গ্রামের আরও সঙ্গীদের সাথে হেঁটে যখন কিশোরী আফসানা স্কুলে পৌঁছত, ওর মুখটা মনে হত, ডালিমের মত ফেটে যাবে।
গোলাপি গায়ের বরন কন্যার, মাথা ভরা কেশ। মৃণাল বাহু। দুই গায়ের রূপসী কন্যা সে। তখনকার দিনে পথে ঘাটে অত রূপসী মেয়ে চোখে পড়ত না। তাই কারও ঘরে রূপসী মেয়ে থাকলে তার খবর ছড়িয়ে যেত গ্রাম থেকে গ্রামে।
আর যদি সে হত উঁচু বংশের মেয়ে, তবে তো কথাই নেই। অমুক বাড়ির মেয়ে গো সে। সাথে যদি হত, গুণবতী, তা হলে তো সোনায় সোহাগা।
রূপবতী, গুণবতী, বড় বাড়ির মেয়ে। মানুষের মুখে মুখে ফিরত আফসানার নাম। ওরা অনেক ভাইবোন। আফসানা সারাদিন গৃহকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকত। ছোেট ভাইবোনদের দেখভাল, মাকে সংসারের কাজে সাহায্য, নিজের লেখাপড়া নিঃশব্দে করে চলত। মা গর্ব করে বলতেন, মাটি কাঁপবে তা আমার বেটি কাঁপবে না। বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়লেন আফসানাকে নিয়ে। প্রায় দিনই দুটো-একটা বিয়ের প্রস্তাব আসে ওর।
তিন
এই, আফসানা, দেখ, মুলাম দাঁড়িয়ে আছে তোর জন্যি। এখন পিছু নেবে আমাদের, দেখিস! কী যন্ত্রণা! প্রতিদিন ছেমড়া তোর জন্যি ওই বটগাছের তলে দাঁড়ায় থাকে। আমরা এলি ও পিছু নেয়। তোর আব্বাকে বলতি হবি। ওই ছেমড়ার মাসের কদিন যায় বুঝবে। মজি চাচা যে মিজাজি মানুষ, ওর টান দে ছিঁড়ে ফেলবিন। বলে আড়চোখে মুলামকে খেয়াল করল মিনু।
তুই বড় বেশি বকিস রে, মিনু। কোনদিক তাকাবিনে। তুই আব্বার কাছে বলে আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা বন্ধ করতি চাস? মিনমিন করে বলল আফসানা।
সরাইল গ্রামের বিখ্যাত হাজীবাড়ি। হাজী সাহেবের বড় ছেলে মজিদ রহমান। এক সময় বাপের জমিদারি ছিল। কালের গর্ভে তা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। জমিদারি না থাকলেও জমিদারি ঠাট-বাট তারা সযত্নে আঁকড়ে আছে। তাদের বাড়ির মেয়ের দিকে সাধারণ ঘরের কেউ চোখ তুলে তাকালে তার যে খবর হবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
ওদিকে নাদুরিয়া গ্রামেরই মেম্বার রওশনআরা। বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁকে ভালবেসেই তার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। মনে বিশ্বাস, তার প্রিয় আওয়ামী লীগ সংগঠনের একজন কাণ্ডারী একদিন সে হবেই!
