সর্বনাশ! এ কী অবস্থা! বিস্ময়ে হতবাক মা-ছেলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। সারা বিছানা ভেজা। পানি যা ছিল, সব ভেঙে গেছে। বাইরে তুমুল বর্ষণ। মুলাম ছুটল জোবায়দার কাছে।
জোবায়দা এসে একখানা ইঞ্জেকশন দিল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে আফসানার শরীর। চেঁচিয়ে বলল, একটু আগে নলী
এসে আমাকে ইঞ্জেকশন দিল, এখন আবার তুমি?
কিছু বুঝল না জোবায়দা। সাধ্যমত চেষ্টা করে চলেছে। ও। কিন্তু রোগীর অবস্থা ক্রমশই জটিল হচ্ছিল। এক সময় জোবায়দা আত্মসমর্পণ করল।
খালাম্মা, আফসানার অবস্থা ভাল না। ওর সদরে নিয়ার চিষ্টা করেন। বাচ্চা অনেক বড়, তারপর পানি সব ভাঙে গেছে। বাচ্চা বাঁচে আছে কি না বুঝতিছিনে। এখন ওকে বাঁচাতি হবি।
ও, মা, আমার সানারে বাঁচাও, ও মরে গিলি আমি কিন্তু মরে যাব, বিলাপ করতে থাকল মুলাম।
ও রে, মুলাম, শিগ্গির সরাইল লোক পাঠা, ওর বাপ মারে খবর দে। দুই মা-ছেলে মরা কান্না জুড়ে দিল। ওদিকে আবহাওয়া চরম রূপ নিল।
সন্ধ্যায় আফসানার বাবা-মা এলেন। ধাইমা গুলজানকে সঙ্গে করে। সে দুই-চার গ্রামের অভিজ্ঞ ধাত্রী। আফসানার ভাইবোনরা সবাই তার হাতেই জন্মেছে।
প্রায় সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে আফসানা। ওদিকে দুজন ধাত্রীর অবিশ্রান্ত চেষ্টা চলছে বাচ্চা খালাসের।
দুর্ঘটনাটা ঘটল গুলজানের হাতেই। প্রায় খালাস হয়েই এসেছিল। যদিও বাচ্চা মারা গিয়েছিল আগেই। অতিরিক্ত টানাটানিতে হঠাই ছিঁড়ে এল মাথাটা!
নয়
আফসানার বাঁচার আশা ক্ষীণ। ইতোমধ্যেই মরা কান্না শুরু হয়ে গেছে বাড়িতে। প্রকৃতিও আফসানার শোকে যেন কেঁদে চলেছে নিরন্তর। আঁদরের পুত্রবধূর এ অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনা মানতে চায় না রওশনআরা। সারা জীবন সে মানুষের জন্য করে গেল আর তারই কি না এত শাস্তি। বিরূপ আবহাওয়ায় ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। নিকষ কালো রাত। তখন এমনিতেই তেমন কোন যানবাহন ছিল না ঘোড়াগাড়ি ছাড়া। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় ঘোড়াগাড়ি চলা অসম্ভব।
খাঁটিয়ায় তোলা হলো আফসানাকে। রওশনআরার মত। তার একই কথা, বাঁচাতেই হবে আফসানাকে।
গ্রামের সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকজনকে জোগাড় করা হলো। মড়ার খাঁটিয়া বহনের জন্য। প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো খাটখানা।
খাঁটিয়া চলল মৃতপ্রায় আফসানাকে নিয়ে। পিছনে সব আপনজনেরা। অঝর বৃষ্টি। পথঘাট কাদা-পানিতে মাখামাখি। সবার মাথায় ছাতা, হাতে হারিকেন। গ্রামসুদ্ধ মানুষ চেয়ে থাকল। যেন নিশুত রাতের শবযাত্রা চলেছে…
.
