একতা এসব গায়ে মাখেনি। বরং কঠিন নৈর্ব্যক্তিক সুরে বলল, আমাকে সেখানে যেতে হবে। তুমি যাবে কি না বলো। না গেলে আমি একাই যাব। যাবই।
ওর কণ্ঠের কাঠিন্য আমাকে তাড়িত করল। কেন যেন মনে হলো, কোনও সর্বনেশে পথে এগোচ্ছি আমরা। আমি ও একতা এক অমোঘ নির্দেশে ছুটে চলেছি নিরুদ্দেশের দেশে।
কবরখানা কোথায়, জানতে পারি?
জেনে কী লাভ! তামাম লণ্ডনের কতটুকু তুমি চেন! তা ছাড়া, জায়গাটা শহরের চৌহদ্দির ভিতরে নয়, বলা যায় শহরতলী, বা খানিক গ্রামের দিকে।
তাও বলো, জানা থাকলে ক্ষতি কী!
একতা দুর্বোধ্য সুরে বলল, ককফস্টার ফার্মহাউস। ওখানে বক্সহিল বলে একটা জায়গা আছে। একটা পাহাড়, দেখতে বাক্সের মত চৌকো। খুব নিরিবিলি আর সুনসান। যেন কোনও ফিউনেরাল অনুষ্ঠানে বাইবেল পড়ে শোনাচ্ছে।
কখন যাচ্ছি আমরা?
এখনই। নো ওয়েস্ট অভ টাইম। একতার যেন আর তর সইছে না।
লীলায়িত বিএমডব্লিউ চেপে আমরা যখন রওনা হলাম, তখন নেমেছে রাত। লাল-নীল হাজারো রঙে সয়লাব শহর লণ্ডনের অলিগলি। এই শহরের কিছু কিছু রাস্তা এত চাপা, গলি বলেও ঠিক বোঝানো যায় না। এখানে গাড়ির গতি সীমিত। মাখনের মত গলে বেরিয়ে যায় গাড়ি, সড়ক দুর্ঘটনার কেস নেই বললেই চলে।
লণ্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিম ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা কিউ গার্ডেনের ছায়াসুনিবিড় বুনোপথ ধরে সামনে এগোই।
একতারিনা গাড়ি ভালই চালায়। অটো গিয়ার, সুদলি সাঁই-সাঁই করে বাতাস কেটে পেরিয়ে যায় মাইলের পর মাইল। আমাদের দেশের হাইওয়েকে এখানে বলে মোটরওয়ে। কোনও ঝাঁকুনি নেই, কারণ এখানে হাডে পারসেন্ট কাজ হয়। ঠিকাদাররা ঠকবাজি করে না। তাদের বাড়তি পারসেন্টেজ গুনতে হয় না।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক যাবার পর থামল একতা। গাড়ি পার্ক করল বুনো রাস্তার ধারে।
কী ব্যাপার, থামলে কেন! এসে পড়েছি বুঝি?
নো, ডিয়ার! সবে সন্ধে। এখনও অনেকটা বাকি।
চলো তা হলে, এগোই।
যাবো তো। তবে তার আগে গলাটা একটু ভিজিয়ে নেয়া দরকার। হেভি টেনশান হচ্ছে। গাড়ির খাবার পেট্রলও নিতে হবে।
রোডসাইড ইন।
বা ওটাকে পাব বলতে পারেন। নামখানা জবরদস্ত, ফ্যান্টম বারমেড। গা-ছমছমে পরিবেশের সঙ্গে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে। মানে করলে দাঁড়ায়: ছায়াশরীরী মদ্যপরিবেশনকারিণী।
ওসব হার্ড-ড্রিঙ্কস্ গেলা আমার ঠিক আসে না। আমি কিলোখানেক কোক নিয়ে, নিলাম। পানির মত ঢকঢক করে হুইস্কি গিলছে একতা। একেবারে খাঁটি, কিচ্ছু মেশায়নি সঙ্গে।
কফস্টার ফার্মহাউসে গাড়ি থামল রাত একটার কিছু পরে। এখানে বিজলিবাতির কোনও কারসাজি নেই। বোঝা যায়, এলাকাটা নিপাট গ্রাম বা বিরান ভূমি। প্রচণ্ড শীতে গাড়ি থেকে নামতে সাহস হচ্ছে না। যদিও আমরা দুজনেই শরীরের আগাপাছতলা সব মুড়ে নিয়েছি ভেড়ার লোমে তৈরি ওভারকোট, মোটা উলেন র্যাপার আর বাঁদুরে টুপিতে। যেন। নতুন কোনও চন্দ্রযানে চেপে চাঁদের বুকে বাড়ি বানাতে যাচ্ছি। আমরা।
এবার হাঁটতে হবে আমাদের। সামনে ওই যে পাহাড় দেখছ, ওটাই বক্সহিল। ওই পাহাড়ের ওপারের ঢালে সেই গ্রেভইয়ার্ড। ওখানেই হয়তো শুয়ে আছেন আমার সার্কাস লেড়ি প্রমাতামহী।
ওঁর নাম কী ছিল? নেহাত বোকার মত প্রশ্ন করি আমি। পরে মনে হলো, এ প্রশ্নের আদতেই কোনও মানে নেই। এক শ বছর আগে যে মরেছে, তার নামে কী এসে যায়!
