ওরকম হন্তদন্ত হয়ে তিনচারজন বয়স্ক মানুষকে ছুটে আসতে দেখে তারা অবাক হলো। একজন প্রবীণ মানুষ প্রায় পথ আগলেই জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আজমল ভাই, অমন করে দৌড়াচ্ছেন কেন?
আজমল হোসেন হাঁপাতে হাঁপাতে কোনওমতে বললেন, বিমলবাবু…
প্রবীণ বুঝদারের মত মাথা নেড়ে বললেন, হু, বিমলবাবু আজ সন্ধেয় মারা গেছেন। তার খবর আপনারা এখন পেয়েছেন? তাই এভাবে ছুটতে ছুটতে আসছেন?
প্রবীণের কথাতে ওরা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কোনওমতে ঢোক গিলে তো-তো করে বলতে পারল, বিমলবাবু মারা গেছেন!
হু। আজ সন্ধেয়, ছাদের কার্নিশ থেকে পড়ে। থেঁতলে বীভৎস চেহারা হয়ে গিয়েছিল। এই তো, আমরা বিমলের মড়া পুড়িয়ে চান করতে যাচ্ছি। তা যান না শ্মশানের কাছে। বন্ধুকে শেষ দেখাটা দেখে আসেন। এখন অবশ্য একমুঠো ছাই ছাড়া কিছুই দেখতে পাবেন না। সবাই ছাই হয়ে যায়…ছাই…
জটা পাগল ও জিনের বাদশা – রাকিব হাসান
বর্ষাকাল। সুতরাং বৃষ্টি তো হবেই। তবে এবারের বৃষ্টির পরিমাণটা একটু বেশি। গত চারদিন ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের যেন কোনও ক্লান্তি নেই। নেই কোনও অবসর কিংবা বিরক্তি। এক সেকেণ্ডের জন্যও বৃষ্টি থামেনি। কখনও টিপটিপু, কখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। শহুরে জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হলেও গ্রাম্য জীবনযাপনে এরকম বৃষ্টির প্রভাব বেশি। চুলোয় রান্না-বান্না; হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন সবক্ষেত্রেই বাধার সৃষ্টি হয়।
এরকম বৃষ্টির এক রাতে সেলিম রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। রেল স্টেশন থেকে তার বাড়ি চার কিলোমিটার দূরে। কাঁচা রাস্তা বলেই ঝামেলা বেশি। বর্ষাকালে এই রাস্তায় ভ্যানগাড়ির বদলে গরুর গাড়ি চলে। সুতরাং রাস্তা এবড়োখেবড়ো-কাদামাখা। এই বৃষ্টিতে গরুর গাড়ি তো দূরে থাক একটা শিয়াল-কুকুরও রাস্তায় আছে কিনা সন্দেহ।
সেলিমের মনটা আনচান করে। তার বাড়ি ফেরা খুবই প্রয়োজন। বিকালের মধ্যেই ট্রেন এখানে পৌঁছে যাবার কথা থাকলেও আসতে পারেনি। এই স্টেশনে এসেছে রাত দশটায়। তখন বর্ষার আকাশ-বাতাস কাঁপানো বর্ষণ ছিল। সেলিম বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করতে করতে দুঘণ্টা পার হয়ে গেলেও বৃষ্টি তো কমেইনি তার উপর ঝড় আরম্ভ হয়েছে। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে চার কিলোমিটার কাদামাখা পথ পাড়ি দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়।
তবে মনের কাছে কোনও সমস্যাই সমস্যা নয়। ইচ্ছা কখনও যুক্তি তর্ক মানে না। মানে না কোনও সমস্যা। সেলিমের মন পড়ে আছে বাড়িতে। কারণ বাড়িতে তার সুন্দরী নববধূ তার পথ চেয়ে আছে। সেলিম নরসিংদী শহরে কাপড়ের ব্যবসা করে। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি ফেরে না। তার বউ মরিয়ম তার পথ চেয়ে নিঘুম রাত পার করে দেয়।
