বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সেলিমের গা ছমছম করে। এখন তাকে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে হবে। এই কবরস্থান সম্বন্ধে নানান গালগল্প আছে। আগেও রাতে অনেকবার এই কবরস্থানের পাশ দিয়ে সেলিম বাড়ি ফিরেছে, কিন্তু আজকের অবস্থা অন্যরকম।
.
ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত, তার উপর আবার ঝড়-বৃষ্টি। অন্ধকারে একবার ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল। কিছুদূর যাবার পর বিজলীর আলোয় সে বুঝতে পারে পথ ভুল হয়েছে।
মনে মনে দোয়া পড়তে পড়তে পা বাড়ায় সেলিম। এই অল্প পথ যেন শেষ হতে চায় না। সামান্য শব্দেই গা কেঁপে ওঠে। মনে হয় কে যেন তার পিছু পিছু হটছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখার মত সাহস তার হয় না।
অবশেষে সে কবরস্থান পার হয়ে আসে। এই বৃষ্টির মধ্যে তার গা ঘেমে গেছে। মনে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগেছে। কবরস্থান পার হয়ে আসতে।
একসময় সে বাড়ির কাছে চলে আসে। সে বুঝতে পারে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। তবুও সে তার মরিয়মের কাছে আসতে পেরেছে এটাই বড় কথা। ভালবাসার টান কিংবা কাছে পাবার টান কখনও কোণও বাধা মানে না। সেলিম তার ঘরের বারান্দায় উঠে গা ঝাড়তে থাকে। মরিয়ম নিশ্চয়ই তাকে দেখে অবাক হবে। খুশি তো হবেই! এসময় সেলিমের নাকে তীব্র ফুলের গন্ধ প্রবেশ করে। কিন্তু তার বাড়িতে তো কোন ফুলের গাছ নেই! তা হলে ফুলের মিষ্টি গন্ধ কোথা হতে আসছে! চমকায় সেলিম। দরজায় টোকা দিতেই সে খেয়াল করে নিচ দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। তার মানে মরিয়ম জেগে আছে। কিন্তু এত রাতে তো জেগে থাকার কথা নয়!
মনের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে পড়ে সেলিমের। মরিয়ম কি পরপুরুষের সাথে…ছিঃ। মরিয়ম এমনটা করতে পারে না! কিছুতেই পারে না। চঞ্চল চোখজোড়া ঘরের ভিতরের দৃশ্য দেখতে চায়। একটা ছোট্ট ফুটো যেন তার খুব প্রয়োজন। মা মনসাও হয়তো লখিন্দরের লোহার বাসরে ফুটো খোঁজার জন্য এত অস্থির হয়নি।
সেলিম বিশ্ব জয় করার আনন্দ পায় জানালার নিচে একটা ছোট ফুটো খুঁজে পাওয়ায়। দেরি না করে চোখ লাগায় তাতে। চমকে ওঠে সে। বিশ্বাস হতে চায় না! অবিশ্বাস্য! মরিয়ম গভীর ঘুমে মগ্ন। তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে সুদর্শন এক যুবক। যুবকের শরীর হতে আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোয় ঘরের অন্ধকার দূর হয়ে গেছে।
অসঙ্গতিটা ধরতে পারে না সেলিম। তীব্র রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা এসে ভর করে। চিঞ্জার করে দরজায় থাবা দেয়। খানকি মাগী, দরজা খোল…দরজা খোল্ কইলাম…ওরে, মাগী…বেশ্যা… সেলিম দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকে। তার মুখ থেকে ছোটে অশ্লীল সব শব্দ। ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খোলে মরিয়ম। দমকা হাওয়ার মত ঘরে ঢোকে সেলিম। অনবরত মরিয়মকে মারতে থাকে। মরিয়ম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বিস্ময়ের জন্য হয়তো __ লাগে না। মরিয়ম মাটিতে পড়ে যেতেই রাগটা যুবকের উপর গিয়ে পড়ে। কিন্তু কোথায় সেই যুবক! নেই! যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে। তা হলে কি চোখের ভুল!
এবার সেলিমের বিস্মিত হবার পালা। অসঙ্গতিটা বুঝতে পারে। যুবকের গা হতে আলো বেরুচ্ছিল কেন? তা হলে কি যুবকটি মানুষ নয়! জিনের বাদশা! মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে। সে। শ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেছে।
মরিয়ম উঠে বসে। সে-ও অবাক হয়েছে। তার স্বামী এই মাত্র বাড়ি ফিরল, তা হলে স্বামীর ছদ্মবেশে তিনরাত তার সাথে থাকল কে? তা হলে কি সে অন্য কেউ? গভীর রাতে তার স্বামীর রূপ ধরে আসে আবার ভোর হবার আগেই চলে যায়! প্রথমরাতে স্বামীর ছদ্মবেশীর আদর-সোহাগ দেখে অবাক হয়েছিল।
স্বামীর পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে সব খুলে বলে মরিয়ম। কোনও কিছুই গোপন করে না। সব শুনে সেলিম ভয় পায়। নির্দোষ স্ত্রীকে বেদম মারধর করায় অপরাধবোধ জন্ম নেয়।
সে রাতে আর তাদের ঘুম হয় না। একটু পরেই মসজিদ থেকে সুরেলা আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। দুজনেই ভয় নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে দিনের আলোর জন্য। সূর্য ওঠার সাথে সাথেই জটা পাগলের কাছে রওনা হয় সেলিম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিয়ে হাজির হয়। সব শুনে ও বুঝে বিজ্ঞের মত মাথা দোলায় জটা পাগল।
বিপদ…বিপদ আইতাছে…ঘোর বিপদ সামনে…জিনের বাদশা…খুবই শক্তিশালী। থেমে থেমে শীতল কণ্ঠে চিৎকার করে জটা পাগল। তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যা সেলিমের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। সেলিম জটা পাগলের পা ধরে কেঁদে ফেলে।
পাগল বাবা, আমাগোরে বাঁচান…যেমনেই হোক আমাগোরে এই বিপদ হইতে উদ্ধার করেন। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে সেলিম।
সন্ধ্যার পর আমি আইতাছি। তোর বউয়ের কাছ থেইক্যা জিনের বাদশারে খেদাইতে হইব। গম্ভীর কণ্ঠে বলে জটা পাগল।
দুজনের সন্ধ্যা হবার অপেক্ষা। শত ঝামেলার মধ্যেই ক্ষুধার্ত স্বামীর জন্য রান্না করে মরিয়ম। সেলিম কিচ্ছু খেতে পারে না। মরিয়মের সাথে কথাও বলে না। হয়তো নিজের। স্ত্রীর পাশে অন্য কাউকে দেখতে চায় না। সে জিন হোক বা মানুষ।
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে জটা পাগল সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন। করে সেলিমের বাড়িতে চলে আসে। বাড়ির চারদিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সন্ধ্যার পর উঠানে একটা হাড় দিয়ে বৃত্ত আঁকে মাটির বুকে। বৃত্তের ভিতরে প্রবেশ করে সেলিম, মরিয়ম এবং জটা পাগল। বৃত্তের চারদিকে জ্বলে মোমবাতি।
