ফুল পাড়তে পাড়তে গুল বাহাদুরের মনে পড়ল, গুল অর্থাৎ ফুল আর প্রাচীন ফারসিতে অগ অর্থ জল গোলাপ আর জোলাব একই শব্দ। আরবি ভাষায় গ আর প নেই বলে আরবিতে গোলাপ লেখা হয় জোলাব। বিরেচক অর্থে। ছেলেটাকে তাই খাওয়ালেই হবে। কিন্তু এই অজ জায়গায় গোলাপ পাওয়া যাবে কি?
আনন্দীকে শুধালে বহুদূরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বোঝাল ওখানে পাওয়া যায়। কিন্তু যেভাবে ইশারা করল তাতে সে দূরের গ্রাম হতে পারে, বেহেশতের গুল-ই-স্তান, ফুলের বাগানও হতে পারে।
.
০৪.
এতক্ষণে গুল বাহাদুর আসলে ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার ফুরসত পেলেন। ছেলেটা নিশ্চিন্ত চেহারায় ঘুমুচ্ছে দেখে তিনি ফিরে গেলেন সকালবেলাকার ঠেলে রাখা সমস্যাগুলোতে।
শিবু মোড়ল বুঝতে পেরেছে তিনি বৈরাগী নন, তিনি যে মুসলমান সেটা জানত না। কিন্তু আর কেউ বুঝতে পেরেছে কি? আর ওই ঘোষালই-বা কে? সেই বর্ধমানের ওপারের লোকটাই-বা ওখানে এল কোথা থেকে? তাকেই-বা খুঁজে পাওয়া যায় কী করে?
অনেক চিন্তা করেও তিনি কোনও হদিস পেলেন না। এমনকি ঘোষাল পদবি যে ডোমের হয় না, ওটা ব্রাহ্মণের পদবি এবং অতএব কাছেপিঠে ব্রাহ্মণ পরিবার আছে, অর্থাৎ শিক্ষা-সভ্যতার পত্তনও আছে, এইটুকু পর্যন্ত গুল বাহাদুর বিচার করে ধরতে পারলেন না।
তবে শিবু যখন বলেছে সাবধান, তখন তার অর্থ তাড়াহুড়ো করলে বিপদের সম্ভাবনা। আর এখন তো বর্ধমান যাওয়ার কোনও কথাই ওঠে না। এ দেশের আচার-ব্যবহার এ ক মাসে শিখেছেন কতটুকুই-বা? ডোমদের ভালো করে চিনে নিতে পারলে পরে ডোম সেজে চলাফেরা করা যাবে। তার আগে শিখতে হবে ওদের ভাষা। এ-যাবৎ তাতেও তো খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
আর এই ডোমদের নিয়ে তিনি করবেন নতুন গদর। দেশ কী, রাজা কারে কয়, ইংরেজ যে শয়তান ভিন্ন অন্য কোনও প্রাণী নয়– এসব খবর তো এরা কিছুই রাখে না। পেটের ধান্দায় এদের কাটে সুবো-শাম। খুব যে তারা শান্ত এ কথা বলা চলে না, কিন্তু জীবন-মরণ পণ করে দিনের পর দিন লড়াই চালিয়ে যাবার মতো ধাতু কি এদের শরীরে আছে?