এমন নিবেদিত প্রাণ, জনদরদি রাজনৈতিক কর্মীর ঘর সংসার হওয়া কঠিন। তারও হয়নি। সুসংসার প্রত্যাশী স্বামী, ছেলে আর মাকে ফেলে আরেক গাঁয়ে ঘর পেতেছে। ওদিকে মুলাম মায়ের যক্ষের ধন, আদরের দুলাল, তাই তো মা তার নাম রেখেছে মুলাম।
মা দিন-রাত গ্রামের জনগণ আর তার চেলা-চামচা নিয়ে মিটিং করে বেড়াচ্ছে। স্বামী ঘর ছেড়েছে, একমাত্র ছেলে যে বাউণ্ডুলে হয়ে যাচ্ছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ছেলের আবদার রক্ষা আর আহ্লাদ দেয়া ছাড়া শাসন বা দায়িত্বে আগ্রহ নেই রওশনআরার।
চার
নাদুরিয়া গ্রামের মেম্বার রওশনআরা এসেছে আফসানাদের বাড়ি। ওর বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে।
আপনার মেয়েটা আমাকে ভিক্ষে দেন, আপা। আমি ওর জীবন দিয়ে হলিও সুখে রাখার চিষ্টা করব। আমার মুলাম যে। ওর না পালি মরে যাবিনি। অনুনয় আকুতিতে রাজি করানোর চেষ্টা করল রওশনআরা আফসানার বাবা-মাকে।
আফসানার মা সম্ভ্রান্ত ঘরের, শিক্ষিত মেয়ে। যথেষ্ট অনুভূতিশীল। তিনি বুঝলেন, স্বামীহারা একমাত্র ছেলের মা, রওশনআরার মনের ব্যথা। তাই তো হাজীবাড়ির সবার বিরুদ্ধে গিয়ে একক সিদ্ধান্তে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন।
অবশ্য তিনি মেয়ে আফসানার ব্যাপারটা জানতেন। মুখচোরা। মেয়ে কিছু না বললেও বুঝতেন মুলামের প্রতি তার দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। মাত্র চোদ্দ বছরের আফসানার বিয়ে হয়ে গেল মুলামের সাথে।
পাঁচ
নাদুরিয়া গ্রামের শেষ সীমা। বিশাল গোরস্থান। আশপাশের দুই-তিন গাঁয়ের লোক মারা গেলে কবর হয় এখানে। প্রায় প্রতিদিনই নতুন-নতুন কবর তৈরি হচ্ছে। এই গোরস্থানের নিকটতম বাড়িখানা মুলামদের। চারপাশে ধু-ধু মাঠ, মাঝখানে বাড়ি। বাড়ির পশ্চিম দিকে কবরস্থান। এ বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়েই মৃতদেহ নেয়া হয় গোরস্থানে। ছোট্ট আফসানা প্রচণ্ড ভীতু। ওদের বাড়িতে বইয়ের লাইব্রেরি ছিল। ছোটবেলা থেকে ভূতের গল্প পড়েছে অসংখ্য। এমন রাজনৈতিক আর ভুতুড়ে পরিবেশে নিজেকে মানানো ওর জন্য কষ্টের। তবু অসম্ভব ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু আফসানা মানিয়ে নেয় সবকিছু।
শাশুড়ি মা ব্যস্ত থাকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে। স্বামী-স্ত্রীর নির্দ্বিধায় স্বচ্ছন্দে চলে দিনমান ভালবাসাবাসি। আফসানা লেখাপড়া, গৃহকর্ম, স্বামী, শাশুড়ি সামলানো সবই করে সুনিপুণভাবে। বৈষয়িক সবকিছু বুঝলেও বোঝেনি তার নিজের শরীর। তিন মাসের গর্ভবতী কিশোরী আফসানা বুঝতেই পারেনি সে মা হতে চলেছে।
সেটা না বুঝলেও শরীর আর মন, পরিবর্তনটা জানান দিয়েছে ভালভাবে। এখন সে আরও ভীতু হয়েছে। কদিন ধরেই ভয়টা ভীষণ বেড়েছে তার। গোরস্থানে যেদিন নতুন কেউ ঢুকছে, সেদিন রাতে আর তার ঘুম হয় না। মুলাম সারারাত পোয়াতি বউকে পাহারা দেয়, যত্ন-আত্তি করে।
ছয়
সেদিন অমাবস্যার রাত। সন্ধ্যা লাগতেই চারদিকে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। মুলাম গেছে উত্তরপাড়া জরুরি কাজে, শাশুড়ি মা গেছে তার মিটিঙে। ঘরে হারিকেন জেলে খাটের ওপর বসে আছে আফসানা। প্রচণ্ড ভয় লাগছে ওর। আজ নতুন একটা কবর হয়েছে। একটু পরেই মুলাম চলে আসবে, সেটুকু সময়ও একা থাকা কঠিন ওর কাছে।
