গুল বাহাদুর শুধালেন, আপনারা হেরে গেলেন কেন?
ঘোষাল হাতজোড় করে বললেন, ওই একটি প্রশ্ন শুধিয়ো না। এর উত্তর দিতে গেলে আবার নতুন করে সেই মর্মন্তুদ পীড়ার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, যা ভুলতে পারা একটা জীবনের কর্ম নয়। কোন কোন ভুল না করলে আমরা জিতে যেতুম সে প্রশ্নও তুলো না। আমি নিশ্চয়ই জানি, সে ভুলগুলো না করলে পরে অন্য ভুল করতুম। না বাবাজি, গলদের মূল উৎস কোথায় ছিল তখনও বুঝতে পারিনি, এখনও পারিনি। আমরা এখানে পাথরচাপা দিয়েছি তো ওদিক দিয়ে জল বেরিয়েছে, সেখানে পাথরচাপা দিয়েছি তো অন্য দিক দিয়ে বেরিয়েছে। সর্বাঙ্গে ঘা, মলমফ লাগাই কোথায়?
এখন তবে কর্তব্য কী?
ঘোষাল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, বিলকুল কোনও ধারণা নেই। এখনও মনে মনে জমা-খরচ মিলাচ্ছি। তুমি এসেছ, ভালোই হয়েছে। দিল্লি ফিরে যাচ্ছ না তো?
প্রশ্নটা যেন নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে জিগ্যেস করা হল। ঘোষালই জানতেন এর উত্তর। গুল বাহাদুরও কোনওকিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলেন না।
ঘোষাল বললেন, ছদ্মবেশটা মন্দ ধরনি। বাঙলাটাও খুব যে মন্দ শিখছ তা-ও নয় কিন্তু ডাহা ডোম-ডুমে। এই বেলা ওটাতে লেখা-পড়াও আরম্ভ করে দাও। নিজেই করে নিতে পারবে। কোনও ভাবনা নেই। ওতে সাহিত্য বলে কোনও বালাই নেই। আশ্চর্য, সাতশো না আটশো বছর ধরে বাঙলাতে বই লেখা আরম্ভ হয়েছে অথচ একগণ্ডা কবি বেরোয়নি যাদের ইরানি কবিদের সামনে দাঁড় করানো যায়। ফারসিতে তিনশো বছর যেতে-না-যেতেই ফিরদৌসি, হাফিজ, সাদি, রুমি, আত্তার, নিজামি, আরও কত কে?
গুল বাহাদুর মৃদু আপত্তি জানিয়ে বললেন, বাঙালিরা হয়তো মনে করে, তাদের কবি হাফিজ-সাদির চেয়ে বড়।
ঘোষাল তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, তা করতে পারে। সাঁওতালরা হয়তো মনে করে, তাদের তীর-ধনুক নিয়ে বন্দুক-কামানের সঙ্গে লড়া যায়।
তুলনাটার ঢপ দেখে গুল বাহাদুর একটু হাসলেন।
ঘোষাল বললেন, হাসলে? তা হাস। আমারও বলার বিশেষ হক্ক নেই। আমিও তেমন কোনও চর্চাও করিনি। কিন্তু জানো, সাতশো বছর বাঙলা চর্চা করার পর তারা গদ্য লিখতে আরম্ভ করেছে এই মাত্র সেদিন। পঞ্চাশ বছরও হয়নি। ওই যে রাজা রামমোহন রায়
গুল বাহাদুর চমকে উঠে বললেন, কে?
রাজা রামমোহন রায়। চেন না কি?
গুল বাহাদুর বললেন, হ্যাঁ, আমার পিতার কাছে শুনেছি, বাদশাহ দুসরা আকবরের চিঠি নিয়ে তিনি বিলেত গিয়েছিলেন। আমি তো শুনেছি, উনি জানতেন অতি উত্তম ফারসি এবং আরবি।
ঘোষাল বললেন, তা তিনি জানতেন। এদেশের মুসলমান পণ্ডিতরা তাঁকে নাম দিয়েছেন জবরদস্ত মৌলবি। তার পর একটু অবজ্ঞার সুরে বললেন, লোকটা মৌলবিই বটে। ধর্ম সম্বন্ধে বই লেখে। ফারসিতে একটা লিখেছে। আমার কাছে বোধহয় এখনও আছে। কিন্তু ধর্মে আমার রুচি নেই। তাতে কিছু এসে-যায় না। কিন্তু তাজ্জব কি বাৎ, লোকটা দেশের সবাইকে ইংরেজি শেখাতে চায়।
সে কী?
