এক থুথুরে বৃদ্ধার ছবি বলে ভ্রম হলো। ভ্ৰম, নাকি সত্যি! শীর্ণ দেখতে, লোলচর্ম। বয়স আন্দাজ করা যায়, অন্তত নব্বই। একতা বলেছিল, তার গ্রেট-এ্যানি মারা যান বেশ বয়সে। কেমন করে মারা গেছেন, বা তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল কি না, তা সে বলেনি। এমনও হতে পারে, একতা সে কথা জানেই না।
কবরখানায় ভোলা ছবিটায় এই তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব ক্রমশ প্রকট হলো। তিনি যে একতার পূর্বসুরি, বুঝতে অসুবিধা হলো না। চেহারায় মিল আছে। কেমন এক অদ্ভুত নেশার ঘোরে বারবার ছবির দিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। ছবি থেকে চোখ সরাতে পারছি না। সহসা ব্ল্যাক-আউট, লণ্ডনে যা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। নাকি আমার টেবল-ল্যাম্পের ফিউজ কেটে গেল! চারপাশে প্রগাঢ় আঁধার, অপলক চেয়ে থাকি একতার দেয়া ছবিটার পানে।
সে কী! আমার আশপাশে টের পাই কারও অস্তিত্ব। পায়ের আওয়াজ, নিঃশ্বাসের শব্দ, কিংবা মৃদু অথচ অনুভবযোগ্য আনাগোনা! ভুল শুনছি না তো! সহসাই মনে পড়ল সানডে টাইমসে পড়া গরিক কাসলের সেই প্রেতিনীর কথা। চোখের পাতে কারও ছায়া ভাসছে বুঝি! একতার ছবিতে ছায়াবয়ব আর ওয়েলসের গরিক দুর্গের কার্নিশে ঝুলে থাকা অশুভ অস্তিত্ব আমার সামনে নিমিষেই একাকার হয়ে গেল। বুঝলাম না, আমি সত্যি জেগে আছি, নাকি স্বপ্ন দেখছি কোনও!
অথচ ছবির পেছনের ওই ছায়াশরীরের সঙ্গে একতার চেহারার দারুণ মিল। মনে হয় যেন ওটা একতার ভবিষ্যৎ অবয়ব। আরও বয়স হলে ও দেখতে এমনই হবে।
মনে হলো, একতাকে সেলফোনে ট্রাই করি। জানতে চাই, ওর গ্রেট-এ্যানি দেখতে ঠিক কেমন ছিলেন! একটু আগে যেমন দেখলাম, সে-রকম কি না! বা আদৌ কাউকে দেখেছি কি! পুরোটাই বিভ্রান্তি নয় তো! সন্ধের নাশতাটা বেশ ভারি হয়ে গিয়েছিল আজ! ঝলসানো হরিণের মাংস আর পেশোয়ারি পরোটা। তারপর ভরপেট সফ্ট ড্রিঙ্কস, ক্যাডবেরি চকলেট ডজনখানেক। চকলেট এখানে ভারি সস্তা।
এর পরের ঘটনা বিশ্বাসের অতীত, বলা যায় ঐন্দ্রজালিক। কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে না, কারণ আমি নিজেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তবে ঘটনাটা ঘটেছে, আমার চোখের সামনেই। সিইং ইয বিলিভিং। বিশ্বাস না করে উপায় কী!
