পন্থা যখন আর নেই। আরব্য উপন্যাসের জিনও তো বোতলের ভিতর বন্ধ হয়ে কাটিয়েছিল তিনশো না চারশো বছর। পরমাত্মার কৃপায় তবু তো তিনি মুক্ত অন্তত বোতলের জিন্নির তুলনায়।
দূরের শালবনের ফাঁকে কে যেন ছোট্ট একটি আগুন জ্বালিয়েছে। না, সূর্যঠাকুর ঘুম ভেঙে চোখ কচলে কচলে লাল করে ফেলেছেন। আকাশে চাঁদের আলো কখন মিলল, সূর্যের আলো দেখা দিল তিনি লক্ষই করেননি। পূর্ব থেকে একটুখানি ঠাণ্ডা বাতাস এগিয়ে চলেছে পশ্চিমপানে দেবতার পায়ে পেন্নাম করতে। কিন্তু এ দেবতা বড়ই জাগ্রত বদমেজাজি পীর। ভক্তকে অভ্যর্থনা জানান ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করে। পুব-বাঙলা থেকে বেরিয়ে আসা এই তীর্থযাত্রী পূরবিয়া হাওয়াকে তিনি আদর করে গায়ে মাখেন না, উল্টো ছেড়ে দেন পচছিমিয়া গরম বাতাস। আল্লাওয়ার্দী খানের আমলের মারাঠা দস্যুর মতো তারা পশ্চিম দিগন্ত থেকে আসে ঝড়ের মতো হু হু করে, ঘোড়ার খুরে বালি পাথর শুকনো পাতার হাজারো দ জাগিয়ে দিয়ে। একেবারে আকাশজোড়া নিরন্ধ্র, তমসাঘন, সূর্যাচ্ছাদিত একচ্ছত্রাধিপত্য।
দানিশপুর গাঁ ডাইনে রেখে চিকনকালা যেতে হয়। সে গাঁয়ের বাইরে আসতে-না-আসতেই গাড়ির উপর হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ল চৌষট্টি পবন মারাঠাদের চৌষট্টি হাজার হর্সপাওয়ার নিয়ে।
সামাল সামাল বলতে-না-বলতেই, গরু, গাড়োয়ান, গুল বাহাদুর খান কারও কোনও খবরদারি হুশিয়ারির তোয়াক্কা না করে গাড়ি ঢুকল দানিশপুর গাঁয়ের ভিতর। তার পর বাঁ দিকে চক্কর খেয়ে শিমুল পলাশ মহুয়ার আড়ালে এক আঙ্গিনায় গিয়ে ছিটকে ফেলে দিল আনন্দী, গুল বাহাদুর, গণি মিয়া মায় দুটো গরুকে একে অন্যের ঘাড়ে। মায়ের সুপুতুর যে রকম বস্তা বস্তা চাল ডাল নুন চিনি আঙ্গিনায় আছাড় মেরে হুঙ্কার দিয়ে কয়, দেখ মা, তোমার জন্যে কী এনেছি। কোথায় লাগে এর কাছে পঞ্চ-পাণ্ডবের দ্রৌপদীকে বাড়ি এনে মাতা কুন্তীকে আনন্দসংবাদ জানানো!
