গুল বাহাদুর বললেন, তুমি যে বলেছিলে বাঙলাতে কিছুই নেই। কিন্তু ভূতের ওপর মামদোবাজি তত খাসা প্রবাদ।
ঘোষাল গম্ভীর হয়ে বললেন, একেবারে কিছু নেই সে-কথা বলবে কে? একটা জিনিস আছে সেটি মহা মোক্ষম। বাঙলার কেত্তন। হরিবোল, হরিবোল বলে নাচন-কুদন নয়। পদকীর্তন। ওর মতো জিনিস হয় না। ঝাড়া পাঁচশো বছর ধরে হাজার হাজার বাঙালি তার প্রেমের গীত আপন গলায় গায়নি– গেয়েছে রাধার গলা দিয়ে, কিংবা কৃষ্ণের বাঁশির ভিতর দিয়ে। ফারসিতে প্রেমের গান গাওয়া হয়েছে লায়লী-মজনু, শীরীন-ফরহাদ, ইউসুফ-জোলেখার ভিতর দিয়ে দেখতেই পাচ্ছ, বিস্তর বখরাদার, ভাগের মা গঙ্গা পায় না, প্রেমটা তেমন জমজমাট ভরভরাট হয়নি। তাই কীর্তনে পাবে ঠাসবুনোট। তার গোড়াপত্তন হয় এইখানেই, এই কেঁদুলীতেই– তবে সংস্কৃতে। জয়দেবের গীতগোবিন্দে। আমি শুনেছি। বিশেষ ভালো লেগেছে, বলতে পারব না। বড় কথার ঝলমলানি। আমি সংস্কৃত বুঝিও না। কিন্তু বাঙলায় পেয়েছে ওই বস্তুই তার আসল খোলতাই। হ্যাঁ, মনে পড়ল, মুসলমান কীর্তনীয়াও বিস্তর আছে। তারই একজন আমাদেরই পাশের সৈয়দ মরতুজা।
গুল বাহাদুর এ নামটি ভালো করে মনে রেখেছিলেন, শিবু মরার সময় তাকে বলে গিয়েছিল বলে। বললেন, এর নাম শুনেছি শিবুর কাছে। তারই কে যেন কী– আনন্দী তাঁর নাম, তার মেহেরবানিতে পেয়েছিল বলে শিবুর ছেলের নাম আনন্দী।
ঘোষাল বললেন, তাই বল। আনন্দ নাম হয়, কিন্তু ডোমপাড়াতে আনন্দী নামের হদিস আমি এতক্ষণ পাইনি। তা সে-কথা পরে হবে। এখন শোন, এই কেত্তন গান বোষ্টমদের জান-প্রাণ। আমাদের চণ্ডীমণ্ডপে প্রায়ই হয়। তুমি এলে কেউ কিছু ভাববেই তো না, উল্টো তোমার গোসাইগিরি আরও ফলাও হয়ে ফুটে উঠবে।
গুল বাহাদুর একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, আমি তো ওসবের কিছুই জানিনে।
জানবে আবার কী? বসে বসে মাথা নাড়বে, আর মাঝে মাঝে আহা-হা করে উঠবে। তোমাকে তো আর গাইতে হবে না। মুসলমানদের কাওয়ালিতে যখন হিন্দু হমূদ্ ও নাৎ (আল্লা রসুলের প্রশস্তি) শুনতে যায়, তখন তারা সে গীতে পো ধরে নাকি? বেন্দাবনের বাবাজি বসে আছেন, ওই তো ব্যস্। আর হজরত মুহম্মদই তো বলেছেন, মূখের উপাসনা অপেক্ষা গুণীর নিদ্রা শ্রেয়ঃ। কেত্তন চলে অনেক রাত অবধি। ভালো কেত্তনীয়া হলে তো কথাই নেই- ভোর অবধি। কথাবার্তা তখন হবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ঘোষাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আর কীই-বা আছে কথাবার্তা বলার।
এ রকম নৈরাশ্য গুল বাহাদুরের সয় না। বললেন, অত কাতর হয়ো না বাবুজি। আল্লার ওপর একটু বিশ্বাস রাখতে শেখ।
