আড্ডার চ্যাংড়া সদস্য গোলাম মৌলা এসব বাবদে নাৎসিদের চেয়েও অসহিষ্ণু। বলল, আমরা যে পরাধীন সে-কথা সবাই জানে। তবে কেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া? এক ব্যাটা নাৎসি সেদিন আমার সঙ্গে তর্কে হেরে গিয়ে চটেমটে বলল, ‘তোমরা তো পরাধীন, তোমরা এসব নিয়ে ফপরদালালি কর কেন?’ নাৎসিদের তর্ক করার কায়দা অদ্ভুত।।
পুলিন সরকার বলল, তা তুই বললি না কেন, পরাধীন বলেই তো বাওয়া ভারতবর্ষে কলকজা বেচে আর ইনশিওরেন্স কোম্পানি খুলে দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। ভারতবর্ষের লোক তো আর হটেনটট নয় যে স্বরাজ পেলেও কলকজা বানাতে পারবে না! জানিস, সুইজারল্যান্ডে এখনও জাপানী ঘড়ি বিককিরি হয়।
বিয়ারের ভিতর থেকে সুয্যি রায় বললেন,
‘নাই তাই খাচ্ছো,
থাকলে কোথা পেতে?
কহেন কবি কালিদাস
পথে যেতে যেতে।’
কাটা ন্যাজের ঘা’তে যে মাছিগুলো পেট ভরে খেয়ে নিচ্ছিল তারাও তাই নিয়ে গরুটাকে কটুকাটব্য করেনি। নাৎসিদের বুদ্ধি ঐ রকমেরই। যে হাত খাবার দিচ্ছে সেইটেকেই কামড়ায়। নাৎসিদের তুলনায় ইংরেজ সম্বন্ধীরা ঘুঘু—ভারতবর্ষের পরাধীনতাটার সঙ্গে ব্যবহার করে যেন বাড়ির ছোট বউ। মাঝে মাঝে গলা খাঁকারি দেয় বটে, কিন্তু তিনি যে আছেন সেকথাটা কথাবার্তায় চালচলনে আকছারই অস্বীকার করে যায়।
চাচা গলাবন্ধ কোটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। তার ন্যাওটা ভক্ত গোঁসাই জিজ্ঞেস করল, চাচা যে রা কাড়ছেন না?’
চাচা চোখ না খুলেই বললেন, আমি ওসবেতে নেই। আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে।
সবাই অবাক। গোঁসাই জিজ্ঞেস করল, সে কী কথা? নাৎসিরা তো দাবড়াতে আরম্ভ করেছে মাত্র সেদিন। এর মাঝে কিছু একটা হলে তো আমরা খবর পেতুম।
কথাটা সত্য। চাচার গলাবন্ধ কোট, শ্যামবর্ণ চেহারা, আর রবিঠাকুরী বাবরী বার্লিন শহরের হাইকোর্ট। যে দেখেনি তার বাড়ি পদ্মার হে-পারে। চাচার উপর চোটপাট হলে একটা আন্তর্জাতিক না হোক ‘আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা।
চাচা বললেন, ‘তোরা তো দেখছিস নাৎসিদের দ্বিজত্ব। তাদের পয়লা জনম হয়েছিল মিউনিকে। আমি তখন
জব্বলপুরের শ্রীধর মুখুয্যে অভিমানভরে বলল, চাচা, আপনি কি আমাদের এতই বাঙাল ঠাওরালেন যে আমরা পুশের (Putsch) খবরটা পর্যন্ত জানিনে?
