হঠাৎ থপথপ একটা শব্দ! আফসানা সচকিত হলো। শব্দটা হচ্ছে খাটের তলায়। এ ঘরে আবার দুতিনটে কুনোব্যাঙ আছে। যদিও ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে, তবু ও ব্যাঙের কথাই ভাবল।।
ওটা কী? স্পষ্ট ওর সামনে, খাটের তলা থেকে বের হলো মাথাটা! ছোট্ট একটা চিনে পুতুলের মত। ধবধবে সাদা চোখজোড়া বন্ধ। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আফসানা। অতিরিক্ত ভয়ে শক্ত হয়ে গেছে ও। হঠাৎ মাথাটা নড়ে উঠল। কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল ও। একটা শিশুর মাথা ওটা। শরীরটা দেখার চেষ্টা করল। না, শরীর নেই বা হয়তো আছে, ও দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ মাথাটা চোখ খুলল। তার মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, মা।
আফসানা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারাল।
মুলাম বউকে সেবা-যত্ন, সঙ্গ দেয়া বাড়িয়ে দিল অনেকগুণ। দিনরাত সানা মানে আফসানাকে আদর-আহ্লাদ করাই এখন ওর প্রধান কর্ম।
ও, মা, তুই আর সন্ধের পর বাইরে থাকবিনে। আমার সানা ভয় পায় যে, আহ্লাদ করে মাকে বলল মুলাম।
হ্যাঁ, তাই তো তুই তোর কাজকম্ম রেখে দিনরাত পাখির সানা নিয়ে আছিস, আবার এখন আমার কাজকম্মও ছাড়তে কচ্ছিস, একটু জোর গলায় বলল রওশনআরা। যদিও আফসানাকে সে-ও কম ভালবাসে না। নিজে অসংসারী হলেও আদরের বৌমাকে সময় দেয়া বা রেধে খাওয়াতে চেষ্টা করে সে।
মুলাম সারারাত বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। হারিকেন নিভিয়ে দিলে ঘরটা একেবারে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার হয়ে যায়। মুলাম মাথার কাছে জানালাটা খুলে দিল। যদিও অন্ধকার রাত তবুও কিছুটা আলো হলো ঘরটা। জানালার পাশে হাস্নাহেনার ঝোঁপটায় অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে। ফুলের গন্ধে ম-ম চারদিক। বুকের মাঝে সানাকে জড়িয়ে আধো ঘুম জাগরণে পাখা দিয়ে বাতাস করছিল মুলাম।
বাতাস আর ফুলের গন্ধে একাকার…আফসানা জানালার ফাঁক গলে আসা হালকা আলো আর বাতাসের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। মুলাম পাখা হাতে ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ জানালার পাশে থপথপ করে শব্দ…
সচকিত হলো আফসানা। স্বামীর হাতটা ভাল করে টেনে নিল বুকের ওপর। ও স্পষ্ট শুনছে মাথার কাছে কেউ চিউ চিউ করে ডাকছে, ম…ম।
ও ঘোরের ভেতর চলে গেল। যদিও শরীর অসাড় তবু ঘুরে তাকাল জানালায়। সেই মাথা! শুধু মাথাটাই দেখা যাচ্ছে জানালায়।
আস্তে টোকা দিল স্বামীকে। মুলাম ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
এই, কী হয়েছে? কী হয়েছে তোমার? আবার কিছু দেখেছ?
