ঠিক সেই সময়ে দরজায় কাঁচকাঁচ আওয়াজ হলো। হরর ছবির দৃশ্যের মত। শব্দে সবাই চমকে তাকালেন। ফায়ারপ্লেসের আগুন কমে এসেছে। সেই আলোয় সবাই তাকিয়ে আলতাফ সাহেবের বলা গল্পের সাদা শাড়ির মত কিছু একটা দেখতে পেলেন। সাদা শাড়িটা যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে। কিন্তু স্বল্প আলোয় তাঁরা শাড়ি আর তার মালিককে চিনতে পারলেন। বিমলবাবু সাদা ফতুয়া আর ধুতি পরে এসেছেন। এই আধুনিক যুগেও ধুতি খড়মের প্রচলন রেখেছেন। আর খড়মের খটখট শব্দেই তারা মুখ না দেখেও বলতে পারেন বিমলবাবু এসেছেন।
আলতাফ হোসেন গল্পের হাত থেকে বাঁচার জন্য গলা চড়ালেন, বিমলদা, নিয়মানুযায়ী আজকের গল্পটা আপনারই পাওনা। আপনি সবার শেষে এসেছেন।
এ বিমলবাবু সোজা গিয়ে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসলেন। ফায়ারপ্লেসের দিকে মুখ করে বললেন, ভূতের জন্যই আসতে দেরি হয়ে গেল।
মানে? সবাই সমস্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
বিমলবাবু তার উত্তর না দিয়ে কানে গোঁজা পাতার-বিড়ি বের করলেন। তারপর ফায়ারপ্লেসের ভেতর থেকে জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে বিড়ি ধরালেন। বিড়িতে টান দিয়ে শান্তভাবে বললেন, আসার পথে একটা ভূতের সাথে দেখা হয়ে গেল।
ভূতের সাথে দেখা? কোথায়! কীভাবে? আজমল সাহেব জানতে চাইলেন।
এই তো, এখানে আসার পথে। নতুন শ্মশানঘাটের সামনে। দেখলাম জটলা। শ্মশানে দাউদাউ আগুন জ্বলছে। বুঝতে পারলাম কেউ মারা গেছে। একপাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম হিন্দু মানুষ। শ্মশান যেন কোন এক আকর্ষণে টানে। যখন চলে আসার জন্য পা বাড়িয়েছি, তখনই তাকে দেখলাম। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাটা যে ভূত তা বুঝতে পারিনি। তবে পাগল ঠাউরেছিলাম। পাগল না হলে কেউ পুরোপুরি দিগম্বর হয়ে ওভাবে শ্মশানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
শওকত হোসেন বললেন, তাই বলুন, ভূত না পাগল! ভূত আবার কেউ দেখে নাকি?
তো প্রথমে পাগলই ভেবেছিলাম। কিন্তু ব্যাটা যখন বিড়ি ধরানোর জন্য ওখান থেকেই দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে শ্মশানের আগুনে বিড়ি ধরাল, তখন আমার ভুল ভাঙল।
আপনি ঠিক দেখেছিলেন? আলতাফ সাহেব জানতে চাইলেন।
এক্কেবারে হানড্রেড পার্সেন্ট ঠিক। কারণ তারপরই আমি তাকে ধরে ফেললাম।
ভূত ধরেছিলেন! সত্যি?
হ্যাঁ। তিন সত্যি। ভাবলাম, জীবনে তো কত ভূতের গল্প করলাম। সেই ভূতই যখন জলজ্যান্ত দেখা দিয়েছে, তখন একে ধরেই ফেলি না কেন?
সবাই একসাথে বলে উঠলেন, ভূত ধরা কি অতই সোজা। তা সেই ভূত এখন কোথায়! কোথায় ধরে রেখেছেন?
