গ্রামের সমস্ত মানুষ বৃত্তের বাইরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কেউ কেউ দূর থেকে দেখতে থাকে। সেলিমের বাড়িতে মানুষের অভাব হয় না। তারা সবাই জটা পাগলের ক্ষমতা দেখতে উৎসুক।
আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকে। মানুষের উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। বরং আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। সেই সাথে বাড়তে থাকে জটা পাগলের মন্ত্র পড়ার শব্দ। একসময় দমকা বাতাস বয়ে যায়। লোকে ভাবে এ বুঝি জিনের বাদশার আগমনী বার্তা।
এত লোকের ভিড়েও কোনও শব্দ হয় না। শুধু মন্ত্র পড়ার শব্দ। হঠাৎ কোথা থেকে যেন হাসির শব্দ ভেসে আসে। লোকজন একে অপরের গায়ের সাথে সেঁটে যায়। তারা যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন ভারী বজ্রপাতের মত শব্দ ভেসে আসে।
আমাকে বিরক্ত করার সাহস পেলি কোথা থেকে? অদৃশ্য কেউ একজন বলে ওঠে।
মরিয়মরে ছাইড়া দে। না দিলে তোর ক্ষতি হইব। মন্ত্র পড়া বাদ দিয়ে চিৎকার করে জটা পাগল।
তোর এত্ত বড় সাহস আমার ক্ষতি করবি। আমি জিনের বাদশা, আমি সব পারি। আজকেই মরিয়মকে নিয়ে যাব আমি। তোর ক্ষমতা থাকলে আটকা। হেসে ওঠে অদৃশ্য কণ্ঠধারী।
তাইলে তই আমার কথা শুনবি না? দেখ আমি কী করি। চিৎকার করে জটা পাগল। হাতের মুঠো থেকে কী যেন বের করে আগুনে ফেলে দেয়। চিৎকার করে ওঠে অদৃশ্য কণ্ঠধারী। ধোয়ায় ভরে যায় চারপাশ। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। ধোয়া সরে যেতেই হঠাৎ সব আলো নিভে যায়। চাঁদখানাও ডুব দেয় মেঘের আড়ালে। কৌতূহলী দর্শকদের মনে ভয় ঢুকে যায়। অন্ধকারে ডুবে যায় সমস্ত গ্রাম। কেউ কিছু দেখতে পায় না। শুধু ধস্তাধস্তির শব্দ ভেসে আসে।
একসময় মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ বের হয়ে আসে। চাঁদের আলোয় লোকজন স্পষ্ট দেখতে পায় বৃত্তের ভিতর সেলিম এবং জটা পাগলের নিথর দেহ পড়ে আছে। মরিয়মকে কোথাও দেখা যায় না। যেন এত লোকের মধ্য হতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
শিকার – মিজানুর রহমান কল্লোল
উন্মাদ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ কবিরের সাথে আমার দীর্ঘদিন দেখা হয় না। এক সময় প্রতিদিন দেখা হত। আমি হাসপাতালের ডিউটি সেরে দুপুরে আরামবাগে তাঁর অফিসে যেতাম। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক আড্ডা দিতাম। দুনিয়ার হাবিজাবি বিষয় নিয়ে আলোচনা হত। সেই সঙ্গে মুখে চলত একটু পরপর চা, সিগারেট আর চানাচুর। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লেখক মোকারম হোসেন তখন শিশু একাডেমিতে চাকরি করত। সে একফাঁকে এসে যোগ দিত আমাদের সাথে। তিনজনের আড্ডার মধ্যে উন্মাদ অফিস থেকে সম্পাদক আহসান হাবীব ফোন করে বলতেন, খুব জরুরি, এখনই সবাইকে উন্মাদ অফিসে যেতে হবে। আমি ও মোকারম সাজ্জাদ কবিরের মোটর সাইকেলের পেছনে চেপে বসতাম। একটানে ধানমণ্ডির অফিসে চলে যেতাম। গিয়ে দেখতাম হাসান খুরশীদ রুমী যথারীতি নানরুটি আর কাবাব নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা খাবারের ওপর হামলে পড়তাম। এরপর আবার আড়া। আবার চা, সিগারেট আর চানাচুর। এভাবেই চলছিল দিন। এরপর হঠাৎ একদিন আমরা প্রাত্যহিক রুটিন পরিবর্তন করে ফেলি। আমি বিকালে পুরান ঢাকার একটি চেম্বারে বসা শুরু করলাম। হাসান খুরশীদ রুমী তাঁদের বাড়ির কাজ শুরু করার অজুহাতে উন্মাদে আসা বাদ দিলেন। মোকারম প্রতি মাসে একটি করে বই লিখতে লাগল। আর সাজ্জাদ কবির ভাই একটি নোটিশ টানিয়ে তাঁর অফিসটাকে আড়ামুক্ত এলাকা ঘোষণা করলেন। উন্মাদ অফিসটাও ধানমণ্ডি এলাকা থেকে চলে গেল মিরপুরে। আমাদের কোথাও আড্ডা বলতে আর কিছুই থাকল না। তাই একদিন সাজ্জাদ কবির ভাই যখন ফোন করে তার অফিসে কফি খাওয়ার দাওয়াত দিলেন এবং বললেন যে কফি খেয়েই একসাথে উন্মাদ অফিসে যাওয়া হবে, আমি আর দেরি করতে পারলাম না। ন্যাশনাল হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই একটা রিকশা নিয়ে ছুটলাম আরামবাগ। রিকশায় বসে মোকারমকে ফোন করলাম। কিন্তু তার মোবাইল বন্ধ পেলাম। যতবার ফোন করি ততবার এক মহিলার বিরক্তিকর কণ্ঠ-দুঃখিত, আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে…
রিকশাওয়ালাকে অতিরিক্ত দশ টাকা বকশিশ দিয়ে আরামবাগে দেওয়ানবাগ হুজুরের বাবে রহমতের গলির সামনে নেমে পড়লাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়লাম গলিতে। এই গলির শেষমাথায় সাজ্জাদ ভাইয়ের সৃতি প্রেস।
অনেকে বিভিন্ন সময়ে জানতে চেয়েছে স্মৃতি না হয়ে সৃতি কেন? সাজ্জাদ ভাই উত্তরে বলেছেন, আমার ইচ্ছা। কিন্তু পরে শুনেছি সৃতি হলো গতিময় পথ।
নিজের প্রেসের ভেতরে সুন্দর করে সাজানো ছোটখাট একটা অফিস। কাঁচের টেবিলের ওপাশটায় তিনি বসে থাকেন। এপাশে তিনটে চেয়ার আর দুটো সোফা। পাশে ছোট্ট একটা রুম। ওখানে বসে তাঁর ছোট ভাই আসরার মাসুদ প্রগতি পাবলিশার্সের কাজ করে। সব মুখস্থ আমার।
কিন্তু এখন গিয়ে দেখি অফিসটা ওখানে নেই! নেই প্রেসের কোন চিহ্ন!
১৪৫/৩ নম্বরটিই আমি খুঁজে পেলাম না।
একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, সৃতি প্রেসটা কই?
সে বলল, ওটা তো এক বছর আগেই এখান থেকে চলে গেছে।
কোথায় গেছে?
জানি না।
জানেন না মানে? ঘটনাবহুল প্রেস!
লোকটা সরু চোখে আমার দিকে তাকাল। ঘটনাবহুল? কীসের ঘটনাবহুল?
আমি উত্তর না দিয়ে সামনে এগোলাম। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল দিলাম সাজ্জাদ ভাইয়ের নম্বরে। নম্বরটি বন্ধ।
