হঠাৎ খেয়াল গেল, আনন্দী বাউলদের অনুকরণে ধুতিটাকে লুঙ্গির মতো কোমরে বেঁধে এক হাত উপরের দিকে তুলে অদৃশ্য একতারা ধরে নাচছে। দিলেন এক ধমক। শিবুর কথামতো একে ভদ্রলোক না হয় না-ই বানালুম, কিন্তু একে কখনও বৈরাগী হতে দেব না।
কী রে আনন্দী, কী রকম আছিস?
গলা শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখেন–বাঙালি বাবু। লম্বা লিকলিকে চেহারা, গৌরবর্ণ, সরু বাঁকা নাক, বাদামি–প্রায় নীলরঙের দুটি হাসি-হাসি চোখ, উপরের ঠোঁটটি চাপা–নিচেরটি ডপকী হুঁড়িদের মতো একটু পুরুষ্টু এবং রস-ভরভর, পানের লাল না এমনিতেই লাল ঠিক বোঝা গেল না, একমাথা কোঁকড়া বাবরি চুল কিন্তু একেবারে রুক্ষ শুষ্ক, পরনে কটকি জুতো, ধুতি, মেরজাই আর কাঁধের উপর বীরভূমি কেটের চাদর।
বললেন, এই যে বাবাজি, ঝিঙের মুখে তোমার কথা শুনলুম।
গুল বাহাদুর অচেনার আগমনে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, বসুন। মনে মনে ভাবলেন, ঝিঙের মুখে? তবে কি শিবু কিছু বলেনি!
গদরের সেপাইদের মধ্যে একে অন্যকে পরিচয় দেবার জন্য গোপন সংকেত ছিল হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে শরীরের কোনও এক জায়গায় কেমন যেন আনমনে আস্তে আস্তে চক্কর কেটে যাওয়া– তারা যে গোল চাপাটি দিয়ে খবর পাঠাত তারই অনুকরণে। গুল বাহাদুর মাটিতে বসে তার আপন হাঁটুর উপর যেন বেখেয়ালে চক্কর আঁকতে লাগলেন।
বাবুটি চমকে উঠে আপনি হাঁটুতে একটা চক্কর একেই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, চল।
দু-জনা নদীপাড়ের বটগাছতলায় বসলেন।
পূর্ণিমা রাত্রি। সামনে, উঁচু পাড়ির অনেক নিচে অজয়ের ক্ষীণধারা। তার গতিবেগ প্রায় নেই। যেন মরা অজগর সাপ শুয়ে আছে। চাঁদের আলোতে তার আঁশ যেন চিচিক্ করছে। দু-একটি মেয়েছেলে সেই আঁশ যেন আঁজলা আঁজলা করে মাথায় মাখছে। তাদের কালো চুল থেকে ছোট ছোট ঝরনা চিক্ চিক্ করে পড়ছে। জলের ওপারে বিরাট বালুচরের আরম্ভ। তার পর কাশের ঝোঁপ, নিচু পাড়, যাত্রীদের আস্তানা সবকিছু চাঁদের আলোতে স্নান কুয়াশার হিমিকার গ্লানিতে মিশে গিয়েছে। মেলার কোলাহলকে শান্ত নদীর নৈস্তব্ধ্য এখানে গ্রাস করে ফেলেছে।
গুল বাহাদুর বললেন, জিন্দাবাদ বাহাদুর শাহ।
জিন্দাবাদ বাহাদুর শাহ। জিন্দাবাদ কুমার সিং।
কুমার সিং?
.
০৫.
অনেকক্ষণ ধরে দু-জনাই চুপ। একে অন্যের সঙ্গে এই তাঁদের প্রথম পরিচয়, কিন্তু বাহাদুর শাহ আর কুমার সিং যেন তাদের হাতে হাত, বুকে বুক মিলিয়ে দিলেন, যেন কত দিনকার পরিচয়। দীর্ঘ বিরহের পর মিলন হলে মানুষ যেমন একে অন্যের নিঃশব্দ সঙ্গসুখ প্রথমটায় শুষে নেয়, এদের বেলা তাই হল।
একবার কথা আরম্ভ হলে সে সুখ যেন ক্ষীণ হয়ে আসে।
গুল বাহাদুর বললেন, সব খতম!
