মুত্তালিব আর আফসানা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন নিজেদের দিকে। সাদা ধবধবে লেপটার ওপর গোল-গোল ময়লার ছোপ। লেপের ওপর যেন কোন গোল ময়লা কিছু গড়িয়ে গেছে।
চোখ ভিজে উঠল আফসানার! বুঝতে বাকি রইল না। ছোট্ট ইনায়া ভুল দেখেনি।
কালের গর্ভে বিলীন সময়, আত্মা অবিনশ্বর!
এ মায়ার ভুবন, কত কী খেলেন ঈশ্বর,
যুক্তিতে তার মেলে কি তাবৎ উত্তর??
ছায়াশরীর – অরুণ কুমার বিশ্বাস
একতারিনা টেই আমার সঙ্গে পড়ে। লণ্ডন স্কুল অভ বিজনেস, মানব-সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এমএস করছি। মেয়েটা বুদ্ধিতে স্প্যানিশ, মেজাজে আইরিশ, আর দেখতে ইণ্ডিয়ানদের মত। ভীষণ রগচটা একতারিনা। আমি তাকে কখনও একতা, আবার কখনও বা রিনা নামে ডাকি। ও ফিক ফিক করে হাসে। জানতে চায়, একতা বা রিনা নামে আমার কোনও গার্লফ্রেণ্ড আছে কি না।
একতা বা রিনাকে ক্লাসে কেউ তেমন পছন্দ করে না। কারণ ও আইরিশদের মত গোঁয়ার। রেগে গেলে বদলে যায় ওর মুখচ্ছবি। যেন ঠেলে বেরিয়ে আসে লালমুখো মেয়েটার চোখের মণিদুটো। এত বেশি রেগে যায় যে, ওর গলা থেকে যা বেরোয়, তাকে মোষের গাঁক-গাঁক বা বাঘের হক বলেও ঠিক বোঝানো যাবে না। তবে আমি জানি, একতা মেয়েটা নেহায়েত মন্দ নয়। সহপাঠী হিসেবে ও আমাকেই যা একটু মান্যিগণ্যি করে। ক্লাস মিস গেলে আমার কাছে হেল্প চায় একতারিনা।
ওর গায়ের রঙ সাহেব-সুবোদের মত উজ্জ্বল নয়। বরং এশীয়দের মত খানিক শ্যামলিমা আর হরিদ্রাভের মিশেল আছে। হঠাৎ একদিন একখানা ফ্যামিলি ছবি এনে একতা বলল, দেখো তো, নীল, এই ছবিতে কজন মানুষ দেখা যাচ্ছে? ভাল করে, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখবে। ব্যাপারটা সিরিয়াস।
পুরুষানুক্রমে ধনী পরিবারের মেয়ে একতা। যখন যা মন চায়, তখনই তা পেয়ে যায় সে। একতা সেদিন আমাকে ইউনি থেকে ওর স্ব-চালিত বিএমডব্লিউতে তুলে নিয়ে সেন্ট্রাল লণ্ডনের গ্রিনপার্কে এনে ফেলল। খেয়ালি মেয়েটার যখন রোখ চাপে, তখন কারও কথা খুব একটা কানে তোলে না। সত্যি কথা বলতে, মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হলেও ওর দুচোখে নিপাট সারল্য আমাকে আবিষ্ট করে। তাই সব মুখ বুজে সয়ে যাই। আপনারা একে যদি বন্ধুত্ব বলেন, তবে বন্ধুত্ব, প্রেম বললে প্রেম। আসলে একতাকে আপাতত প্রশ্রয় না দিয়ে বুঝি আমার নিস্তার নেই। আর এই ছায়াসঙ্গিনীর মূল রহস্যও সেখানেই।
শীতের শুরুতে হরদম পাতা ঝরছে গ্রিনপার্কে। আবার মাঝে মাঝে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ছাতিম গাছের মত দেখতে লণ্ডন প্লেনের নিচে বসে ছবিটা দেখছি। একতা নন-স্টপ ওয়াকার্স চিপস চিবাচ্ছে। সঙ্গে ঢকঢক করে গিলছে ব্লুবেরি ফলের জুস।