কাত হয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে আফসানা। মুখে কোন শব্দ নেই।
দিনকে দিন শরীরটা অবনতির দিকে যাচ্ছে আফসানার। খাওয়া-দাওয়া করে নামে মাত্র। ঘুমও কম। শুধু পেটটা বাড়ছে অতি দ্রুত।
বাড়ির পাশেই পুকুর। মুলাম গেছে হাটে। পুকুরঘাটে বসে আছে রওশনআরা। গোসল করছে আফসানা। একমাত্র গোসল করতেই ওর আরাম বোধ হয় শরীরে। শীর্ণ দেহ, এক মুহূর্ত মা-ছেলে কেউ চোখের আড়াল করে না বউকে। পাছে কোন দুর্ঘটনা ঘটে।
পানিতে ডুব দিল ও। কিছু একটা ওর শাড়ির আঁচলের তলে নড়ে উঠল। ও আস্তে করে আঁচল টান দিতেই মাথাটা মা বলে ডেকে উঠল।
মা-গো, বলে চেঁচিয়ে পাড়ে উঠে এল আফসানা।
সাত
আফসানা এখন ওর প্রিয় পুকুরে আর গোসল করতে নামে না। গোসলখানাতেই গোসল করে। রাতে যত, দম বন্ধই লাগুক জানালা খোলে না; যত জরুরি কাজই থাকুক, কেউ ওকে একা রেখে কোথাও যায় না।
গত রাতে যা মুলামের সামনে ঘটেছে তার কোন ব্যাখ্যা নেই।
গভীর ঘুমের মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে আফসানা। ওই দেখো।
মুলাম ঘুমের মাঝে আঁতকে জেগে চোখ মেলে। ওটা কী? দুজনেই দেখল তীব্র সবুজ আলোর একটা সাপ জড়িয়ে আছে খাটের মশারি স্ট্যাণ্ডের সাথে, আফসানার পাশে। এরকম দ্যুতি ছড়ানো সাপ এর আগে কেউ দেখেছে কি না জানা নেই ওদের।
এ বাড়ির তিনটা প্রাণীই বুঝে গেছে এখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে।
আফসানা বাপের বাড়ি যেতে চাইলে মা-ছেলে দুজনেরই মন খারাপ হয়ে যায়। আর আফসানারও অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। ওদের ছাড়া একবেলাও সে থাকতে পারে না। এখন। দিনের আলোতেও ঘটে চলেছে অদ্ভুত সব ঘটনা।
কাল দুপুর বেলা, আফসানা ঘুমাচ্ছিল মুলামের কোলের মধ্যে। হালকা ঘুমে নিজের কানে শুনল কেউ একজন নিচু স্বরে ওর মাথার কাছে বলে চলেছে…।
আঙুল ভাজা খাবা, খাবা আঙুল ভাজা, খাবা-খাবা! এত ভারী শরীরটা নিয়ে ওর চলাফেরা করা কঠিন। সারাদিন ধরতে গেলে বিছানায়ই থাকে। মুলামের দূর সম্পর্কের এক ফুফু এসেছে। সে-ই আফসানাকে দেখাশোনা করে।
আট
গত রাতে জানালার পাশে মাথাটা আবার দেখেছে আফসানা। ওর প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসছে। কাল গ্রামের একমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী জোবায়দা এসে দেখে গেছে। বলেছে বাচ্চা ভাল আছে। বাচ্চার আকার বেশ বড় গ্রামে সাধারণত ছোট আকারের বাচ্চাই হয়। এত বড় বাচ্চা বাড়িতে প্রসব নিয়ে সে মনে-মনে একটু শঙ্কিত হলেও ওদেরকে কিছু বুঝতে দেয়নি।
আজ তিন দিন ধরে একটানা বৃষ্টি চলছে। মুলাম কোথা থেকে জাল বোনা শিখেছে। সারাদিন ঘরের দোরে বসে বউকে পাহারা দেয় আর জাল বোনে। যে সুচ দিয়ে জাল বোনা হয় স্থানীয় ভাষায় তাকে নলী বলে। ওরকম একটা ঝুলছিল খাটের রেলিঙে। আফসানা বিছানায় শুয়ে থাকে সারাদিন, কেবলি চোখটা বুজে এসেছিল। হঠাৎ খেয়াল করল। নলীটা একা-একাই নেমে আসছে ওর দিকে। সোজা এসে ওর হাতে ইঞ্জেকশনের মত ঘঁাচ করে ঢুকে গেল। চিৎকার করে বসে পড়ল ও।
