কী আশ্চর্য! কঙ্কালের পাঁজরের মাঝে একটা হৃৎপিণ্ড দেখা যাচ্ছে! জীবন্ত! ধক-ধক করে হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে।
ঝড়ের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ঝড়ো হাওয়া আশপাশের সব ধুলো-বালি উড়িয়ে আনছে। ওগুলো উড়ে এসে কঙ্কালের গায়ে লেপ্টে যাচ্ছে।
লেপ্টে যাওয়া ধুলো-বালিগুলো ধীরে-ধীরে কঙ্কালের গায়ে রক্ত-মাংস, শিরা-উপশিরা আর চামড়ার রূপ নিচ্ছে। পা থেকে শুরু হয়েছে। প্রথমে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল। এরপর সবগুলো আঙুল। পায়ের পাতা। এক সময় সম্পূর্ণ পা। পর্যায়ক্রমে পা থেকে উপরের দিকে সবগুলো অঙ্গ গড়ে উঠতে লাগল। নমনীয়-কমনীয় মাখনের মত ফর্সা মোলায়েম নারী অঙ্গ।
তান্ত্রিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসতে-হাসতে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, পেরেছি! আমি পেরেছি! আমার সাধনা সফল হয়েছে! আমার মেয়েকে আবার জীবিত করতে। পেরেছি…
সব ঠিকঠাকই হচ্ছিল। কঙ্কালের কাঁধ পর্যন্ত নারীর অঙ্গ সৌষ্ঠবই গড়ে উঠেছে। কাঁধের উপরে গলা থেকে দেখা দিল বিকৃতি। নারীর মুখের জায়গায় গড়ে উঠেছে শিয়ালের মুখ।
তান্ত্রিকের হাসি থেমে গেল। মুহূর্তে তার চেহারায় নেমে এল এক রাশ আতঙ্ক। আতঙ্কিত তান্ত্রিক আর্তচিৎকারের মত করে বলে উঠলেন, একী হচ্ছে?! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! কোথায় ভুল করেছি? আমার মেয়ের মুখের জায়গায়
কেন শিয়ালের মুখ গড়ে উঠেছে?
এবারে হেসে উঠল জয়নাল। হাসতে-হাসতে বলতে লাগল, তান্ত্রিক পঞ্চবক্র, তুই ভেবেছিস কী, আমার বাবা চাচাকে মেরে আমাকে বাধ্য করে তোর মেয়েকে তুই ফেরত পাবি? আমি কোনও প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করব না? শুধু মুখ বুজে সব সহ্য করে যাব? তোর মুখ থেকে শুনে এবং তোর অবর্তমানে তোর ডেরায় থাকা পুরানো পুথি পড়ে এটা বুঝতে পেরেছিলাম আমি যদি কোনও নারীর প্রতি অন্যায় করি, বা নিজের কুমারত্ব নষ্ট করি, তা হলে তুই সফল হতে পারবি না। সেই চেষ্টাই নিই। তুই যখন ধ্যানে থাকিস তখন এই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে কোনও প্রতিতালয়ে গিয়ে নিজের কুমারত্ব নষ্ট করে আসতে চাই। সেই চেষ্টা আমার সফল হয় না। দিনের পর দিন জঙ্গলে ঘুরে মরি কিন্তু জঙ্গল থেকে কিছুতেই বেরোতে পারি না। পথ গুলিয়ে ফেলি। তুই হয়তো নজরবন্দি করে রেখেছিলি। বার-বার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি। হাতে আর সময় থাকে না। আজকের এই রাত এসে যায়। তোকে বিফল করতে কিছুই আর করার থাকে না। আমাকে নদী থেকে, পর-পর তিনটা ডুব দিয়ে স্নান করে আসতে বলিস। নদীতে যাওয়ার পথে হঠাৎ মাথায় খেয়াল