আবার কল দিলাম। বন্ধ।
আবার–আবার-বারবার—
বন্ধ। বন্ধ।
মেজাজ খারাপ হতে লাগল।
কোন মানে হয়?
সাজ্জাদ ভাই তার প্রেস এখান থেকে সরিয়ে নিয়েছেন সেটা আমাকে জানাবেন না? ওদিকে তিনি মোবাইলও বন্ধ রেখেছেন।
জুলাইয়ের তীব্র গরম। মাথার ওপর গনগন করছে সূর্য। এক ফোঁটা বাতাস নেই কোথাও। কোন গাছের পাতাই নড়ছে না। ঘেমে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে শার্ট।
একটা চায়ের দোকানের সামনে লোকজন ভিড় করে চা খাচ্ছে। এই গরমে সবাইকে এভাবে চা খেতে দেখে আরও গরম লাগল আমার। সেই সাথে মেজাজও চড়তে থাকল।
হঠাৎ সেই ভিড়ের ভেতর থেকে একজন যুবক বেরিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার কাঁধে টোকা দিয়ে বলল, এই, তুই রাজেশ না?
আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি রাজেশ। কিন্তু তুই কে? আমাকে তুই করে বলাতে আমিও ইচ্ছা করেই তাকে তুই করে বললাম।
আমি এমনই।
যে আমাকে যা দেয়, আমি সেটাই তাকে ফিরিয়ে দিই। আমাকে আপনি করে বললে আমিও তাকে সম্মান করে আপনি সম্বোধন করি। আমাকে তুমি করে বললে আমিও। বিগলিত হয়ে তুমি বলি। আর কেউ তুই বললে তাকেও তুই। এর যেমন ভাল দিক আছে, খারাপ দিকও আছে। একবার মতিঝিল এজিবি কলোনির এক বাসার পেছনে দাঁড়িয়ে দেয়ালে প্রস্রাব করছিলাম, হঠাৎ শুনি পেছনে কেউ বলছে, এই, ছেলে, কী করিস এখানে?
আমি মাথা না ঘুরিয়েই বললাম, কানা নাকি? দেখস না কী করি? আয়। লাইনে দাঁড়া।
কী? কী বললি, বদমাশ ছেলে?
তাকিয়ে দেখি মুনিয়ার বাবা।
আমি প্যান্টের চেইন না আটকিয়েই ঝেড়ে দৌড় দিলাম। মুনিয়ার সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল।
এরপর ওখানেই পরিসমাপ্তি।
মুনিয়া স্রেফ আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল, কোন কুকুর স্বভাবের লোকের সাথে বাবা আমাকে বিয়ে দেবেন না।
আমি আর কথা বলারই সুযোগ পাইনি।
যুবক আবার টোকা দিল আমার কাঁধে।
আমি ঠিকই চিনেছি। তুই রাজেশ। তোকে রাজ বলে ডাকতাম। কতদিন পর দেখা।
আমি এক পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম, কিন্তু তুই কে?
আমাকে চিনিস নাই? আমি অভিজিৎ।
অভিজিৎ? আমি ঠিক চিনতে পারলাম না তাকে।
হ্যাঁ, অভিজিৎ।
সে হাসল। আমি স্মৃতি হাতড়ালাম।
বরিশাল মেডিকেলে আমার সাথে অভিজিৎ নামে কেউ পড়ত না। আমাদের আগের ব্যাচে এক অভিজিন্দা ছিলেন, কিন্তু এর সাথে তার চেহারার মিল নেই।
আমার চেহারা বোধহয় পড়তে পারল সে। একটু হেসে বলল, নন্দিতাকে ভুলে গেছিস তুই? অবশ্য ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। সে তো আজকের কথা নয়!
বিদ্যুৎ চমকের মত আমার মনে পড়ে গেল। আমি চিৎকার করে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। সে পেছনে সরে গেল।
আমি একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, নন্দিতা কেমন আছে রে?
