আমাকে চমকে দিয়ে চোখের পলকে কবরের কাছে ছুটে গেল একতারিনা। কবরটা একটু ভিতরের দিকে, একতা হাত তুলে ইশারায় ডাকল আমাকে। আকাশে পানসে চাঁদ ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমি আবছা আঁধারে তড়িতাহতের মত চেয়ে দেখছি, পাগলের মত দুহাতে কবরের মাটি খুঁড়ছে একতা। পাশেই উঁচু হয়ে আছে বৃহদাকার ক্রুশ চিহ্ন।
তারপর গলা চড়াল একতা। নীল, এদিকে এসো।
বক্সহিলের চারদিকে পাহাড়ের বেষ্টনীতে বাধা পড়ল। একতার কণ্ঠ। অনুরণিত হলো, নী-ই-ই-ল, এ-স্-স্-সো!
আমি ভয় পাচ্ছি। আমার শরীর ঘামতে শুরু করেছে। কানের ফুটো দিয়ে বেরোল গরম হলকা। ভুল দেখছি?
তারপর মুহূর্ত মাত্র। একতাকে আর দেখা গেল না। সেখানে মাথা তুলল অদ্ভুত এক জিনিস! মুণ্ডহীন কঙ্কাল।
আমি ভুলে গেলাম চোখের পলক ফেলতে। কিংবা ভয়ে। বন্ধ করে ফেলেছি চোখ। একতার দেয়া ছবিতে যাকে দেখেছি, সেই ছায়াশরীর কফিনের পাল্লা খুলে বেরিয়ে এসেছে। একতা পাশে নেই। বা আছে ও নেই-এর মাঝামাঝি কোথাও বিরামহীন দুলছে।
কঙ্কালের দাঁতে তাজা রক্ত। দশ গজ খুব বেশি দূরে নয়, তাই বেশ দেখলাম, একতা তখনও দুলছে হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মত। তারপর?
বিভ্রান্ত হলাম, বুঝলাম না আমার ছুটে পালানো উচিত কি না। তবে আমার বিভ্রান্তি বা অনিশ্চয়তা কেটে গেল খুব তাড়াতাড়ি। কারণ সেই রক্তমুখো ছায়াশরীর ক্রমশ এগিয়ে এল আমার দিকে। আমার বন্ধু একতা নিমিষে ভ্যানিশ! নাকি ডুবে গেল সদ্যখোঁড়া কফিনের ভেতর! ওর প্রমাতামহীর কঙ্কাল বুঝি আর কবরে থাকবে না। মিশে যেতে চাইছে লোকালয়ে, জনারণ্যে। আতঙ্কের ঠাণ্ডা স্রোত নামল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। আমি বোধ হয় জ্ঞান হারাচ্ছি।
নিমিষে মনে হলো, চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা। নিতান্ত স্বার্থপরের মত একতাকে ফেলে ছুট দিলাম। অচেনা পথে যেদিকে পারি দৌড়ালাম। বারকয়েক পাথরের চাইয়ে ঠোক্কর খেয়ে পড়লাম মুখ থুবড়ে। তবুও থামলাম না। কারণ, জান বাঁচানো ফরজ।
ভাগ্যিস বিলেতে আসার আগে ড্রাইভিংটা শিখেছি। এবার কাজে লেগে গেল। একতার, বিএমডব্লিউতে চেপে সোজা মোটরওয়ে। তারপর…আর কিছুই মনে নেই।
এ কাহিনীর এখানেই শেষ। তবে কিঞ্চিৎ এপিলগ এখনও বাকি। পরদিন সানডে টাইমস্ লিখল, বক্সহিল গ্রেভইয়ার্ড থেকে কফিন উধাও! এক শ বছর আগের সার্কাস লেডি মিস সিলো সিম্পসনের কফিনে অতর্কিত হামলা। এর পরের খবর সানডে টাইমস জানে না, আমি জানি। আমার প্রিয় বান্ধবী একতারিনাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যাবে না কখনও। সম্ভবত ছায়াশরীর হাপিস করে দিয়েছে তাকে।