আজ চারদিন পর সেলিম বাড়ি ফিরছে। বিয়ের পর সে কখনও চাররাত বাড়ির বাইরে থাকেনি। তার বিয়ে হয়েছে মাত্র তিন মাস। সদ্য বিয়ে করা নববধূকে ফেলে চাররাত বাইরে থাকতে বেশ কষ্ট হয়েছে সেলিমের। কিন্তু কোনও উপায় ছিল না। তাই আজ এই ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে সেলিম ভালবাসার টানে তার বউয়ের কাছে এসেছে।
ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় নেমে পড়ে সেলিম। প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর উপরে এনেছে। পায়ের স্যাণ্ডেল এখন তার হাতে। প্রায় কচ্ছপগতিতে তাকে এগোতে হচ্ছে। রাস্তায় পা ফেলার সাথে সাথেই হাঁটু অবধি কাদার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। শক্তি প্রয়োগ করে পা উঠিয়ে অন্যখানে ফেললেও সেই একই অবস্থা। মনে মনে মরিয়মের কথা ভাবতে ভাবতে এগোতে থাকে সে।
মরিয়ম দেখতে খুবই সুন্দরী। একেবারে পরীর মতন। দুধে আলতায় গায়ের রঙ, মায়াবী মুখের চেহারা, টানা টানা চোখ, বাঁশির মত নাক-সবমিলিয়ে অপূর্ব সুন্দরী। গ্রামে এমন মেয়ে বিশেষ পাওয়া যায় না। সেলিমদের বাড়ির কয়েক গ্রাম পরেই মরিয়মের বাপের বাড়ি। মরিয়ম সুন্দরী হলেও কোনও ছেলে তার ধারে কাছে ঘেঁষত না। সবাই বলে জিনের বাদশা নাকি মরিয়মের রূপে পাগল। মরিয়মের দিকে কোনও ছেলে হাত বাড়ালে তার ক্ষতি হবে। কোনও ছেলেই তাই মরিয়মকে কাছে পাবার চেষ্টা করে না। বিয়ের জন্য সম্বন্ধ এলে তা ভেঙে যায়। কোনও বাবা-মা চায় না সুন্দরী বউ পাওয়ার জন্য নিজের ছেলের ক্ষতি করতে।
মরিয়মের কৃষক বাবার দুঃখ কম ছিল না। সুন্দরী মেয়ে ঘরে অবিবাহিতা থাকলে বাবারা রাতে ঘুমাতে পারে না। সুন্দরী আবার ভয়ঙ্করও। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে মরিয়মের ঘর আলোয় ভরে ওঠে। কড়া মিষ্টি আতরের গন্ধ পাওয়া যায়। তাই সে তার মেয়েকে কখনও বকাঝকা করে না। বরং মেয়েকে ভয় পায়।
সেলিমের কথা একটু আলাদা। মা-বাবা-ভাই-বোন কেউ নেই তার। আপন বলতে এক চাচা আছে। সেই চাচাই সেলিমকে মরিয়মের কথা বলেছে। একদিন চাচার সাথেই মরিয়মকে দেখতে যায়। মরিয়মের রূপে সেলিম আত্মহারা। রূপবতী এই মেয়েকে তার বউ হিসাবে চায়। মরিয়মের বাবা সব কথা খুলে বলে।
সেলিম নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি নিতে রাজি মরিয়মকে পাবার জন্য। সেলিমের চাচা ভাতিজার এ ইচ্ছা মেনে নিতে চায় না। কিন্তু সেলিমের পীড়াপীড়িতেই রাজি হয়। তবে তার আগে জটা পাগল নামে তান্ত্রিকের কাছ থেকে সেলিমের কাছে থাকবে ততক্ষণ কোনও জিন তার ক্ষতি করতে পারবে না। তাবিজটি সবসময় সেলিমের ডান বাহুতে বাঁধা থাকে।