পরদিন আলো ফুটতেই একতার ওয়েস্ট হ্যাম্পস্টেডের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। সেন্ট্রাল, সার্কেল ও মেট্রোপলিটন-তিনখানা টিউবলাইন বদল করে অনেকটা পথ গেলে একতার বাসা। এখানেই থাকতেন বিখ্যাত রোমান্টিক কবি জন কিট্স্। হ্যাম্পস্টেড হিথের বাড়িতেই এক উইলো গাছের নিচে বসে কিটস্ লিখেছেন তাঁর মোস্ট ফেমাস গীতিকবিতা: অড টু নাইটিঙ্গেল। এসব কথা এমন আমাকে বলেছে। ওর দাদার সঙ্গে কিটসের বাবার খুব খাতির ছিল শোনা যায়। শুনে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। জন কিটস্ কত বড় মাপের কবি! তিনি লিখেছেন, বিউটি ইয টুথ, টুথ ইয বিউটি। কিংবা আ থিং অভ বিউটি ইয জয় ফরএভার। বিশ্ব-সাহিত্যে সত্য ও সুন্দরের এমন বিশ্বস্ত উপাসক আর হয় না।
একতা বাড়িতে নেই, আমি হতাশ। ভোরে নাকি বেরিয়ে গেছে। কখন ফিরবে, কেউ বলতে পারে না। অথচ একটা প্রশ্ন তাকে আমার করতেই হবে। উত্তর না জানা অব্দি শান্তি নেই। ওর সেলফোন বন্ধ, নরমালি যেমন থাকে। এমন বিরক্তিকর মেয়ে আর হয় না। মেজাজ-মর্জি কখন বিগড়াবে, বোঝার উপায় নেই।
একটা চিরকুট রেখে এলাম একতার বাসায়। এসেই যেন আমাকে কনট্যাক্ট করে। ব্যাডলি নিডেড। কিন্তু তাতেও মনের শান্তি নেই। পাশেই টেকো এক্সপ্রেস থেকে টিউনা স্যাণ্ডউইচ ও কন্টিনেন্টাল বিনস দিয়ে নাশতা সারলাম। তারপর নিরন্তর প্রতীক্ষা। জানতেই হবে, একতার দেয়া। ছবিতে যে গ্রেভইয়ার্ড দেখা যাচ্ছে, ওটা কোথায়। আই নিড টু ভিযিট দ্য প্লেস! আরজেন্টলি। কে সে, কাল গভীর রাতে যে আমার বেডরুমে প্রবেশ করেছিল!
অবশেষে একতাকে যখন পাওয়া গেল, তখন নেমেছে। রাত। শীতের দাপট আজ আরও বেশি। ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। হাঁটুও যেন কথা শুনছে না। পা পিছলে যাচ্ছে। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা। ডিসেম্বরের শেষ দিকে লণ্ডন শহর স্রেফ দোজখ। বিশেষত শীতকাতুরে এশীয়দের জন্য। বলা বাহুল্য, আমি তাদের দলে।
মধ্য লণ্ডনের ওয়ারেন স্ট্রিটে একতারিনার সঙ্গে মোলাকাত হলো আমার। ও তখন ঝোড়ো কাক। এই মেয়েকে আমি চিনি না। চোখ বসে গেছে, ঘোলাটে, চাহনি, কণ্ঠস্বরও বদলে গেছে। ও বলল, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি, নীল। ভাল, তুমি এসে পড়েছ।
কেন, বলো তো?
আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে। তুমি যাবে আমার সঙ্গে? আশা করি আমাকে নিরাশ করবে না, নীল, একতার কণ্ঠে অনুনয়।
জেদি গলায় আমি বললাম, আমিও একখানে যেতে চাই যে! আজই, এক্ষুণি। আমার যে আর কোনও উপায় নেই। এই রহস্য ভেদ না হলে আমার চোখে ঘুম আসবে না।
কোথায় যাবে?
তোমার দেয়া ছবির পটভূমি, সেই কবরখানায়, হিস হিস করে বললাম।
শুনে ও এমন চমকাল, বলার নয়!
অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল একতা। বলল, কী আশ্চর্য! আমিও যে গ্রেভইয়ার্ডের কথাই ভাবছিলাম। ইনফ্যাক্ট, সারাটা দিন আমি ওখানেই ছিলাম।
ফিরে এলে কেন তবে?
কারণ তোমাকেও সঙ্গে চাই। রাতটা বড় নিরাপদ নয়।
তার মানে তুমি ভয় পাচ্ছ, তাই না, একতা! মওকা পেয়ে জবরদস্ত খোঁচা দিয়ে ফেললাম। প্রতিটি পুরুষ জীবনে একবার অন্তত তার অপমানের বদলা নিতে চায়। আমিও সুযোগটা লুফে নিলাম। তখনও জানতাম না, কী ভয়ঙ্কর চমক অপেক্ষা করছে আমার সামনে।