চতুর্দিকে আকাশ-বাতাসে তখন লাল ধুলো-বালির ভূতের নৃত্য। ঝড়টা এমনি অসময়ে এবং অতর্কিতে এসে আক্রমণ করেছে যে ধূর্ত বায়সকুল পর্যন্ত আশ্রয় নেবার ফুরসত পায়নি। সেই ঝড়ের তীব্র সিটির শব্দের ভিতরও ক্ষণে ক্ষণে ভেসে উঠছে তাদের তীক্ষ্ণ মরণাহত আৰ্তরব।
গুল বাহাদুর সবকিছু ভুলে উল্লসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, শাবাস, শাবাস! একেই বলে আক্রমণ; একেই বলে হামলা। বিলকুল বে-খবর এসে বে-এক্তেয়ার করে দিল দুশমনকে।
গুরুদুটো গাড়ি থেকে খালাস করে আনন্দীকে কোলে করে আঙ্গিনায় অন্য প্রান্তরে কুঁড়েঘরের দাওয়াতে উঠতেই গুল বাহাদুরের চোখে পড়ল আরেক ঝড়। ঝড়েরই বেগে ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্গিনায় এল এক রমণী। শাড়ির এক অংশ কোমরে বাঁধা, দীর্ঘতর অংশ সোজা উঠে গেছে আকাশের শূন্যে, মাথার চুলও উঠেছে আকাশের দিকে তালগাছের সক্কলের উঁচু পাতাটার মতো ঢপ নিয়ে। তার বগলে একটি ছোট্ট ছাগলের বাচ্চা। এই লালচে অন্ধকারের ভিতরও গুল বাহাদুরের নজরে পড়ল ছাগলবাচ্চাটার দুটো ভয়ার্ত চোখ। আর, আর তার পাশে, একে অন্য থেকে বেশ দূরে আরও দুটি লাল-কালো চোখ। মেয়েটি আসমান থেকে শাড়ি নামিয়ে বুক ঢাকার চেষ্টা না করে সোজা উঠল ঘরের দাওয়ায়। ঝটাৎ করে শিকলি খুলে ঘরের ভিতর ঢুকে এক লহমার তরে দরজা ফাঁক করে ধরল। এহেন প্রলয়নৃত্যের ওক্তে আপ যাইয়ে, আপ বৈঠিয়ে বলে কে? পেছন থেকে গণির বেধড়ক ধাক্কা খেয়ে গুল বাহাদুর পড়লেন মেয়েটার উপর। সে চোট না সামলাতে পেরে পড়ে যাচ্ছে দেখে তাকে জাবড়ে ধরলেন দু হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে। মেয়েটা আ মর মিনষে ওই ধরনের কী যেন একটা বলল। ইতিমধ্যে গণি মিয়া কোনও গতিকে দরজাতে হুড়কো দিয়ে ফেলেছে।
ভিতরে ঘোরঘুট্টি অন্ধকার। শুধু চালের সঙ্গে যেখানে মাটির দেয়াল লেগেছে তারই ফাঁক দিয়ে কেমন যেন একটা লাল আভা দেখা যাচ্ছে গায়ে আগুন লাগলে রাতের বেলা অন্ধকার ঘরে যে রকম বাইরের আগুনের আভাস পাওয়া যায়, বিদ্যুৎ ঝলমল করে উঠলে সক্কলের মুখের উপর সোনালি আবীর মাখিয়ে দেয়।
একটা মোড়া ঠেলে দিয়ে রমণী বলল, বস গোসাঁই। গণি এক কোণে চ্যাটাইয়ের উপর বসেছে। আনন্দী গুল বাহাদুরের হাঁটু জড়িয়ে ধরে ভীত নয়নে এ-দিক ওদিক তাকাচ্ছে।
গুল বাহাদুর দিল্লি শহরে বিস্তর খাপসুরৎ রমণী দেখেছেন। খাঁটি তুর্কি মেয়ের ড্যাবডেবে চোখ, খানদানি পাঠান মেয়ের ধনুকের মতো জোড়া ভুরু, নিকষ্যি কুলীন ইরানি তম্বঙ্গীর দোলায়িত দেহসৌষ্ঠব, এমনকি প্রায় অমিশ্র আর্যকন্যা ব্রাহ্মণকুমারীর সরল বুদ্ধিদীপ্তশান্তসৌন্দর্য তিনি বহুবার দেখেছেন, কিন্তু আজ যে রমণী তাঁর সামনে আধা আলো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তার লাবণ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ সৌন্দর্য ছ শো বছরের মিশ্রণের সওগাত। এর গায়ের রঙ এদেশের কচি বাঁশপাতার সবুজ দিয়ে আরম্ভ, তাতে মিশে গিয়েছে পাঠান-মোগলের কিঞ্চিৎ তাঁবা-হলুদের রঙ। চুল ইরানিদের মতো কালো হয়ে গিয়ে যেন নীলের ঝিলিক পড়েছে। কিন্তু তার আসল সৌন্দর্য তার আঁটসাঁট গড়নে সাঁওতাল মেয়ে দেখে যেমন মনে হয় এর দেহ তৈরি হয়েছে গয়ার কালো পাথর দিয়ে। পেটে-পিঠে কোনও জায়গায় একচিমটি ফালতো চর্বি নেই। আলগোছে কোমরে জড়ানো এর শাড়ির আঁচল কোমরটিকে যা ক্ষীণ করে দিয়েছে দিল্লির তৰঙ্গী তার ইজের-বন্ধ কষে বাঁধলেও এ ক্ষীণ কটি পেত না।