আসে। জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় দুটো বাচ্চা সহ একটি মা শিয়ালকে দেখেছিলাম। শিয়ালটার বাসাও দেখেছিলাম। মোটা একটা গাছের খোড়লে। বাচ্চা দুটো বড় হয়ে গেছে। মায়ের অভাবে এখন আর মারা পড়বে না। আমি গিয়ে গাছের খোড়লের ভিতর থেকে শিয়ালটাকে বের করে হত্যা করি। জীবনে প্রথম কোনও জন্তুকে হত্যা। তা-ও আবার একটা মাদী জন্তু। শিয়ালটার রক্ত সারা গায়ে মেখে নদী থেকে গোসল করে আসি। তুই কিছুই বুঝতে পারিসনি। তুই হয়তো মেয়েকে বাঁচিয়ে ভোলার যজ্ঞ নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলি যে কিছুই ধরতে পারিসনি।
চাঁদটা পুরোপুরি গ্রাসমুক্ত হয়েছে। ঝড় থেমে গেছে। চারদিক থমথম করছে। সেই সঙ্গে তান্ত্রিকের মুখটাও।
তান্ত্রিকের মেয়ে বেঁচে উঠেছে। রূপবতী কোনও নারী নয়, অদ্ভুত এক জম্ভ হয়ে। পুরো শরীর মেয়েমানুষের মত, শুধু মাথাটা শিয়ালের।
অদ্ভুত জন্তুটা গা ঝাড়া দিয়ে চার হাত-পায়ে উঠে দাঁড়াল। ক্রোধের হুঙ্কার ছাড়তে লাগল। মুখ থেকে গড়িয়ে নামছে লালা। মুখের দুপাশ থেকে বেরিয়ে পড়েছে লম্বা শ্বদন্ত। হাতে-পায়েও গজিয়ে উঠেছে হিংস্র জন্তুর মত লম্বা সূচালো তীক্ষ্ণ নখ।
তান্ত্রিক আহত গলায় চিৎকার করে উঠলেন, কাজটা তুই ঠিক করলি না। মোটেই ঠিক করলি না। তন্ত্রবিদ্যার কিছুই না জেনে ভুল পদক্ষেপে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তুই ভয়ঙ্কর এক। পিশাচীকে ডেকে এনেছিস। যে পিশাচী নারী এবং শিয়ালীর অস্তিত্বে ভর করে নরক থেকে চলে এসেছে। তুই শুধু তোের আর আমারই বিপদ ডেকে আনিসনি, পুরো মানব জাতির জন্যও বিপদ ডেকে এনেছিস।
তান্ত্রিকের বলা শেষ হবার আগেই শিয়াল এবং নারীর মিশেল, অদ্ভুত দেখতে জন্তুটা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লম্বা-লম্বা সূচালো নখযুক্ত একটা হাত তার পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। রক্তে ভেসে যেতে লাগল তান্ত্রিকের পুরো শরীর। হাতটা টেনে বের করে নিল কলিজাটা। এরপর রক্ত মাখা কলিজাটা কচ-কচ করে চিবিয়ে খেতে আরম্ভ করল।
মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে-করতে তান্ত্রিকের দেহ নিথর হয়ে গেল। ততক্ষণে অদ্ভুত জন্তুটা তান্ত্রিকের কলিজাটাও খেয়ে শেষ করেছে। এবারে ওটা চোখ তুলে তাকাল জয়নালের দিকে।
জয়নাল বুঝতে পারল ওটার লক্ষ্য এখন সে। এক মুহূর্তও আর দেরি না করে সে পড়িমরি করে ছুটতে শুরু করল। জন্তুটাও থেমে রইল না। ধাওয়া শুরু করল। চার হাত-পায়ে চিতা বাঘের গতি ওটার।
ফুটফুটে চাঁদের আলোতে দিগ্বিদিজ্ঞানশূন্য জয়নাল ছুটতে-ছুটতে নদীর পাড়ে এসে পড়ল। কীসের সঙ্গে যেন পা হড়কে চাঁদের আলোতে ঝিকমিক করা নদীতটের বালির উপর আছড়ে পড়ল। সেই সুযোগে ধাওয়া করে আসা অদ্ভুত জন্তুটা তার উপর চেপে বসল।