চার দিন পর রোদ উঠল সেদিন। ছিন্ন মাথাটা সমাধিস্থ করা হলো নাদুরিয়া গোরস্থানে। খবর এল, আফসানার জীবন শঙ্কা কেটে গেছে। শিশুটার দেহটা ওখানে গিয়ে সহজেই বের করা। হয়েছিল। ছেলে শিশু ছিল ও। কোন অপারেশনও করতে হয়নি। পরে দেহটাকে সমাধিস্থ করা হয় রাজবাড়ি গোরস্থানে। মড়ার খাঁটিয়া থেকে মৃতপ্রায় আফসানা ফিরল জীবন নিয়ে।
কয়েক বছর পর মুলাম আফসানাকে নিয়ে পাড়ি জমাল ঢাকায়।
দশ
গল্প শুনতে-শুনতে ইনায়া ঘোরের ভেতর চলে গিয়েছিল।
নানু, আফসানা তো তুমি? আর আমার নানুভাই মোত্তালিব হোসেন, তার নাম মুলাম? জানো, নানু, তোমার গল্প শুনে আমি কাঁদছিলাম, তার জন্য খুব মায়া লাগছিল! যাকে আমি দেখিনি, সে-ই তো তোমাকে বাঁচাল। তোমার শাশুড়ি মানে নানাভাইয়ের মা, তাই না? খুব খারাপ লাগছে, আমি তাকে দেখতে পেলাম না, বলল ছোট্ট ইনায়া।
হ্যাঁ, তিনি তোমার বড়মা। আর আমার দ্বিতীয় জনম দেয়া মা ছিলেন। বলে চোখ মুছল আফসানা।
সত্যি তোমাদের জীবন কী কঠিন ছিল!
তোমার ভয় লাগেনি, নানুয়া? প্রশ্ন করলেন আফসানা।
একদম না, বরং মামার মাথাটা দেখতে ইচ্ছে করছে। সে বেঁচে থাকলে তো তৌসিফ মামা সহ আমার আরেকটা মামা থাকত। অদ্ভুত তুমি, কী করে ভেঁড়া মাথাটা তুমি আগেই দেখতে, তার মুখে মা ডাক শুনতে?
এগারো
আজ রাতটাই আছে ইনায়ারা। সকালেই রওনা হবে ঢাকা। ওর মা তানতা ফিরবে আগামীকাল।
বাইরে রুপোর থালার মত একাদশীর চাঁদ উঠেছে। দোতলার ওপর দক্ষিণে খোলা বিশাল শোবার ঘরখানা। নানা, নানুর মাঝেই শোয় ইনায়া। ওরা দুজন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ইনায়ার ঘুম নেই। ও শুধু নানুর ছোট বেলার গল্পটার কথা ভাবছে। হঠাৎ থপথপ শব্দ! ইনায়ার একটু ভয়-ভয় লাগল। বুকের ওপরের লেপটা মুড়ি দিতে টান দিল। এ কী, একটা মাথা! প্রায় ওর বুকের কাছে! বুঝতে বাকি রইল না ওর, এটা কার মাথা, ও তো দেখতেই চেয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকল ওটার দিকে। একসময় চিৎকার করে উঠল ও। নানা-নানু জেগে গেল, জড়িয়ে ধরল। ইনায়াকে।
তুমি কেন ওকে এসব গল্প বলতে গেলে? একটু রেগেই বললেন মুত্তালিব হোসেন।
সরি! নানুয়া আমার, বলেছিলাম তুমি ভয় পাবে।
না, নানু, আমি তেমন ভয় পাইনি। আমি সত্যি মামার মাথাটা দেখেছি। স্পষ্ট চাঁদের আলোয়। তুমি যে বলেছিলে? চিনে পুতুলের মতই। আমার লেপের ওপর। তবে একটু ময়লা ছিল। তুমি বিশ্বাস করো।
বারো
সব গোছানো চলছে, আজই ওরা ঢাকা রওনা করবে। বিছানা থেকে ইনায়াকে উঠিয়ে দিলেন আফসানা। সব ঝেড়ে লেপ কম্বল গোছাচ্ছিলেন।
এ কী? বলে অবাক হয়ে মেলে ধরলেন ধবধবে সাদা লেপটা। দেখো, লেপের কভারে এটা কীসের দাগ?