সে বলল, খুব ভাল আছে। কাল ওর বিয়ে। নন্দিতাকে কথা দিয়েছিলাম ওর বিয়েতে তোকে হাজির করব। যে কষ্ট ওকে দিয়েছিলি, মেয়েরা সহজে কষ্টের কথা ভোলে না।
আমি একটু থমকে গেলাম। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম, অভিজিৎ, ওটা ছিল একটা অ্যাকসিডেন্ট।
এতদিন পর আমি ব্যাখ্যা শুনতে আসিনি। নন্দিতাকে কথা দিয়েছিলাম, ব্যস, আমি কথা রক্ষা করছি। তোর হাসপাতালেই যেতাম। কিন্তু তোর সাথে এখানেই দেখা হয়ে গেল।
তুই জানিস আমি কোন্ হাসপাতালে?
না জানার কী আছে? তুই এত বিখ্যাত হয়ে গেছিস!
আমি অভিজিৎকে দেখছি। একসাথে স্কুলে পড়তাম আমরা। খুব ছটফটে ছিল সে। ভাল ফুটবল খেলত। ম্যাট্রিক পাশ করার পর সে হঠাৎ করে সায়েন্স ছেড়ে আর্টস নেয়। তাই তার সাথে আমার আর দেখা হত না।
কিন্তু আমার সাথে দেখা হত নন্দিতার। প্রায় নিয়মিত। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেণ্ড ইয়ারে।
একদিন ক্লাস ছিল না। আমি কলেজের পেছনের খেজুর বাগানে একটি খেজুর গাছের গোড়ায় বসে ছবি আঁকছিলাম। হঠাৎ মেয়ে কণ্ঠের হাসি শুনে চমকে তাকাই। তেরো-চোদ্দ বছরের একটি মেয়ে। অদ্ভুত সুন্দরী।
কার ছবি আঁকছেন?
অ্যাঁ! কারও না। এমনি এক মেয়ের ছবি।
আমি নন্দিতা। হাঁটু মুড়ে বসতে-বসতে বলল সে। অভিজিৎ সমদ্দার আমার দাদা।
ওহ, তুমি অভিজিতের বোন? আমি কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকালাম। কেননা অভিজিতের এমন সুন্দরী একটা বোন রয়েছে, কখনও বলেনি সে। আমি চোখ সরাতে পারলাম না।
ক্লাস নাইনে পড়ে নন্দিতা। ঠিক যেন একটা পরী। খুব অল্পদিনের মধ্যেই ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমাদের নিয়মিত দেখা হতে লাগল ওই খেজুর বাগানে। ক্রমেই ও সুন্দরী থেকে আরও সুন্দরী হয়ে উঠল। একদিন। নন্দিতা বলল তার কেমন বমি-বমি লাগছে। আমি ভয়ে পালালাম। সেই শেষ দেখা।
বিয়ে কবে বললি? কাল? কীভাবে যাব? এত অল্প সময়ে! তা ছাড়া ছুটি নেয়া…অনেক ঝামেলার ব্যাপার।
তুই ইচ্ছা করলে পারবি। তুই-ই পারিস। আগেও পেরেছিস।
কিন্তু…
কীসের কিন্তু? কোন কিন্তু না। নন্দিতার বিয়ে বলে কথা। তুই না থাকলে হয়?
এতদিন পর-
নন্দিতা খুব করে বলছিল তোর কথা। মেয়ে মানুষের মন তো, কখন কী আবদার করে বলা মুশকিল। পুরানো প্রেম-ভুলতে পারে না।
এসব বলে লজ্জা দিস না। জাস্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট।
অ্যাকসিডেন্ট না কী ছিল সে প্রসঙ্গ থাক। আমি যদি তোকে তখন পেতাম, স্রেফ পুঁতে ফেলতাম। বাদ দে সেসব। তাতুয়াকান্দা, গ্রামের নাম। নাম শুনেছিস তো?
না।
নারায়ণগঞ্জের মধ্যে। আড়াইহাজারে।
ও।
গুলিস্তান থেকে বাসে উঠবি। আড়াইহাজার নেমে খানাকান্দা যাবি।
