কিন্তু একটা জিনিস সর্বক্ষণ গুল বাহাদুরের মনে পীড়া দিচ্ছিল। এই যে ছদ্মবেশ পরে আত্মগোপন করে থাকাটা, এভাবে কাপুরুষের মতো কতদিন প্রাণ বাঁচিয়ে থাকতে হবে? দেশ স্বাধীন করার জন্য একটা বড় আদর্শ সামনে ধরেছি বলে এই নীচ আচরণ সর্বক্ষণ হজম করে চলতে হবে? ডোমকে তাতানোর জন্য লুঠতরাজের লোভ কেউ দেখালে সেটা না হয় বরদাস্ত করে নিলুম কিন্তু নিজে একটা নীচ আচরণ করব–এ চেঁকি ঢোঁক গিলে হজম করি কী করে? তা-ও একদিন নয়, দু দিন নয়–কত বছর ধরে কে জানে?
চুলোয় যাক্ গে অত ভয়। চুলোয় যাক গে শিবুর হুশিয়ারির পরামর্শ। আমি বেরুব ঘোষালের সন্ধানে।
কিন্তু ইতিমধ্যে একটা কাজে ডুব না মারলে চিন্তা করে করে পাগল হয়ে যাব যে।
কাজও এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ল তার ঘাড়ে।
শিবুর খেতখামার ছিল সামান্যই কিন্তু গুল বাহাদুরের পক্ষে ওইটুকুই যথেষ্ট। সেসব সামলাতে গিয়ে তিনি প্রবেশ করলেন এক নতুন ভুবনে। এটা ধরলে ওটা হাতছাড়া হয়ে যায়, ছাগল দুটোকে সামলাতে গাইটা নাপাত্তা হয়ে যায়। মরাইয়ের ইঁদুর মারতে হলে বেড়াল পুষতে হয়, বেড়ালকে পেট ভরে খেতে দিলে সে আবার ইঁদুর মারার প্রয়োজন বোধ করে না। পচা গোবরের গন্ধে মাথা তাজ্জিম তাজ্জিম করে, অথচ সে গোবরের বরবাদ হবে তা-ও প্রাণ সইতে পারে না।
ইতিমধ্যে ঝিঙে এসে খবর দিল একপাল সাঁওতাল কোশখানেক দূর নদীপারে আস্তানা গেড়েছে। ওদের দিয়ে একটা নতুন আবাদ করানো যায় কি না।
গুল বাহাদুর লম্ফ দিয়ে উঠলেন। এ একটা কাজের মতো কাজ বটে। এ বিষয়ে তাঁর কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতাও আছে। ভাওলপুর না পাটিয়ালা কোথা থেকে একপাল মেয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল পালমে, যেখানে বাবুর শাহের পাথরের তৈরি সরাই– তারই পিছনে। তারই চাচা দানিশমন্দ খান তাদের দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটা সুন্দর আবাদ। চাচার সঙ্গে থেকে থেকে তিনি তখন শিখেছিলেন অনেক কিছু। আজ দেখা যাবে চাচাকা ভাতিজা সে এলেমের কিছুটা স্মরণ রেখেছে কি না।
কিঞ্চিৎ অর্থের প্রয়োজন। শিবুর কলসির তলায় পাওয়া গিয়েছে, শ-আড়াই টাকা। এত টাকা শিবু পেল কোথায়? তবে কি গুপ্তি ডাকাতি করত? তা আসুক সে টাকা জাহান্নাম থেকে। ওই দিয়ে আবাদ আরম্ভ করা যাবে অক্লেশে। তার পর বরাত। আল্লা ভরসা।
প্রথম দিনের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে গুল বাহাদুর আনন্দীকে সেলাম করে বললেন, হুজুর, আজ থেকে আপনি জমিদার। আপনাকে সমঝে চলতে হবে।
জমিদার হওয়ার রৌদ্ররস আনন্দী জানে না কিন্তু সে চালাক ছেলে। গুল বাহাদুরের মেজাজ আজ খুশ দেখে সে কোলের কাছে ঘেঁষে এসে বলল, দাদু, আমাকে কেঁদুলীর মেলায় নিয়ে যাবে?
