মুদি বলল, ভাললা হোক মন্দ হোক, আমার তো একটা আছে, তুই তো তাও জোটাতে পারলিনে।
অস্কার কান না দিয়ে বলল, ‘কিন্তু আর বিয়ার না। মা-মেরি সাক্ষী, পীর রেমিগিয়ুস সাক্ষী, কালা শয়তান ইভার সাক্ষী, আর বিয়ার না।’
অস্কারকে সকালবেলা যে কোনো মদ্য-নিবারণী সভার বড়কর্তা বানিয়ে দেওয়া যায়। সন্ধ্যের সময় বিয়ারের জন্য সে আল কাঁপোনের ডাকাতদলের সর্দারী করতে প্রস্তুত। আমি পকেট-ডায়েরি খুলে পড়ে বললুম, অস্কার, এই নিয়ে তুমি সাতাশীবার মদ ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করেছ।
অস্কার বলল, ‘যাঃ! তুই সাতাশী পর্যন্ত গুনতেই পারিসনে। ভারতবর্ষে অশিক্ষিতের সংখ্যা শতকরা সাতাশী। তুই তো তাদের একজন। ওখানে পাঠশালা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে বলেই তো এদেশে এসেছিস। দুই সাতাশীতে ঘুলিয়ে ফেলেছিস।
মুদির মা বলল, অস্কার চাকরি পেয়েছে আঠারো বছর বয়সে। সেই থেকে প্রতি রাত্রেই বিয়ার, ফি সকাল মদ ছাড়ার শপথ। এখন তার বয়স বাইশ। সাতাশীবার ভুল বলা হল।
অস্কার বলল, ঐ যাঃ! বেবাক ভুলে গিয়েছিলুম, আজ আমাদের কারখানার সালতামামী পরব—বিয়ার পার্টি। চাকরির কথায় মনে পড়ল। কিন্তু না, না, না, আর বিয়ার না। দেখো, ইন্ডার, আজ যদি পার্টির কোনো ব্যাটা আসে তবে তুমি ভারতীয় কায়দায় তাকে নরবলি দেবে।’
চাচা বললেন, আমি আজও বুঝতে পারিনে অস্কার এই পট্টিবাঁধা মাথা নিয়ে কী করে প্রেসিশন মেশিনারির কাজ করত। মদ খেলে তো লোকের হাত কাঁপে, চোখের সামনে গোলাপি হাতি দেখে। অস্কার এক ইঞ্চির হাজার ভাগের এক ভাগ তা হলে দেখতই বা কী করে আর বানাতেই বা কী কৌশলে? এত সূক্ষ্ম কাজ করতে পারত বলে তাকে মাত্র দু’ঘন্টা কারখানায় খাটতে হত। মাইনেও পেত কয়েক তাড়া নোট। তাই দিয়ে খেত বিয়ার আর করত দান-খয়রাত। দ্বিতীয়টা হরবকত। মৌজে থাকলে তো কথাই নেই, পট্টিবাঁধা অবস্থায় ও মোটরসাইকেল থেকে নেবে বুড়ি দেশলাইওয়ালীর কাছ থেকে একটা দেশলাই কিনে এক ডজনের পয়সা দিত।
অস্কার ছিল পাঁড় নাৎসি। আমাকে বলত, এ সব ভিখিরি আতুরকে কেন যে সরকার গুলি করে মারে না একথাটা এখনো আমি বুঝে উঠতে পারিনে। সমস্ত দেশের কপালে আছে তো কুল্লে তিন মুঠো গম। তারই অর্ধেক খেয়ে ফেললে এ বুড়ি, ও কানী, সে খোড়া। সোমখ জোয়ানরা খাবে কী, দেশ গড়বে কী দিয়ে? জেকে যখন নেকড়ে তাড়া করে তখন দুটো দুবলা বাচ্চা ফেলে দিয়ে বাঁচাতে হয় তিনটে তাগড়াকে। সব কটাকে বাঁচাতে গেলে একটাকেও বাঁচানো যায় না। কথাটা এত সোজা যে কেউ স্বীকার করবে না, পাছে লোকে ভাবে লোকটা যখন এত সোজা কথা কয় তখন সে নিশ্চয়ই হাবা।
আমি বললুম, তিনটেকে বাঁচাতে গিয়ে দুটোকে নেকড়ের মুখে দিয়ে যদি অমানুষ হতে হয় তবে নাই বাঁচল একটাও।
অস্কার যেন ভয়ঙ্কর বেদনা পেয়েছে সে রকম মুখ করে বললে, বললি? তুইও বললি? তুই না এসেছিস এদেশে পড়াশোনা করতে! এদেশের পণ্ডিতদের জুড়ি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই বলেই তুই এখানে এসেছিস। এ পণ্ডিতের জাতটা মরে যাক এই বুঝি তোর ইচ্ছে? বল দিকিনি বুকে হাত দিয়ে, এই জর্মন জাতটা মরে গেলে পৃথিবীটা চালাবে কে? পণ্ডিত, কবি, বীর এ জাতে যেমন জন্মেছে–’
আমি বললুম, ‘থাক থাক। তোমার ওসব লেকচার আমি ঢের ঢের শুনেছি।
অস্কার মটরসাইকেল থামিয়ে বলল, যা বলেছিস। তোকে এসব শুনিয়ে কোনো লাভ নেই। তুই মুসলমান, তারা কখনো ধর্ম বদলাসনে, যা আছে তাই নিয়ে আঁকড়ে পড়ে থাকিস। চ, একটা বিয়ার খাবি?’