সব খতম। কিন্তু আবার সব শুরু।
দু-জনায় আবার চুপ।
গুল বাহাদুর বললেন, আমি দিল্লি থেকে এসেছি। আমার নাম—
থাক। নামের প্রয়োজন হলে পরে শুধিয়ে নেব। আমি ঘোষাল।
গুল বাহাদুর বললেন, বুঝেছি।
আশ্চর্য হয়ে ঘোষাল শুধাল, কী করে?
শিবু বলেছিল। আমার কথা আপনাকে বলেনি?
না। বোধহয় সময় পায়নি।
গুল বাহাদুর আফসোস করে মনে মনে ভাবলেন, এরকম একটা বিচক্ষণ লোক চলে গেল। বেঁচে থাকে শুধু গাধা-খচ্চরগুলো।
ঘোষাল বললেন, শোন, আমার কথা সব বলি।
এবার ঘোষাল অতি বিশুদ্ধ উর্দুতে আপন বক্তব্য আরম্ভ করলেন।
আমি ছেলেবেলায় পালিয়ে যাই বেহারে। সেখানে অনেক জায়গায় কাজকর্ম করি– এমনকি ইংরেজের সঙ্গেও। শিউরে উঠ না। পরে বুঝবে। ওদের সঙ্গে কাজ না করলে আমি কখনও এরকম গভীরভাবে বুঝতে পারতুম না, এরা কী বজ্জাৎ, কী ধড়িবাজ। কিন্তু সেকথা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার দরকার এখন নেই। তুমি ফারসিতে যেসব বই পড়েছ, আমিও পড়েছি সেগুলোই। আমরা ব্রাহ্মণ কিন্তু আমাদের বংশে বহুকাল ধরে চলে আসছে ফারসির চর্চা। কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েলুম ইতিহাস চর্চার ফলে নয়। আমার পূর্বপুরুষরা পাঠানদের হয়ে মোগলের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন পূর্ব-বাঙলায়। হেরে গিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নেন, বীরভূমে। জাহাঙ্গীর, শাজাহান, ঔরঙ্গজেব ব্যস্– মাত্র এই তিন বাদশাহর আমলে বাঙলা পরাধীন ছিল, অর্থাৎ দিল্লির হুকুমমাফিক চলেছে। তার পর আমরা আবার সরকারি কাজ করেছি। তার পর এল ইংরেজ। পলাশী থেকে এই একশো বছর আবার আমরা বাড়ি থেকে বেরোইনি।
গুল বাহাদুর অনেক কিছুই জানতেন না। এই ন মাস ধরে তিনি চিনেছেন শুধু ডোম আর সাঁওতালদের। এদেশেও ব্রাহ্মণ আছে, এ কথা তিনি মোটামুটি জানতেন। কিন্তু তারা যে গদরে লড়ে এ খবর তার জানা ছিল না। দিল্লির ব্রাহ্মণেরা পরে চুড়িদার পাজামা, লম্বা শেরওয়ানি, আর মাথায় কিস্তিটুপি। তারা করে পুরুতের কাজ। বিয়ে-শাদিতে এসে মন্ত্রফ পড়ায়– তা-ও সে-মন্ত্র কাগজে লিখে আনে ফারসি হরফে। তারা আবার লড়াই করে কী করে? লড়াই তো করে রাজপুতরা, মারাঠারা, ক্ষত্রিয়রা। তা সে যাক গে। তাঁর মনে তখন লেগেছে আর এক ধোকা। শুধালেন, তোমরা কি শুধু বাঙলার স্বাধীনতা চাও? বাহাদুর শাহকে শাহ-ইন-শাহ বলে মানো না?
ঘোষাল বললেন, ওই তো আরম্ভ হয়ে গেল, হিন্দুস্থানবাসীদের ঝগড়া-কাজিয়া। এসব কথা পরে হবে। উপস্থিত দেখতে পাচ্ছ না, আমাদের ভিতর মিল বেশি, অমিল কম। যদি খুশি হও, তবে না হয় মেনেই নিলুম তোমার বাহাদুর শাহকে। কুমার সিংকে তো মেনেছিলুম। তোমাকেও মানছি। সবাইকে মেনে নেব– দরকার হলে এবং হবেও। তুমি কি মনে কর, আমরা জিতলে সেই পুরনো মোগলাই রাজত্ব আসবে– বাহাদুর শাহকে বাদশা করতে পারলেও? না বাবাজি, দেশের হাওয়া বদলাচ্ছে। বাবুর বাদশাহর মতো রাজত্ব বাহাদুর কখনও করেননি, আর কখনও কেউ পারবে না।