আমি ছবিতে বুদ। একতা যখন বলছে সিরিয়াস, তখন গম্ভীর না হয়ে উপায় নেই। যথাযথ গুরুত্ব না দিলে রেগে গিয়ে হয়তো আমার মাথায় মারবে গাট্টা। ছবিতে দুজন মাত্র মানুষ, ব্যাকগ্রাউণ্ডে শহরের কোনও গ্রেভইয়ার্ডের ছবি। বেশ পুরনোই মনে হয়। ছবি ও শশ্মশান-দুটোই পুরনো।
জায়গাটা কোথায়? একতার চোখে চোখ রাখলাম আমি।
অনুমান করো। অনেক দিন হয় তুমি লণ্ডনে আছ, নীল। ইউ মে গেস! উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ল একতারিনা।
বেকুবের হাসি হাসলাম। কারণ লণ্ডনে পড়তে এসে আর যাই হোক, কবরখানার ব্যাপারে মোটেও উৎসাহ বোধ করিনি। রহস্য ভালবাসি এ কথা ঠিক। জানি না, তুমি বলো, আমি হার স্বীকার করে নিলাম।
একতা তাও সঠিক উত্তর দিল না। বলল, ছবির পটভূমি কোন্ গ্রেভইয়ার্ড, ওটা তোমার গবেষণার বিষয় নয়, নীল। দয়া করে বলল, এই ছবিতে কটা মানুষের অবয়ব দেখছ।
কেন, দুজন! একজন পুরুষ, অপরজন মহিলা। এ নিয়ে গবেষণার কী আছে! ক্রমশ আমার স্বরে উত্তাপ বাড়ছে। মেয়েটা পেয়েছে কী! বাঙালি বলে আমার মেজাজ-মর্জি খুব যে শীতল, তা কিন্তু নয়।
বর্ণময় লণ্ডন প্লেনের একটা পাতা সহসাই খসে পড়ল একতার চুলে। যেন ঠিক। প্রজাপতির মত। মেয়েটা হেঁয়ালিমাখা হাসি উপহার দিল। সত্যি, বিলেতি বিকেলে বড় মোহময় লাগে মেয়েটাকে। একতা সুন্দর, অপাপবিদ্ধ চাহনি ওর। একতার সব ভাল, শুধু ওই আইরিশ মেজাজটা ছাড়া।
ও শ্লেষের সুরে বলল, তুমিও পারলে না! ভেবেছিলাম তুমি পারবে। কারণ তুমি বাঙালি, তোমরা বুদ্ধিমান। এখন দেখছি তুমিও গড়পড়তা মানুষের মত। তলিয়ে দেখার ক্ষমতা বা চোখ তোমার নেই। তুমি হেরে গেলে, নীল, তুমি অ্যাভারেজের দলে।
কথাটায় খোঁচা আছে, বেশ বুঝতে পারি। কিন্তু অসহায়ের মতো কিল খেয়ে কিল চুরি করতে হলো। কারণ ছবিতে দুজন মানুষের ছবি ছাড়া সত্যি আর কিছু দেখতে পাইনি যে! ছবিটা খানিক আবছাও। যদূর মনে হয়, কোনও এক শহুরে কবরখানায় সাঁঝের মুখে উবু হয়ে বসে আছে দুজন মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ। পটভূমি আবছা, তাই ভাল বোঝা যায় না।
এরা কারা, চিনতে পারো? একতার পরবর্তী প্রশ্ন।
সম্ভবত তোমার কোনও রিলেটিভ, সেফ সাইডে থেকে উত্তর দিলাম। নতুন করে অ্যাভারেজ মার্কস পেতে চাইনি।
এটা কোনও উত্তর হলো না। বি মোর স্পেসিফিক। নইলে ফুল মার্কস পাবে না।
তোমার বাবা-মা, কিছু না বুঝেই বললাম।
হলো না। তুমি একটা বুন্ধু। গ্রেভইয়ার্ডের ক্রুশচিহ্ন বা দেয়ালের গায়ে সাঁটা মার্বেলের স্থাপত্য লক্ষ করেছ! ওটা অন্তত এক শ বছরের পুরনো। এ জাতীয় মার্বেল এখন আর বাজারে নেই। সময়ের বিবেচনায় কী করে ছবিটা আমার বাবা-মায়ের হবে!