চাচা বললেন, এহ বাহ্য, আমি তারও আগেকার কথা বলছি। এই ভুলুণ্ডি সূয্যি রায় আর আমি তখন মিউনিকে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতুম। মিউনিক বললে ঠিক কথা বলা হল না। আমরা থাকতুম মিউনিক থেকে মাইল পনরো দূরে, ছোট্ট একটা গ্রামে—ডেলিপ্যাসেঞ্জরি করলে সব দেশেই পয়সা বাঁচে। আমি থাকতুম এক মুদির বাড়িতে। নিচের তলায় দোকান, উপরে তিন ছেলে, এক মেয়ে, আর আমাকে নিয়ে মুদির সংসার।
মুদির সংসারটির দুটি মহৎ গুণ ছিলকাচ্চা-বাচ্চা-বাপ-মা সকলেরই ঠাট্টা-মস্করার রসবোধ ছিল প্রচুর আর ওস্তাদী সঙ্গীতের নামে তারা অজ্ঞান। বড় ছেলে অস্কার বাজাতে বেয়ালা, মেয়ে করতাল-ঢোল, বাপ পিয়ানো আর মেজো ছেলে হুবের্ট চেলল্লা। কাজকর্ম সেরে দু’দণ্ড ফুরসৎ পেলেই কনসার্টকাজের ফাঁকে ফাঁকে ঠাট্টা-মস্করা।
কিন্তু এদের মধ্যে আসল গুণী ছিল অস্কার। তবে তার গুণের সন্ধান পেতে আমার বেশ কিছুদিন লেগে গিয়েছিল—কারণ অস্কারকে পাওয়া যেত দুই অবস্থায়। হয় টং মাতাল, নয় মাথায় ভিজে পট্টি বাঁধা। তখন সে প্রধানত আমাকে লক্ষ্য করেই বলত, ‘ডু ইন্ডার, ওরে ভারতবাসী কালা শয়তান, তোরা যে মদ খাসনে সেইটেই তোদের একমাত্র গুণ। তোর সঙ্গে থেকে থেকে আর কাল রাত্রির বাইশ গেলাশের পর
মেয়ে মারিয়া আমাকে বলল, বাইশ না বিয়াল্লিশ জানল কী করে? পনরোর পর তো ও আর হিসেব রাখতে পারে না।
মা বলল, তাই হবে। কাল রাত্রে চারটের সময় অস্কার বাড়ি ফিরে তো হড়হড় করে সব বিয়ার গলাতে আঙুল দিয়ে বের করে দিচ্ছিল। বোধহয় সন্দেহ হয়েছিল মদওয়ালা যে বাইশ গ্লাসের দাম নিল তাতে কোনো ফাঁকি নেই তো! বমি করছিল বোধহয় মেপে দেখবার জন্য।
অস্কার বলল, ওসব কথায় কান দিয়ো না হে ইভার (ভারতীয়)। দরকারও আর নেই। আমি এই সর্বজনসমক্ষে মা-মেরির দিব্যি কেটে বললুম, আর কখনো মদ স্পর্শ করব না। মদ মানুষকে পরের দিন কী রকম বেকাবু করে ফেলে এই ভিজে পড়িই তার লেবেল। বাপ রে বাপ, মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে।
ভিজে পট্টিতেও আর কুলোল না। অস্কার কল খুলে মাথাটি নিচে ধরল।
সেখান থেকেই জলের শব্দ ডুবিয়ে অস্কার হুঙ্কার দিয়ে বলল, কিন্তু আমাকে বিয়ারে ফাঁকি দিয়ে পয়সা মারবে কে শুনি? ইঃ! বক্সিং-এর পয়লা প্রাইজের কথা কি মদওয়ালা ভুলে গিয়েছে? তার হোটেলের বাগানেই তো বাবা ফাইনালটা হলো। ব্যাটার নাকটা এমনিতেই থ্যাবড়া, আমার বাঁ হাতের একখানা সরেস আন্ডারকাট খেলে সেনাক মিউনিক-বার্লিন সদর রাস্তার মতো ফেলেট হয়ে যাবে না?
কথাটা ঠিক। বিয়ারওয়ালা বরঞ্চ ইনকাম-টেক্স অফিসারকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করতে পাবে—আভে মারিয়া মন্ত্র কমিয়েসমিয়ে ভগবানকে ফাঁকি প্রতি রবিবারে গির্জেঘরে সে দেয়ই, না হলে সময়মতো দোকান খুলবে কী করে—কিন্তু বিয়ার নিয়ে অস্কারের সঙ্গে মস্করা ফস করে কেউ করতে যাবে না।
ঢকঢক করে এক গেলাশ নেবুর সরবৎ খেয়ে অস্কার বলল, মাথার ভিতর যেন এ্যারোপ্লেনের প্রপেলার চলছে, চোখের সামনে দেখছি গোলাপি হাতি সারে সারে চলেছে, জিবখানা যেন তালুর সঙ্গে ইস্কু মারা হয়ে গিয়েছে, কানে শুনছি মা যেন বাবাকে ঠ্যাঙাচ্ছে।