ঘোষাল হেসে বললেন, আমি তো বিশ্বাস রাখি গোসাই, কিন্তু আল্লা যে আমাকে বিশ্বাস করলেন না। গদরের মেওয়া তো আমার কোঁচড়ে ফেললেন না। আচ্ছা এখন তবে আসি।
গুল বাহাদুর ফার্সিতে চাপান বললেন,
দুঃখ করো না, হারানো ইউসুফ
কিনানে আবার আসিবে ফিরে।
ঘোষাল ওতর হাঁকলেন,
দলিত শুষ্ক এ মরু পুনঃ
হয়ে গুলিস্তা হাসিবে ধীরে ॥
কেঁদুলী থেকে ডুবসাঁতারে চিকনকালা গায়ে পৌঁছানো যায়। সন্ধ্যার সময় গরুর গাড়িতে উঠে দোলানি-ঝাঁকুনির ভিতর নিদ্রা– সকালবেলা চিকনকালা। সন্ধ্যার সময় চাঁদ থাকবে পায়ের দিকে, ঘুম ভাঙলে দেখবে, তিনিও ডুবসাঁতার মেরে চিকনকালা গাঁ পেরিয়ে পশ্চিমাকাশে ডুবুডুবু।
গুল বাহাদুর ভেবেছিলেন, সন্ধ্যার সময় রওনা দেবেন, কিন্তু ঘোষালের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করে যখন রওনা হলেন তখন রাত প্রায় কাবার। দিনের বেলা গরমে গরু দুটোর কষ্ট হবে, কিন্তু গাড়োয়ান গণি মিয়া বলল, বরঞ্চ দুপুরে গরমটা গাছতলায় কাটানো যাবে, কিন্তু এখানে থাকা নয়, ওলা বিবির দয়া হয়েছে, অর্থাৎ কলেরা আরম্ভ হয়েছে।
ওলা বিবি! সে আবার কী! গণি মিয়া পণ্ডিত নয়, তাই ঘোষালের মতো এককথায় সবকিছু বলে দিতে পারল না। অনেক সওয়াল করার পর বেরুল, শেতলা-মনসার মতো ইনি ওলাওঠার দেবী কিংবা বিবি। কিন্তু আর সব দেবী যখন হিন্দুর মৌরশি পাট্টা, তখন ইনিই-বা মুসলমানী হয়ে বিবি খেতাব নিলেন কেন?
গুল বাহাদুর জানতেন না, বাঙলা দেশ তাজ্জব দেশ! ভাগ্যিস তিনি তখনও দখিন বাঙলায় যাননি। সেখানে তা হলে আলাপ-পরিচয় হত জলের দেবতা বদর পীরের সঙ্গে, বড়মো ওরফে বাঘের দেবতা গাজী পীরের সঙ্গে।
এই ঘোষালের সঙ্গেই আলাপ করে তিনি যত না শিখলেন তথ্য, তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন। যথা,
এ দেশের খানদানিরাও কিছু কিছু তা হলে গদরে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু প্রশ্ন, সে কি শুধু বাঙলা দেশের বাইরে? দেশের ভিতর অন্য খানদানিদের মতিগতি তা হলে কী? তারা যদি ইংরেজকে এদেশ থেকে খেদাতে না চায় তবে তো কোনওকিছু করা অসম্ভব, কারণ তারা যদি নেতৃত্ব না নেয় তবে ডোম-চাড়ালেরা কি আপন হিম্মতে নয়া গদরের তাজা ঝাণ্ডা উঁচু করতে পারবে? তারপরের প্রশ্ন, এই খানদানি অর্থাৎ বামুন এবং চাড়ালদের ভিতর কি অন্য কোনও সম্প্রদায় নেই? দিল্লিতে যে রকম ব্রাহ্মণ আর বেনের মাঝখানে আছে ক্ষত্রিয়রা? দিল্লির ব্রাহ্মণ আর এখানকার ঘোষাল ব্রাহ্মণেই-বা মিল কোথায়? দিল্লির বামুনরা তো করে স্রেফ পুরুতগিরি, এ বামুন তো একদম আগখুর অর্থাৎ আগুন-গিলনেওলা। কিন্তু মারাঠি ব্রাহ্মণ পেশওয়ারাও তো পুরুতগিরি করে না। তবে কি তারা হাতিয়ার নেয়, না শুধু আড়ালে বসে কল-কাঠি নাড়ে?
