রান্নাঘরে সকালবেলা সবাই জমায়েত। সেদিন ছিল রবিবার–সপ্তাহে ঐ একটিমাত্র দিন আমরা সবাই রান্নাঘরে বসে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট খেতুম, আর হদিন যে যার সুবিধে মতো।
মেয়ে মারিয়া পাঁচজনের উপকারার্থে চেঁচিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। অস্কার মাথায় ভিজে পট্টি বাঁধছিল আর আপনমনে মাথা নেড়ে নেড়ে নিজেকে বোঝাচ্ছিল, বিয়ার খাওয়া বড় খারাপ। মারিয়া হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এ খবরটা মন দিয়ে শুনুন, হের ডক্টর।—পাটেনকির্ষেনে হৈ হৈ রৈ রৈ, নাৎসি গুণ্ডা কর্তৃক ইহুদিনী আক্রান্ত। প্রকাশ, ইহুদিনী রাস্তায় নাৎসি পতাকা দেখে ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে আপন বিরক্তি প্রকাশ করেছিল। নাৎসিরা তখন তাকে ধরে নিয়ে এসে পতাকার সামনে মাথা নিচু করতে আদেশ করে। সে তখনো নারাজি প্রকাশ করাতে নাৎসিরা তাকে মার লাগায়। পুলিশ এসে পড়ায় নাৎসিরা পালিয়ে যায়। তদন্ত চলছে।’
চাচা বললেন, আমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম, নাৎসি গুণ্ডারা কী করে না-করে আমার তাতে কী?
অস্কার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, জাতির পতাকার সম্মান যারা বাঁচাতে চায় তারা গুণ্ডা?
আমি কিছু বলার আগেই বুড়ো বাপ বলল, ওটা জাতির পতাকা হল কী করে? ওটা তো নাৎসি পার্টির পতাকা।
আমি বললুম, ঠিক, এবং জাতীয় পতাকাকে কেউ অবহেলা করলে তাকে সাজা দেবার জন্য পুলিশ রয়েছে, আইন-আদালত রয়েছে। বিশেষ করে একটা মেয়েকে ধরে যখন পাঁচটা ষাঁড়ে মিলে ঠ্যাঙায় তখন সেটা গুণ্ডামি না হলে গুণ্ডামি আর কাকে বলে?
অস্কার আমার দিকে ঘুরে হঠাৎ ‘আপনি’ বলে সম্বােধন করে বলল, আপনি তা হলে ইহুদিদের পক্ষে?
আমি বললুম, অস্কার অত সিরিয়স হচ্ছ কেন? আমি ইহুদিদের পক্ষে না বিপক্ষে সে প্রশ্ন তো অবান্তর।
অস্কার বলল, ‘প্রশ্নটা মোটেই অবান্তর নয়। ইহুদিরা যতদিন এদেশে থাকবে ততদিনই বর্ণসঙ্করের সম্ভাবনা থাকবে। জর্মনির নর্ডিক জাতের পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে হবে।’
চাচা বললেন, এর পর আমার আর কোনো কথা না বললেও চলত। কিন্তু মানুষ তো আর সবসময় শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিতে ওঠা-বসা করে না, আর হয়তো অস্কার আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যে আমার মনে হয়েছিল, কোনো একটা যুৎসই উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। আমি বললুম, ভারতবর্ষেও তো আর্য জাতি রয়েছে এবং তারা জনদের চেয়ে ঢের বেশি খানদানী এবং কুলীন। আর্যদের প্রাচীনতম সৃষ্টি চতুর্বেদ ভারতবর্ষেই বেঁচে আছে। গ্রীস রোমে যা আছে তার বয়স বেদের হাঁটুর বয়সেরও কম।
জর্মনির-ফ্রান্সের তো কথাই ওঠে না—পরশু দিনের সব চ্যাংড়ার পাল। কিন্তু তার চেয়েও বড় তত্ত্বকথা হচ্ছে এই, ভারতবর্ষের যা কিছু প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে তোমরা-আমরা সবাই গর্ব করি সেটা গড়ে উঠেছে আর্য-অনার্য সভ্যতার সংমিশ্রণ অর্থাৎ বর্ণসঙ্করের ফলে। আমাদের দেশে বর্ণসঙ্কর সবচেয়ে কম হয়েছে কাশ্মীরে—আর ভারতীয় সভ্যতায় কাশ্মীরীদের দান ট্যাকে গুঁজে রাখা যায়। এবং আমার বিশ্বাস যে সব গুণী জর্মনিকে বড় করে তুলেছেন তাদের অনেকেই খাঁটি আর্য নন।
আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে অস্কার হুঙ্কার তুলে বলল, আপনি বলতে চান, আমাদের সুপারম্যানরা সব বাস্টার্ড?’