কিন্তু থাকবেই না কেন? গজনির মাহমুদ, ঘোরের মুহম্মদের আমলে গ্রামাঞ্চলের পাঠানরা কি এদের চেয়ে বেশি সঙ্গিন জঙ্গিলাট ছিল? কিংবা বাবুরের আমলে ফরগনা বদখশানের আশপাশের গামড়িয়ারা? কিংবা হাতের কাছের মারাঠারা? একবার কী একটা সামান্য গুজব রটাতে এই দিল্লিবিজয়ী বীরের দল দিল্লি থেকে যেন পালাবার পথ পায়নি। ঐতিহাসিক খাফি খান ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, তখন দিল্লির এক বুড়ি নাকি একাই তিনজন মারাঠাকে নিরস্ত্র করেছিল। ঐতিহাসিক খুশ হাল চন্দও বলেছেন, তারা নাকি তখন হাতিয়ার-তলোয়ার ফেলে দিয়ে ছোট বাচ্চার মতো মাগো, ওমা বলে শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল। কিন্তু এসব কাহিনীর বিশ্বাস করা যায় কতটুকু? দিল্লি একদিন এদের হাতে খেয়েছিল মার। সেই বেইজ্জতি ঢাকবার জন্য পরবর্তী যুগে হয়তো তিলকে তাল বানিয়েছে।
তা বানাক, আর না-ই বানাক, এরাই তো একদিন সাহস করে আবদালির মুকাবেলা করেছিল। অবশ্য লড়াইয়ের আগের রাত্রে মারাঠা সেনাপতি ভাবসাহেব আপন রোজনামচায় লিখেছিলেন, আমাদের পেয়ালা পূর্ণ হয়েছে। কাল অবশ্য-মৃত্যুর মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। আমরা মারাঠারা তো কখনও সম্মুখযুদ্ধ লড়িনি; আমাদের রণকৌশল, শত্রুকে অতর্কিতে আক্রমণ করে তার যথাসম্ভব ক্ষতি করে পালিয়ে যাওয়া বার বার। সর্বশেষে তার সর্বস্ব লুঠ করা।
এ সব-কিছু ভাবসাহেব সত্যই লিখেছিলেন কি না, সে কথা গুল বাহাদুর জানতেন না। তবে এ কথা জানতেন, মারাঠারা সম্মুখসংগ্রাম সবসময়ই এড়িয়ে চলে।
কিন্তু একথাও অতি অবশ্য ঠিক, ভাবসাহেব অবশ্য-মৃত্যু জেনেও আবদালির সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধই লড়েছিলেন। কেন লড়েছিলেন? পেশওয়ার হুকুমে। তাঁর প্রতি আনুগত্য বশ্যতার দরুন। তাঁর নুন-নেমক খেয়েছি। সে নুনের শেষ কড়ি শোধ না করে দেশের লোকের সামনে মুখ বের করব কী করে? কিন্তু দিল্লির বাদশার প্রতি বাঙালি ডোমের কী আনুগত্য, কী বশ্যতা?
তবে কি এদের তাতাতে হবে বাবুর কিংবা মাহমুদের মতো লুঠতরাজের লোভ দেখিয়ে? তার সরল অর্থ দিল্লির বাদশাহর খেদমত করতে গিয়ে তারা করবে দিল্লি লুঠ! এ তো চমৎকার ব্যবস্থা!
তখন বড় দুঃখে তার মনে পড়ল, গদরের সিপাহিরাও বেপরোয়াভাবে যত্রতত্র লুঠতরাজ করেছে। যাদের জন্য স্বাধীনতার সংগ্রাম লড়েছে, লুঠ করেছে তাদেরই। কী মূল্য সে স্বাধীনতার।
গুল বাহাদুরের মাথা গরম হয়ে উঠল। সুরাহির জল ঢেলে মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবলেন, যারা গদর ইনকিলাব করে তারা অতশত ভাবনা-চিন্তা করে না। তিমুর- নাদির বিজয়-অভিযান আরম্ভ করার পূর্বে বু আলী সিনা কিংবা আবু রুশদের দর্শন আর তর্কশাস্ত্রের কেতাব-পুঁথি নিয়ে বিদ্রি যামিনী যাপন করেন না।
ইংরেজ এ দেশের দুশমন, এ দেশের বাদশার দুশমন। তাকে খেদাতে হবে। কীভাবে তাড়াতে হবে তার জন্য মোল্লা-মৌলবির কাছ থেকে ফতোয়া আনবার প্রয়োজন নেই। তা হলে পাড়ার পদী পিসির কাছেও যেতে হয়। তিনি ইতু ঘেঁচুর পুজো-পাটা করে দিন-ক্ষ্যাণ বাৎলে দেবেন– তবে হবে অভিযান শুরু! তওবা, তওবা!! শয়তানের খুন পিনেওলা তলোয়ারকে পয়মন্ত করতে হবে চড়ুইপাখির ন্যাজের পালক দিয়ে!
