মানুষ আর ভূতেরও তো বন্ধুত্ব হতে পারে, বাপু। আমি যখন মরতে পারছি না, তখন আপনি তো আমার সাথ ধরতে পারেন?
মন্দ বলিসনি, বাছা। তা কোথায় যেন চলেছিস তুই?
হরর ক্লাবে। ভূতের গল্পের আড্ডাখানায়। সেখানে সবাই হয় ভূতের গল্প শোনে, না হয় বলে।
কিন্তু কেউ তো আর সরাসরি ভূত দেখতে পায় না, ভূতের মুখ থেকে গল্প শুনতেও পায় না।
না, তা পায় না।
তা হলে আজ আমাকে তোর সাথে করে ওখানে নিয়ে চল। এতদিন শুধু ভূতের গল্প শুনেছে, আজ সত্যিকারের ভূত। দেখুক। ভূতের মুখে গল্প শুনুক।
আপনি যাবেন আমার সাথে?
তুই নিয়ে গেলে যাব। নিয়ে না গেলেও অদৃশ্য হয়ে তোর পিছু নিয়ে চলে আসতে পারি। নিজের চিতা পোড়ানো তো দেখলাম, এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে তোর সাথে গিয়ে যদি একটু মানুষের সঙ্গ পাই। বেঁচে থাকতে মানুষের একটু সঙ্গ পাওয়ার জন্য খুব হাঁসফাঁস করতাম। তা এই অথর্ব বুড়োর সাথে কে বসে আর বকবক করবে, কার এত সময় আছে? কার এত ঠেকা পড়েছে?
না-না, অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে না। আমিই সাথে নিয়ে যাচ্ছি।
তা, তোর ওখানকার অন্যান্য সদস্যরা তোর মতই তো?
মানে? আমার মতই মানুষ কি না? হ্যাঁ, মানুষই। নাকি আপনি তাদের ভূত ভেবেছিলেন?
উঁহু, তা নয়। আমি বোঝাতে চেয়েছি তারাও তোর মত সাহসী মানুষ কি না? ভূতের গল্প বলা ও শোনা এক জিনিস আর সরাসরি ভূত দেখা অন্য জিনিস। বয়স্ক মানুষ হলে ভয়ে গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারে। শেষে যমে-মানুষে আর ভূতে মিলে টানাটানি শুরু হবে। তার চেয়ে না হয় তোর সাথে অদৃশ্য হয়ে…
তা মন্দ বলেননি, ওখানে সবাই আমার মত ঠিক সাহসী নয়। সুদখোর আজমইল্যা তো টাকার গরমে অজ্ঞান হয়ে থাকে। টাকার গরমেই পোড়োবাড়ি কিনে ভূতের। আড্ডাখানা বসিয়েছে। আর বুড়োভাম আলতাফ খুড়ো তো নিজেকে সর্বজ্ঞানী ভাবে, ওদিকে ওর আত্মীয়স্বজনরা যে সব ফাঁকা করে দিচ্ছে সে খেয়াল বুড়োভামের নেই। শওকত। চোরা নিজেরে সাহসের ডিপো ভাবলেও ওটা এক্কেবারে ভিতুর ডিম। আপনাকে দেখে এক্কেবারে কাপড় খারাপ করে ফেলবে।
আজমল সাহেব, আলতাফ সাহেব আর শওকত হোসেন তিনজনই সমস্বরে বলে উঠলেন, এসব কী বলছেন, বিমলবাবু? আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? ভূতের চক্করে পড়ে? আমাদের সম্বন্ধে কী সব আজেবাজে কথা বলছেন!
