কী অবাক কাণ্ড! জন্তুটা তাকে মারছে না! বরং আদর। জানাচ্ছে! পশুরা যেভাবে আদরের ভাষা জানায়। নাক দিয়ে তার গায়ের গন্ধ শুঁকছে। জিভ দিয়ে শরীর চেটে দিচ্ছে। গায়ের সঙ্গে গা ঘষছে। চার হাত-পায়ে জড়িয়ে ধরে লুটোপুটি খেলার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ সুযোগ এসে গেল জয়নালের। লুটোপুটি খেলতে গিয়ে জন্তুটার চার হাত-পায়ের বাধন আলগা হয়ে গেছে। সেই সুযোগে জয়নাল লাফ দিয়ে সরে গিয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে নদীতে নেমে পড়ল। জটা তাকে আর ধরার চেষ্টা না করে নদীতটে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল।
সাঁতার কেটে বেশি দূর এগোতে পারল না জয়নাল। ভয়ে-আতঙ্কে টেনে-টেনে শ্বাস নিতে থাকায় নাকের ফুটো দিয়ে শ্বাসনালীতে পানি ঢুকে পড়ছে। ভয়ানক কাশি উঠল। কাশির দমকে শ্বাস টেনে আর কুলোতে পারল না। জ্ঞান। হারিয়ে নদীর গভীরে তলিয়ে গেল।
পরিশিষ্ট
জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নদীর কিনারে চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সের এক যুবককে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তারা তাকে উদ্ধার করে জেলে পল্লীতে নিয়ে যায়। তিন দিনেও জ্ঞান ফেরে না যুবকের। তিন দিন পর। যুবক জ্ঞান ফিরে পেলেও তার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। সে তার নাম-ধাম, পরিচয়, বাড়ির ঠিকানা কিছুই বলতে পারে না। শুধু এটুকুই বলে, অদ্ভুত একটা জন্তু তাকে তাড়া করেছিল। জন্তুটার মুখটা শিয়ালের মত আর গলার নিচ থেকে মেয়েমানুষের মত। আর কিছুই মনে নেই তার। ঘুমের মাঝেও যুবক স্বপ্নে সেই অদ্ভুত জন্তুটাকে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে। স্বপ্নে জন্তুটা তাকে নিতে আসে। অবশ্য সে দাবি করে সত্যি সত্যিই জন্তুটা তাকে নিতে আসে। জন্তুটা তাকে আদর ভালবাসা জানায়। যেন তার সঙ্গে কোনও এক গোপন সম্পর্ক রয়েছে জটার।
.
কিছুদিন ধরে সুন্দরবনের আশপাশের গ্রামবাসীরা ভয়ানক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তাদের গবাদি পশু, পোষা পাখি সহ বিভিন্ন বয়সী মানুষদেরকে কীসে যেন ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। মৃতদেহের পেটটা চেরা থাকে। পেট চিরে কলিজাটা বের করে নেয়া হয়েছে। কেউ বলছে এটা মানুষখেকো কোনও বাঘ বা চিতা বাঘের কাজ। কেউ বলছে মস্তিষ্ক বিকৃত কোনও মানুষের কাজও হতে পারে। কেউ-কেউ আবার দাবি করছে তারা স্বচক্ষে জানোয়ারটাকে দেখেছে। বাঘ বা চিতা বাঘ কিছুই নয়, শিয়াল জাতীয় অদ্ভুত এক জন্তু। ওটার মুখ শিয়ালের মত, আর শরীরের বাকি অংশ মেয়েমানুষের মত। কেউ আবার দাবি করছে ওরকম জল্প একটা নয়, দুটো। এক জোড়া। একটা পুরুষ, অন্যটা মহিলা। মাঝে-মাঝে পুরুষটাকেও দেখা যায়।