গুল বাহাদুরের প্রাণ-যমুনায় তখন আনন্দের উজানতরঙ্গ লেগেছে। আনন্দী তখন শয়তানের জন্মভূমি বিলেত যেতে চাইলেও তিনি তখন ঘিনপিত বাদ দিয়ে সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন। শুধালেন, সে কোথায়?
বলল, অনেক দূরে। ওই হোথা অজয় দিয়ে।
.
শীতের শেষে অজয়ের পারে কেঁদুলীর মেলা। বাঙলা দেশের হাজার হাজার বাউল সেখানে জমায়েত হয়ে তিন রাত ধরে আউল-বাউল-কেত্তন গান গায়। কেনা-কাটাও হয় প্রচুর।
সেখানে গুল বাহাদুরের আরেক অভিজ্ঞতা।
এই যে হাজার হাজার ষণ্ডামার্কা লোক দিনরাত্তির ধেই ধেই করে নৃত্য করছে খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুমুচ্ছে, কোনও কিছু করছে কম্মাচ্ছে না, সমাজের তোয়াক্কা করে না, ধর্মের নামে অকাতরে গরিব-দুঃখীদের অনে ভাগ বসাচ্ছে, দরকারে অদরকারে একে অন্যে কামড়াকামড়ি পর্যন্ত করছে– এ তামাশা তৈরি করল কোন মহাজন? কার আদেশে এরা এসব করে, কার হুকুমে গৃহী এদের সব-কিছু জোগায়? এর কী অর্থ, কী মূল্য?
অথচ গুল বাহাদুরের চট করে মনে পড়া উচিত ছিল যে, মুসলমান পীর দরবেশরাও ঠিক এই কর্মই করে থাকে, তারই হীরের টুকরো দিল্লি শহরে– নিজামউদ্দীনের দরগায়, মেহেরৌলীর কুত্ত্বসাহেব, নাসিরউদ্দীন চিরাগ-দিল্লির আস্তানায়। সেখানেও তো বাউণ্ডুলে খোদার খাসিরা ঠিক এদেরই মতো ধেই ধেই করে নৃত্য করে। যিশুখ্রিস্টের ভাষায়, তারাও সুতো কাটে না, মেহন্নতও করে না। এবং তাই শুধু নয়, এখানকার এই বাউলদের ভিতর আছে মুসলমানও।
ছেলেবেলা থেকে আপন ধর্মে যেসব জিনিস গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে, সেগুলো একটু ভিন্ন বেশে দেখা দিলেই মানুষ চমকে ওঠে। তার পর হুঁশ হয়, দুটোই হুবহু এক বস্তু। এ-ও যা, ও-ও তা। কালীঘাটের পাঁঠা কাটাতে আর ঈদগার পাশে গরু জবায়ে তফাৎ কী? গুরুকে মাথায় তুলে তাকে অবতার বলা, আর পীরের পায়ে চুমো খেয়ে তাকে আল্লার নূর বলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া একই, একই, সম্পূর্ণ একই জিনিস।
গুল বাহাদুরের মনে যখন এ চৈতন্যের উদয় হয় তখন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, তাজ্জব মুলুক হিন্দুস্তান। এই এদের আমরা যুগ যুগ ধরে শিরতাজ, মাথার মুকুট করে পরে আসছি আর এদের মনের কোণে কণামাত্র উদ্বেগ নেই এদেশের লোকের ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমান নিয়ে। এদের কাছে আমরা সব মায়াবদ্ধ জীব (ফানি দুনিয়ার ক্রিমি), আমরা মরলেই কী, বাঁচলেই কী! ইয়া আল্লা মেহেরবান। তোমার কেরামতি বুঝে ওঠা ভার। এ সংসার থেকে মুক্তি পাওয়াই যদি মানব-জীবনের চরম আদর্শ হয় তবে এ সংসারে তুমি তাকে পাঠালে কেন?
.