একতা বলল, ওঁর নাম সিলো সিম্পসন। অ্যাংলো স্প্যানিশ মহিলা, সার্কাসের দলে কাজ করতেন!
রিয়েলি! সার্কাসে কাজ করতেন মানে, নাচতেন বুঝি?
না, নাচাতেন। মায়ের মুখে শুনেছি তিনি সার্কাসের দলে হিংস্র বাঘেদের নাচাতেন। ওঁর কণ্ঠে নাকি জাদু ছিল। তাবৎ পুরুষেরা ওঁর প্রেমে হাবুডুবু খেত। তবে সিলোর জীবনের শেষটা ছিল বড় করুণ।
মানে! কী হয়েছিল ওঁর?
মানে, স্বাভাবিক হয়নি ওঁর মৃত্যুটা। অনেকে অনুমান করেন, যে সার্কাস টিমে তিনি কাজ করতেন, সেই টিমের মালিক আর চিফ ম্যানেজারের লালসার বলি হন সিলো। এদের কেউ একজন দাদিমার মাকে গলা টিপে বা বিষ খাইয়ে হত্যা করে।
সো স্যাড! আমি যুগপৎ দুঃখ ও বিস্ময় প্রকাশ করি। এটা ইংরেজ কেতা। মানতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে আমরা প্রায় বক্সহিলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। শীত এখন আর তত লাগছে না। সয়ে গেছে। বিড়ালের মত সাবধানে পা ফেলে চলতে হচ্ছে, কারণ বক্সহিল এলাকাটা পাথুরে। মাঝে মাঝে অমসৃণ পাথরের চাই মুখ উঁচিয়ে আছে। এর সামান্য ঘষা বা খোঁচা অ্যাডিডাস ব্র্যাণ্ডের কেডস ফুটো করার জন্য যথেষ্ট।
এর পরের ঘটনা বর্ণনাতীত ও ভয়াবহ। বর্ণনাতীত এই কারণে যে, পুরো দৃশ্যপট আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি, আবার মোটা দাগে বলতে গেলে, তা উপলব্ধিরও বাইরে। বক্সহিল গ্রেভইয়ার্ডের পাশে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, আমি এখানে কেন এসেছি! আমার তো কোনও উপলক্ষ নেই! একতাই বা কেন এল! শখানেক বছর আগে ওর প্রমাতামহী সার্কাস দলের নৃশংসতার শিকার হয়েছে, তাতে এত দিন বাদে মাঝরাতে তার কবর জেয়ারতের কী যুক্তি থাকতে পারে!
আসলে মানুষ যখন ভুল করে, যুক্তি-বুদ্ধির ধার ধারে না বলেই তা করে। আমরা এখন বক্সহিল কবরখানার ঠিক দশ গজের ভিতরে অবস্থান করছি। বিশাল এলাকা জুড়ে কবরখানায় শয়ে শয়ে মানুষের কঙ্কাল নিথর শুয়ে আছে। কার কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, কে জানে!