আরে আগে ভূত ধরার কাণ্ডটাই শোনেন না।
আজমল সাহেব বললেন, সবাই চুপ করে বিমলবাবুর ভূত ধরার গল্পটা শোনেন। ভূত যখন ধরা আছে, তখন সেটা আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পাব, কী বলেন, বিমলবাবু? ভূতটাকে কোথায় আটকে রেখেছেন? গাছের সাথে? আজমল সাহেবের কন্ঠে শ্লেষ ও বিদ্রুপের মিশেল।
বিমলবাবু কোনওদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আলো নিভুনিভু হয়ে আসছে। কিন্তু কেউ সেটা বাড়ানোর চিন্তা করছে না। স্বল্প আলোয় বিমলবাবুর মুখ ভালভাবে দেখা যাচ্ছে না। তিনি শান্ত স্বরে বলতে লাগলেন, ভূত বুঝতে পেরে আমি ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম। কানে গোঁজা বিড়ি বের করে ভূতের দিকে তাকিয়ে বললাম, দাদা, একটু আগুন হবে?
ভূত ভালমানুষের মত বলে উঠল, কেন দাদা, মুখাগ্নি করবেন?
মুখাগ্নি হিন্দুশাস্ত্রের মরণের পরের বিষয় হলেও বিড়িতে আগুনকে আমরা শয়তানি করে মুখাগ্নিই বলি। কাজেই আমি বিড়ি ধরা মুখটা এগিয়ে দিলাম। আর সেই ভূতটা করল কী, তার মুখটাই এগিয়ে দিল। তবে আমার মত করে না। ঘাড় থেকে ভেঙে মুখমণ্ডল হাতের তালুতে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে আমার সামনে বাড়িয়ে দিল। আমি ভেতরে ভেতরে ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও, এরকমভাবে বিড়ি ধরালাম যেন ওরকম কন্ধকাটার বাড়িয়ে দেয়া মাথার মুখ থেকে আমি নিয়মিত বিড়ি ধরিয়ে থাকি।
তারপর কী হলো? ভূতটাকে ধরলেন কীভাবে? কাটা মাথা পাকড়ে?
উঁহু। ভূতের সাথে ভাব-ভালবাসা করে। ভূতেরাও ভালবাসায় পটে যায়। ভূতের বিড়ি শেষ হয়ে এসেছে দেখে, আমার কাছ থেকে একটা বিড়ি অফার করলাম। ভূতটা স্বচ্ছন্দে হাত বাড়িয়ে নিল। তারপর মানুষের গলায় বলল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চিতা জ্বলতে দেখতে দেখতে বিড়িতে সুখটান দেয়ার মত সুখ আর কয়জনের হয়।
আমিও রসিকতা করে বললাম, সবার হয় না, বাপু, আপনার মত দুচারজনের হয়। মরার পরে তো আর সবাই আপনার মত পুণ্যে ভূত হতে পারে না।
ভূতটা হাসল, তা বেড়ে বলেছিস রে, বাছা। কী নাম তোর? তোর সাথে আমার মিলবে খুব। চলে আয় না আমার সাথে, কেউ দেখতেও পাবে না। ধোঁয়ার মধ্যে ওই চিতায় গিয়ে উঠে পড়, তারপর সটান আমার কাছে চলে আয়,
দুজনে মিলে একই বিড়িতে সুখটান দেব।
এখন যেতে পারব না, বাপু। আমার যে একটু কাজ আছে।
মরার চেয়ে কী এমন জরুরি কাজ পড়েছে তোর, বাছা? আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তা হলে গলা টিপে মেরে তোর মত বন্ধুকে আমার সঙ্গী করে ফেলতাম। কিন্তু ভূতেরা কাউকে মারতে পারে না, বড়জোর ভয় দেখাতে পারে। তা তুই যে ভয় খাওয়ার লোক নস, সে তো নিজ চোখেই দেখলাম, বাছা। হাতটা বিশ হাত লম্বা করে শ্মশান থেকে আগুন আনলাম। মাথা খুলে দেখালাম, তবু তুই ভয় পেলি না!
