গুল বাহাদুর বললেন, তাই বোধহয় রাজা রামমোহন আমাদের ইংরেজি শেখাতে চান।
ঘোষাল গোসসাভরে বললেন, কচু হবে ইংরেজি শিখে। যেন ইংরেজি চিঠি জাল করতে পারলেই আমরা গদর জিতে যেতুম। যেন কাঠবিড়ালির ধুলো না হলে থাক্ গে– ওসব কেচ্ছা তুমি জান না।
চাঁদ অনেকখানি ঢলে পড়েছে। বাউলদের গীতও ঝিমিয়ে এসেছে।
নদীর জলের রুপোলি ঝিকিমিকি লোপ পেয়েছে, কিংবা সরে গিয়েছে। ওপার থেকে পাড়ি দিয়ে একটা দমকা হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস দু-জনার ভিতর দিয়ে চলে গেল। কিংবা হয়তো গদরেরই দীর্ঘশ্বাস, হায় হায় আফসোস্।
গুল বাহাদুর বললেন, যাক্। তবু ভালো। আমি তো শুনেছিলুম, কুমার সিং সত্যি আত্মসমর্পণ করে ইংরেজকে চিঠি লিখেছিলেন। সেগুলো তা হলে জাল!
ঘোষাল হেসে বললেন, সবকটা জাল হতে যাবে কেন? কিছু সত্যিও ছিল।
গুল বাহাদুর আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে কী?
নিশ্চয়। যখন দেখলুম, ইংরেজ চিঠি চালাচ্ছেই, তখন আমরাও ইংরেজকে দু-চারখানা লিখে পাঠালুম। নানারকম ভুল খবর দিয়ে। নিছক ধাপ্পা মারার জন্য। ঝাসিও তাই করেছিলেন।
কিন্তু এতে করে যে পরে দেশের লোকের মনে ভুল ধারণা হল, কুমার সিং সত্যি সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। সে ভুল ধারণা সরাবে কে?
দেখ বাবাজি, গদর জিতলে এ ভুল ধারণা থাকত না। আর হারলে তো গাল খাবই। তখন কাজ ছিল লড়াই জেতা। তার জন্য যা প্রয়োজন তাই করেছি। হেরে গিয়েছি সেইটে হল সবচেয়ে বড় গাল। তার ওপর এ-বদনাম তো বোঝার উপর শাকের আঁটি। এবং তার চেয়েও বড় কথা, পকড়ে তলওয়ার দামনকো সম্হালে কোঈ? তলোয়ার নিয়ে হামলা করার সময় রক্তের ছিটে পড়ার ভয়ে কেউ তো কুর্তার অঞ্চল সামলায় না– অর্থাৎ একবার মনস্থির করবার পর ছোটখাটো চিন্তা করতে নেই।
গুল বাহাদুর বললেন, সে তো বিলকুল ঠিক। কিন্তু, ইংরেজ আপনার সন্ধান পাবে কি না, সে-ও কি ওই পর্যায়ের?
ঘোষাল বললেন, প্রায় তাই। কিন্তু আসলে কী জানো, বাবাজি, বেঁচে থাকার ওপর আমি খুব বেশি দাম দিইনে। এই গদরে চলে গেল মানুষগুলো, আর বেঁচে রইল যারা, তাদের আমি দোষ দিইনে, কিন্তু তাদের নিয়ে আমি করব কী? ঝড়ে মোটা আমগুলো ঝরে পড়ে সে তো জানা কথা। আমি নিজে অত্যন্ত সামান্য প্রাণী কিন্তু ওই মহাজনদের সম্পর্কে এসে আমি কয়েক দিনের জন্য কী যে হয়ে গিয়েছিলুম তোমাকে বোঝাই কী প্রকারে? আমি যেন রোগা-পটকা হাড্ডিসার গঙ্গাযাত্রায় জ্যান্ত মড়া হয়ে যাচ্ছিলুম উদ্ধারণপুরের ঘাটে। আমার ঘাড়ে এসে করল ভর এক উড়োনচণ্ডী দানো। আমি উঠলুম লম্ফ দিয়ে, মড়ার খাঁটিয়া ছেড়ে, আর তার পর সে কী তিড়িংবিড়িং ভূতের নৃত্য করলুম কদিন। তখন আমি সব জানি, সব পারি। ওই আনন্দী ছেঁড়াটা তখন যদি আমাকে আব্দার করত, দাদু বেহেস্ত থেকে এনে দাও না আমাকে খুদাতালার কুর্সিখানা, আমি তা হলে একগাল হেসে বলতুম, রঃ। উঁড়া! এনে দিচ্ছি, এ আর এমন কী চাইলি? তার পর দিতুম এক আকাশ-ছোঁয়া লক্ষ। স্বপ্নে যেরকম মানুষ মিন-পাখনায় পায়ের কড়ে আঙ্গুলে অল্প একটু ভর দিলেই হুশ করে উড়ে গিয়ে ঠুকে যায় তার মাথা চাঁদের বুড়ির চরকাতে।