হরর ক্লাব – প্রিন্স আশরাফ
হরর ক্লাবের সদস্য হওয়ার একটাই শর্ত-সদস্যকে ভূতের বলতে হবে। এই শর্ত দেয়ার পরে দেখা গেল-ভূতের গল্প জানা বা বলতে পারা লোকের অভাব নেই। তবে টিভি, ডিশ আর ইন্টারনেটের বদৌলতে মানুষের সময়ের বড়ই অভাব। ক্লাবের সদস্য শুরুতে যতজন ছিল, এখন একুনে দাঁড়িয়েছে এগারোজন। তারমধ্যে প্রতিদিন হাজিরা দেয়ার মত পাঁচজনই নিয়মিত আসে। হরর ক্লাবের সদস্যরা মিলে একটা পোডড়াবাড়ির বেসমেন্টে ক্লাবের পরিবেশ তৈরি করে নিয়েছে। পোডড়াবাড়ির ইলেকট্রিসিটির লাইন কাটা, সেটা আর সংস্কারের চেষ্টা কেউ করেনি। মোমের আলোয় গল্পের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। অতিরিক্ত কল্পনাবিলাসী ক্লাবের প্রধান উদ্যোক্তা রিটায়ার্ড অফিসার আজমল সাহেব পরিবেশটাকে আরও গাঢ় করতে বিদেশিদের অনুকরণে ফায়ারপ্লেসের ব্যবস্থা করেছেন। মোমের আলোও দূরীভূত হয়েছে। ফায়ারপ্লেসের আগুনের পাশে বসে ওরা চারজন গল্পখখার অপেক্ষা করছে। পাঁচ নম্বর সদস্যের অপেক্ষা। ওরা। জানে, ঝড়, বৃষ্টি, বাদল, বন্যা, ভূমিকম্প যা-ই হোক না কেন। বিমল হালদার আসবেই। একটা ভুতের গল্প না শুনলে বা বললে ওর রাতে ঘুম হয় না। আজ অবশ্য ঝড়, বৃষ্টি, বাদলা কিছুই নেই, শুধু আলকাতরার মত কালো অন্ধকার রাত।
শওকত সাহেব বললেন, নেন, আলতাফ ভাই, একটা কিছু শুরু করেন, রাত বাড়ছে। আজ আর মনে হয় বিমলদা আসবে না।
মুরুব্বি গোছের আলতাফ হোসেন ফায়ারপ্লেসের আগুনের পাশে বসেছিলেন। তিনি ঝিমধরা আগুনটাকে উস্কে দিয়ে বললেন, শীতের রাতে ফায়ারপ্লেসের আগুনের উষ্ণতা কেমন দেখেছেন? গা যেন পুড়ে যায়।
আজমল সাহেব হেসে বললেন, আপনি আগুনের পাশে বসেছেন বলে অমন মনে হচ্ছে, আমার কিন্তু ঠিকই ঠাণ্ডা লাগছে।
শওকত সাহেব একটু সঙ্কুচিত হয়ে বসে বললেন, তাহলে এদিকে সরে এসে বিমলবাবুর জায়গাটাতে বসুন। কি হে, আলতাফ ভাই, ফাঁকি মারতে চাইছেন নাকি? নেন শুরু করুন, আজ আপনার পালা। তবে বিমলবাবু এলে। তাকেই ধরিয়ে দিতাম। ক্লাবের নিয়মানুসারে আমাদের লেট ফি হচ্ছে, গল্প বলাটা লেটকামারের দিকে চলে যাবে।
আলতাফ হোসেন ফায়ারপ্লেস থেকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, আসলে এটা ঠিক গল্প না। অভিজ্ঞতাই বলতে পারেন, তবে আমার না। আমার এক দাদুর। দাদুর মুখেই শুনেছিলাম। সেভাবেই বলছিঃ তখন শরষ্কাল, অপূর্ব হাওয়া। সবাই সন্ধের দিকে নদীর ধারে বেড়াতে যায়। নদীর দুতীর কাশফলে সাদা হয়ে আছে। হাওয়ায় কাশফুল এদিক-ওদিক দুলছে। দাদু দেখলেন, সেই কাশের সাথে আরও একটা সাদা কী যেন দুলছে! সাদা শাড়ির মত…