সর্বকনিষ্ঠ ও সবচেয়ে চুপচাপ সদস্য জসিম মণ্ডল বলল, বিমলদা, ফায়ারপ্লেসের আগুনটা একটু উস্কে দেন না, কেমন
অন্ধকার হয়ে এসেছে।
বিমলবাবু শান্ত মুখে বললেন, ফায়ারপ্লেসের ভেতরে তেমন কিছু নেই, উস্কে দিলেও লাভ হবে না। নতুন কাঠ দিতে হবে। শওকত চোরারে কাঠ চুরি করে আনতে বলো।
শওকত হোসেন ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, ভাল হচ্ছে না কিন্তু, বিমলদা। বয়োজ্যেষ্ঠ বলে আপনাকে কিন্তু যথেষ্ট সম্মান করি, তাই বলে মুখে যা আসে আবোলতাবোল বলে যাবেন! শওকত হোসেন রেগেমেগে উঠে দাঁড়ালেন।
শওকত হোসেনের দেখাদেখি আলতাফ সাহেব ও আজমল সাহেবও উঠে দাঁড়ালেন। ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন বিমলবাবুর দিকে। ইচ্ছে-কলার ধরে দুটো ঝাঁকুনি দিয়ে এসব কথার ব্যাখ্যা চাইবেন।
ফায়ারপ্লেসের কাছটাতে অন্ধকার। আগুন প্রায় নিভু নিভু। কাঠপোড়া কয়লার নিচে গনগনে লালচে আভা দেখা যাচ্ছে।
জসিম মণ্ডল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কাঠ আনা নিয়ে ঝগড়া করে লাভ নেই, শওকত ভাই। আমিই কাঠ নিয়ে আসছি।
বিমলবাবু শান্ত স্বরে বললেন, আপনাদের কাউকেই উঠতে হবে না, জায়গায় বসুন। কাঠের ব্যবস্থা আমিই করছি।
শওকত হোসেন খেপে গেছেন। তিনি চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন, তোর কাঠের খ্যাতা পুড়ি আমি। তুই আমারে চোর বলেছিস, বিমল। তোরে আজকে ওই ফায়ারপ্লেসের আগুনে পোড়াব। হিন্দু মানুষ, পুড়েই তো তোদের শান্তি, কাঠকয়লা পোড়া হয়ে ভূত হয়ে যাবি তুই।
তার আর দরকার হবে না, শওকত চোরা। তোদের সুবিধা করে দিচ্ছি।
শওকত হোসেন বিমলবাবুর কথা ধরতে পারলেন না। গলার টুঁটি টিপে ধরার জন্য এক লাফে ফায়ারপ্লেসের কাছে বিমলবাবুর মুখোমুখি হলেন।
তারপর অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলেন…
ফায়ারপ্লেসের আগুন বেড়ে যাচ্ছে! নতুন কাঠ দিলে যেমন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে, তেমনটি। আর সেই আগুন বেড়ে ওঠার কারণ বিমলবাবু তার ডান হাতের কনুই পর্যন্ত ফায়ারপ্লেসের জ্বলন্ত কাঠকয়লার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছেন।
আগুনে পোড়াতে এসে বিমলবাবুর হাত আগুনের মধ্যে দেখে আঁতকে উঠলেন শওকত হোসেন। বিমলবাবুর হাতটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললেন, এ কী পাগলামি করছেন, বিমলবাবু? এমন কাজ কেউ করে?
হাতটা টেনে বের করে হতভম্ব হয়ে গেলেন শওকত হোসেন। হাতের আঙুল থেকে কনুই পর্যন্ত দাউ দাউ করে জ্বলছে। ততক্ষণে বাকি তিনজনেও কাছে এসে পড়েছে।
হাতের দাউদাউ আগুনে সবাই বিমলবাবুর মুখ দেখতে পেল এবার। সে মুখ যে বিমলবাবুর, তা কেউ বলতে পারবে না। আগুনে পুড়ে ঝলসানো, বিকৃত, বীভৎস একটা মুখের আদল…।
ভয় পেলে যে মানুষের অবস্থা কেমনতরো হয়, তা এই বয়স্ক মানুষগুলোকে দেখলে বোঝা যেত। তারা সবকিছু ফেলে ভেঙেচুরে এমনভাবে দৌড় শুরু করলেন, যেন অলিম্পিকের প্রবীণ সোনাজয়ী দল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে তারা শোনের কাছে এসে পড়লেন। বাড়ির পথেই শুশানটা পড়ে। শ্মশানে তখন মড়া পোড়ানোর দল শেষ ছাইটুকু রেখে চলে আসার তোড়জোড় করছে।