আশ্চর্য! আরবি-ফারসির রস চেখেছে, শুনেছি ইবরানি সুরয়ানি ইস্তেক (হিব্রু, সিরিয়া) জানে– তার পর এই রুচি! ইংরেজ ব্যাটারা তো পায়খানা ফিরে জল পর্যন্ত থাক্ গে। জানো বাবাজি, এক ব্যাটা ইংরেজের সঙ্গে আমাকে একদিন নিতান্ত বাধ্য হয়ে হাত-নাড়ানাড়ি করতে হয়েছিল। হাতে যেন এখনও গন্ধ লেগে আছে। বেসন দিয়ে কত মেজেছি, ঝামা দিয়ে তার চেয়েও বেশি ঘসেছি।
বলে ডান হাতখানা অতি সন্তর্পণে নাকের ইঞ্চি তিনেক সামনে ধরে দু বার কে বলে উঠলেন, তৌবা তৌবা! এখনও গন্ধ বেরুচ্ছে।
গুল বাহাদুর সহানুভূতির সুরে বললেন, আমিও পাচ্ছি। তা ওই অপকর্ম করতে গেলেন কেন?
সাধে? ওই করে তো সম্বন্ধীকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে আর পাঁচজনের চোখের আড়াল করলুম। ঘোষাল চুপ করে গেলেন।
গুল বাহাদুর শোধালেন, তার পর?
ঘোষাল দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উদাস সুরে বললেন, তার পর কে কোথায় যায় সে তো আল্লাই জানেন। কেউ যায় বেহেস্তে, কেউ যায় দোজখে, কেউ যায় বৈকুণ্ঠে, কেউ যায় কৈলাসে।
সে আবার কোথায়?
বাবাজি, ধরা পড়ে যাবে। বৈকুণ্ঠটা কোথায় সেটা অন্তত তোমার জানা উচিত। বাবাজিরা মরে গেলে বৈকুণ্ঠে যায়– নামাবলীর কার্পেট পেতে তারই উপরে বসে। আরব্য রজনীতে যেরকম আছে। কিন্তু থাক ওসব। ধর্মে আমার রুচি নেই– তোমাকে তো বলেছি।
অনেকক্ষণ পর গুল বাহাদুর শুধালেন, ইংরেজ মেরেছেন; ইংরেজ আপনাকে তালাশ করছে না?
তা করছে, কিন্তু আমি ইংরেজ মারলুম কখন?
গুল বাহাদুর আশ্চর্য হয়ে বললেন, এই যে বললেন।
তাজ্জব বাৎ শোনালে! অমি বেটাকে নিয়ে গেলুম যেখানে তার বরাতে লেখা ছিল যাবার। তার পর আমাদের সেপাইরা তাদের কাজ করল। আমি কি জল্লাদ?
আপনি তবে কী করতেন?
আমি? আমার কাজ ছিল তাপ্পা, রিপুকর্ম। আজ বন্দুক নেই, জোগাড় কর। কাল বারুদ নেই, ঠ্যালা সামলাও। পরশু খোরাক নেই, আমার নাভিশ্বাস। আরও কত কী? লুঠের মাল বখরা করা, গায়ের লোককে মিথ্যে দিব্যি-দিলাশা দিয়ে তাতানো, চিঠি জাল করা
সে আবার কী?
ইংরেজের গুপ্তচর আমাদের সেপাইদের ভিতর জাল চিঠি পাচার করল, যেন সে চিঠি কুমার সিং ইংরেজকে লিখেছেন আত্মসমর্পণ করে, অবশ্য তার ধনপ্রাণ যেন রক্ষা হয় এই শর্তে। আমি তখন পাল্টা চিঠি জাল করাতুম, ইংরেজ আত্মসমর্পণ করেছে এই মর্মে। সেটা চালিয়ে দিতুম আমাদের সেপাইদের ভিতর। কিন্তু ইংরেজ সেপাইদের ভিতর ভিতর এরকম জালিয়াতি আমরা করতে পারিনি। অতখানি বাঢ়িয়া ইংরেজি লেখা জাল করনেওলা আমাদের ভিতর কেউ ছিল না।