চাচা বললেন, আমি তো অবাক। কিন্তু ততক্ষণে আমার সবুদ্ধির উদয় হয়েছে। কিছু না বলে চুপ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলুম।
চাচা কফিতে চুমুক দিলেন। সেই অবসরে গোলাম মৌলা বলল, আমার সঙ্গেও ঠিক এইরকম ধারাই তর্ক হয়েছিল। কিন্তু আমি তো ভারতীয় সভ্যতার অতশত জানিনে, তাই ওরকম টায়টায় তুলনা দিয়ে তর্ক করতে পারিনি। কিন্তু নাৎসিরা রাগ দেখায় একই ধরনের।
চাচা বললেন, কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল। কী প্রয়োজন ছিল তর্ক করার? বিশেষ করে যখন জানি, যত বড় সত্য কথাই হোক মানুষ আপন কৌলীন্য বজায় রাখার জন্য সেটাকেও বিসর্জন দেয়। তার উপর অস্কার জানেই বা কী, বোঝেই বা কী? মানুষটা ভাললা, তর্ক করে আনাড়ির মতো, আর আগেও তো বলেছি তার হাইজাম্পলঙজাম্প তো শুধু মুখেই।
আমি আর অস্কার বাড়ির সক্কলের পয়লা ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরতুম। পরদিন খেতে বসে দেখি অস্কার নেই। যাঁকে তার বরসাতি আর হ্যাটও নেই। বুঝলুম আগেই বেরিয়ে গিয়েছে। মনে কী রকম খটকা লাগল। দুদিনের ভিতরই কিন্তু ব্যাপারটা খোলস হয়ে গেল—অস্কার আমাকে এড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শুনলুম মুদি আর তার মা আমার পক্ষ নিয়ে অস্কারকে ধমক দিয়েছেন। অস্কার কোনো উত্তর দেয়নি, কিন্তু আমি রান্নাঘরে থাকলে সেখানে আসে না।
মহা বিপদগ্রস্ত হলুম। বাড়ির বড় ছেলে আমার সঙ্গে মন কষাকষি করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়, আর-সবাই সে সম্বন্ধে সচেতন, অষ্টপ্রহর অস্বস্তিভাব, বুড়োবুড়ি আমার দিকে সব সময় কী রকম যেন মাপ-চাই ভাবে তাকান-মরুক গে, কী হবে এখানে থেকে!
বুড়োবুড়ি তো কেঁদেই ফেললেন। মারিয়া আমার কাছে ইংরিজি পড়ত। সে দেখি জিনিসপত্র প্যাক করছে। বলল, চললুম কিছুদিনের জন্য মাসির বাড়ি। দুসরা ছেলে হুবের্টও কথা কইত কম। আমাকে মুনিকে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেবার সময় বলল, আশ্চর্য, অস্কারের মতো সহৃদয় লোক নাৎসিদের পাল্লায় পড়ে কী রকম অদ্ভুত হয়ে গেল দেখলেন? আমি আর কী বলব।’
চাচা বললেন, তারপর ছমাস কেটে গিয়েছে। বান্ধব বর্জন সব সময়ই পীড়াদায়ক সে বর্জন ইচ্ছায় করো আর অনিচ্ছায়ই ঘটুক। তার উপর বড় শহরে মানুষ যে রকম নিঃসঙ্গ অনুভব করে তার সঙ্গে গ্রামের নির্জনতার তুলনা হয় না। গ্রামের নিত্যিকার ডালভাত অরুচি এনে দেয় সত্যি, তবু সেটা শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর পাঁচজনের শেরিশ্যাম্পেন খাওয়া দেখার চেয়ে অনেক ভালো। দিনের ভিতর তাই অদ্ভুত পঞ্চাশবার ‘দুত্তোর ছাই’ বলতুম, আর বুড়োবুড়ির কাছে ফিরে যাওয়া যায় কি না ভাবতুম। কিন্তু জানো তো, বড় শহরে স্থান যোগাড় করা যেমন কঠিন, সেখান থেকে বেরনো তার চেয়েও কঠিন।