আমি পিনিয়ন থেকে নেমে বললুম, গুড বাই। আর দেখো, তুমি সোজা বাড়ি যেয়ো। আমি লোকাল ধরব।
অস্কার বলল, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়। তোমাকে তো আর নিত্যি নিত্যি আমি লিফট দিতে পারিনে। কারখানায় পরীরা সব ভয়ঙ্কর চটে গিয়েছে আমার উপর, কাউকে লিফট দিইনে বলে। প্রেমট্রেম সব বন্ধ।
আমি রাগ করে বললুম, এ কথাটা এত দিন বললানি কেন? আমি তোমাকে পইপই করে বারণ করিনি আমার কখন ক্লাস শেষ হয় না হয় তার ঠিক নেই, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে না।
অস্কার বলল, তোমার জন্য আমি আর অপেক্ষা করলুম কবে? সামনের শরাবখানায় ঢুকি এক গেলাস বিয়ারের তরে। জানলা দিয়ে যদি দেখা যায় তুমি বেরিয়ে আসছ তাহলে কি তোমার দিকে তাকানোটাও বারণ? বেড়ালটাও তো কাইজারের দিকে তাকায়, তাই বলে কি কাইজার তার গর্দান নেন নাকি?’
চাচা বললেন, অস্কারের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। আর ঐ ছিল তার অদ্ভুত পরোপকার করার পদ্ধতি। ভিখিরিটাকে তিনটে মার্ক দিলে কেন? অস্কার বলবে, ব্যাটা বেহেড মাতাল, তিন মার্কেটিং নেশা করে গাড়ি চাপা হয়ে মরবে এই আশায়। আমাকে নিত্যি নিত্যি লিফট দেবার জন্য তুমি অপেক্ষা করো কেন?’ ‘সে কি কথা? আমি তো বিয়ার খেতে শরাবখানায় ঢুকেছিলুম!’ ‘নাৎসি পার্টিতে টাকা ঢালছো কেন?’ ‘তাই দিয়ে বন্দুকপিস্তল কিনে বিদ্রোহ করবে, তারপর ফাঁসিতে ঝুলবে বলে।’ আমি একদিন বলেছিলুম, ‘মিশনরিরা যে আফ্রিকায় খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করতে যায় সেটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’ অস্কার বলল, ‘তাহলে দুর্ভিক্ষের সময় বেচারী নিগ্রোরা খাবে কী? মিশনরির মাংস উপাদেয় খাদ্য।’
চাচা বললেন, কিন্তু এসব হাইজাম্প-লঙজাম্প শুধু মুখে মুখে। অস্কার নাৎসি আন্দোলনের বেশ বড় ধরনের কর্তা আর নাৎসিদের নিয়ে নিজে যতই রসিকতা করুক না কেন, আর কেউ কিছু বললে তাকে মারমার করে তাড়া লাগাত। আমার সঙ্গে এক বৎসর ধরে যে এত বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল সেইটি পর্যন্ত সে একদিন অকাতরে বিসর্জন দিল ঐ নালিদের সম্বন্ধে আমি আমার রায় জাহির করেছিলুম বলে।