গোরস্থানের কাছে – নাশমান শরীফ
এক
ইনায়া সবসময় নানুর সাথেই থাকে। জন্মের পর থেকে নানুই ওর সব, সেটা বুঝে গেছে। বাবা ব্যস্ত তার ব্যবসা নিয়ে, মা কোর্ট আর ক্লায়েন্ট। নানুও ব্যস্ত তার সংসার নিয়ে।
ইনায়া এটুকু জানে, নানুর সংসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও। স্বাভাবিকভাবেই নানুর প্রভাব ওর চরিত্রে অনেকখানি। শান্ত-স্নিগ্ধ নরম পরিপাটি ও, দেখতেও নানুর মতই সুশ্রী।
ওরা থাকে উত্তরায়। নানুর বাড়ি মূল শহর থেকে একটু ভেতরে। তবু প্রতিদিনই নানুকে দায়িত্ব পালন করতে হয় ওর। সেটা কখনও হয়তো নানুকে গিয়ে অথবা ওকে নানুর বাসায় নিয়ে।
চতুর্থ শ্রেণীতে পড়লেও বুদ্ধিতে ভীষণ পাকা ও।
অন্যান্য শিশুদের মত গল্প শুনতে ভালবাসে। ভূতের গল্প। পছন্দ করে ও, তবে একটু বড়দের। নানুর গল্প বলতে হয়। ওকে প্রতিদিন।
ইনায়ার মা তানতা গেছে একটা কনফারেন্স-এ যোগ দিতে সিঙ্গাপুর। আর ও এসেছে গ্রামে। এই প্রথম, নানা নানুর সাথে বেড়াতে।
নানু, তোমাদের গ্রামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। দেখতে গ্রাম হলেও এখানে তো ঢাকার মত সবই আছে। শুধু এসিটা লাগালেই ঢাকা হয়ে যেত। দুপুরে খাওয়া সেরে নানুর কোলের ভেতর শুয়ে বলছিল ইনায়া।
সেটা ঠিকই বলেছ, নানু, এখন আর এই নাদুরিয়া গ্রাম নেই, যেন এক টুকরো শহর। অথচ জানো, তোমার নানুর ছোটবেলা কেটেছে এই বাড়িতেই, কত ভয়ে! টিমটিমে হারিকেনের আলোয় ভূতের ভয়ে কেঁপেছি।
নানু, তুমি কি সত্যি ভূত কখনও দেখেছ?
হ্যাঁ, দেখেছি। শুধু দেখাই না, ভূত আমার অতি আপনজন।
তা হলে তো আজ তোমার আপন ভূত-এর গল্পই শুনব। বলবে না আমাকে?
না, নানু, তুমি যে ভয় পেতে পারো। ওটা তো তোমার শোনা সাধারণ ভূতের গল্প নয়, ওটা সত্যি আপন। ভূত–অতি আপন!
প্রমিয, নানু! আমি একটুও ভয় পাব না, আর দিনের বেলা ভয় কীসের?
তবে তো বলতেই হয়। ভয় পেলে কিন্তু আমার দোষ নেই, নানু।
দুই
প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানা। গড়াই নদীর শাখা নদী-স্থানীয় নাম ছোট নদী। তারই এপারে অপূর্ব সুন্দর সাজানো গ্রাম নাদুরিয়া। হয়তো নদীর পারে বলেই নামটা নদীর সাথে মিলিয়ে নাদুরিয়া। ওপারের গ্রামটা আরও সুন্দর। ওটা সরাইল গ্রাম। তখন গ্রামগুলো ছিল অন্ধকারে ঢাকা এক নিভৃত পল্লী। বিদ্যুৎ ছিল না; রাস্তা, যানবাহন, হাসপাতাল, ডাক্তার কিছু ছিল না। সে সময় আশপাশের গ্রামের মেয়েরা হাইস্কুলে পড়তে যেত গড়াই নদীর পাড়ে পাংশা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে।
ওই স্কুলেরই দশম শ্রেণীর ছাত্রী আফসানা। ও আসত সরাইল গ্রাম থেকে। সেটা ছিল স্কুল থেকে দেড় মাইল মানে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে।