জানো বাবাজি, এ যেন স্বপ্নের মাঝে সম্ভব-অসম্ভবের সীমানা পেরিয়ে আল্লার পায়ের কাছে ফেরেশতা বনে যাওয়া। আর আমার চতুর্দিকে কুমার সিং আর তার সঙ্গী-সাথী। কী সব বাঘ, কী সব সিংহ। আমরা যেন সবাই, অন্ধ-প্রদীপ। আপন আপন সেজে পলতের মতো পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছিলুম। এল কুমার সিংয়ের দীপ্ত দীক্ষা। তার আলো আমাদের এক-একজনকে স্পর্শ করে, আর আমরা প্রদীপশিখার মতো জ্বলে উঠি। আবার আমাদের শিখা জ্বালিয়ে দেয় অন্য প্রদীপ। তাই বলছিলুম, এ তো দীপ্ত-দীক্ষা— এ তো স্পর্শদীক্ষা নয়, সে তো সামান্য জিনিস। পরশপাথরের স্পর্শ লেগে লোহা হয় সোনা, কিন্তু সে সোনা তার পরশ দিয়ে অন্য লোহাকে সোনা করতে পারে না, তাই তার নাম স্পর্শ-দীক্ষা, তার মূল্য আর কী?
সে কী দেয়ালি জালিয়েছিলুম আমরা।
আর আজ, অন্ধকার, অন্ধকার– সব অন্ধকার।
হঠাৎ বলা-নেই, কওয়া নেই, ঘোষাল দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁটুতে মাথা খুঁজে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলেন।
গুল বাহাদুর স্তম্ভিত। বয়স্ক লোক, বিশেষ করে ঘোষালের মতো কট্টর গদর-প্রাণ লোক যে এরকম বে-এক্তেয়ার হয়ে যেতে পারে, তিনি তার জন্য তৈরি ছিলেন না। গুল বাহাদুর তখনও জানতেন না, বাঙালি কতখানি দরদী, ভাবালু, অনুভূতিপ্রবণ।
তিনি চুপ।
ঠিক যে রকম হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন সেই রকমই হঠাৎ মাথা তুলে হেসে বললেন, কিন্তু আমাকে ধরিয়ে দেবে সেই ইংরেজেরই ভূত। বলে ডান হাতখানা নাকের কাছে এনে বার দুই কে বললেন, তৌবা, তৌবা, এখনও গন্ধ বেরুচ্ছে।
পূর্বের মতো গুল বাহাদুর মমতামাখা সুরে বললেন, আমিও পাচ্ছি।
ঘোষাল উৎসাহিত হয়ে বললেন, তবেই বোঝ ঠ্যালা। ওই ইংরেজ ব্যাটার ভূত এসে ভর করেছে আমার পাঁচ আঙুলে। তারই বোটকা গন্ধ ডেকে আনবে আর পাঁচটা ইংরেজকে, ধরিয়ে দেবে আমাকে। না হলে কে জানবে বীরভূমের ঘোষাল আরা জেলার মহব্বত খান! ভূতই শুধু সব-কিছু জানতে পারে।
গুল বাহাদুর বললেন, ইংরেজ মাত্রই জ্যান্ত ভূত। মরে গিয়ে তার আর হের-ফের হয় না।
ঘোষাল একেবারে ছেলেমানুষের মতো আরও যেন উৎসাহ পেয়ে বললেন, যা বলেছ গোসাই। হিন্দু মরে গিয়ে হয় ভূত, মুসলমান মরে গিয়ে হয় মামদো। কথায় কয়, ভূতের। ওপর মামদোবাজি। অর্থাৎ হিন্দুর ওপর মুসলমানের কেরানি। কিন্তু মামদোর ওপর অন্য ভূত কই? সেরকম কোনও প্রবাদ তো এখনও হল না। তা হলে বাহাদুর শা-র ওপর শেষ পর্যন্ত উপর-চাল মারতে পারবে না তো ইংরেজ। বাবাজি, তোমারই জিৎ। জিন্দাবাদ বাহাদুর শাহ।
