জয়নাল ভেবে দেখল তান্ত্রিক তার সম্পর্কে যা বলছেন সব ঠিকই বলছেন। তার সামনে কেউ মুরগি-হাঁস জবাই করতে নিলেও সে ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তাই তার বাবা বাড়িতে কখনও মুরগি-হাঁস জবাই দিতেন না। ছোটবেলা থেকেই তার এই মানসিক সমস্যাটা রয়েছে।
জয়নাল বলল, এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে আপনি আপনার মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দিতে চান, এ কথাটা তো সহজভাবেও বলা যেত। আমার বাবা-চাচাকে হত্যা করে আমাকে বাধ্য না করলেও পারতেন।
সহজভাবে বললে তুই রাজি হতি না।
কেন রাজি হতাম না? আপনার মেয়ে নাকি অসম্ভব রূপবতী!
তান্ত্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার মেয়ে জীবিত নয়, মৃত। মৃত মেয়েকে বিয়ে করতে কেউ কি রাজি হয়?
কথাটা শুনে জয়নালের মুখ হাঁ হয়ে গেল। বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে অস্ফুটে বলল, আপনার মেয়ে মত?!
তান্ত্রিক বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, মৃত। প্রায় দেড়শো বছর আগে মারা গেছে আমার এই মেয়ে। আমি তখন কালী মন্দিরের সাধারণ এক পুরোহিত ছিলাম। মা মরা মেয়ে আমার। তিন দিনের জ্বরে মেয়েটা আমার কুমারী অবস্থায় মারা যায়। মেয়ের মৃত্যুতে মাথা খারাপের মত অবস্থা হয় আমার। প্রাচীন লিপি, পুঁথি এসব নিয়ে আমার অনেক পড়াশোনা ছিল। প্রাচীন এক পুঁথিতে পেয়েছিলাম এক মস্ত অপদেবতা রয়েছেন, যার আরাধনা করে মৃত্যুকে রোখা যায়, মৃত মানুষকে আবার জীবিত করা যায়।
আমি লোকালয় থেকে পালিয়ে জঙ্গলের পরিত্যক্ত এই মন্দিরে এসে সেই অপদেবতার আরাধনা শুরু করি। প্রথমে অপদেবতা আমাকে নিজের মৃত্যুকে পরাজিত করার ক্ষমতা দেন। এরপর ক্ষমতা আসে অন্যকে মৃত্যু শাস্তি দেবার, আমার হাতের এই আঁকা-বাঁকা লাঠির মাধ্যমে। আরও একশো বছর ধরে আরাধনা চালিয়ে যাবার পর মেয়েকে বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতাও আসে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তোর মত নিষ্পাপ এক যুবকের প্রয়োজন পড়ে। যার দ্বারা কোনও দিনও কোনও নারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তেমন এক যুবকের সান্নিধ্যেই পুনর্জীবন লাভ করবে আমার মেয়ে। আবার গড়ে উঠবে তার দেহ। আমার কাঁধে সব সময় এই যে কাপড়ের পুঁটলিটা দেখিস, এটার মধ্যেই রয়েছে আমার মেয়ের অস্থি। এই অস্থির সঙ্গেই তোর বিয়ে হবে। তোর জন্ম তিথিতে। শুক্লপক্ষের তেরোতম রাত্রির পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের মুহূর্তে। খুব শীঘ্রিই আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি।
ছয়
শুক্লপক্ষের তেরোতম রাত। রাত একটা এক মিনিট থেকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবে। শেষ হবে একটা তেত্রিশ মিনিটে। চন্দ্রগ্রহণের এই মুহূর্তে তান্ত্রিকের মেয়ের কঙ্কালের সঙ্গে জয়নালের বিয়ে সম্পন্ন হবে। বিয়ে হবার পরপরই পুনর্জীবন লাভ করবে তান্ত্রিকের মেয়ে। বিয়ের সব আয়োজন শেষ। অপেক্ষা শুধু চন্দ্রগ্রহণের।
জয়নাল নদী থেকে স্নান করে এসেছে। নগ্ন হয়ে পর-পর তিনটা ডুব দিয়ে সেলাইবিহীন এক খণ্ড সাদা কাপড় কোমরে জড়িয়ে, একবারের জন্যও পিছনে না তাকিয়ে সোজা মন্দিরের চাতালে এসে পৌঁছেছে। আসার পথে বার-বারই মনে হয়েছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা তার পিছু-পিছু চলে আসছে। কিন্তু তান্ত্রিকের নির্দেশ মেনে একবারের জন্যও পিছনে তাকায়নি।
মন্দিরের চাতালের ঠিক মাঝ বরাবর দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। আগুনকে সামনে রেখে পদ্মাসনে বসেছেন তান্ত্রিক। আগুনের সামনে লাল সালু কাপড়ের উপর মানুষের আকৃতিতে লম্বালম্বিভাবে বিছিয়ে রাখা হয়েছে তান্ত্রিকের মেয়ের কঙ্কাল। মাথার জায়গায় খুলি, এরপর গলার হাড়, পাঁজরের হাড়, উরুর হাড়, পায়ের জায়গায় পায়ের হাড়-যথাক্রমে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। লাল রঙের এক বিয়ের শাড়ি দিয়ে উপর থেকে ঢেকে দেয়া হয়েছে লাল সালুতে বিছিয়ে রাখা হাড়-গোড়গুলোকে। শুধু খুলিটা বাইরে বেরিয়ে আছে।
তান্ত্রিক উচ্চস্বরে দুর্বোধ্য বিভিন্ন মন্ত্র-তন্ত্র আওড়ে যাচ্ছেন আর সামনে থাকা আগুন একটু পর-পর উসকে দিচ্ছেন। চন্দন কাঠের টুকরো আগুনে ঠেলে দিচ্ছেন, ঘি ঢালছেন, ঢালছেন করমচা তেল, ছিটাচ্ছেন ধূপ-ধুনো আর লোবানের গুঁড়ো সহ আরও যেন কী সব। ওদিকে আগুনের সামনে থাকা কঙ্কালের উপর ছিটিয়ে দিচ্ছেন মন্ত্রপূত জল, আতর-গোলাপজল সহ বিভিন্ন সুগন্ধী।
চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবার ঠিক আগমুহূর্তে তান্ত্রিক জয়নালকে নির্দেশ দিলেন কঙ্কালের উপর গিয়ে বসতে। শবসাধনার ভঙ্গিতে কঙ্কালের পেট বরাবর উঠে বসতে হবে।
জয়নাল তা-ই করল। কঙ্কালের পেট বরাবর উঠে বসল। তান্ত্রিক মন্ত্র-তন্ত্র চালিয়েই যাচ্ছেন। ওদিকে মাথার উপর আকাশে চাঁদটা ধীরে-ধীরে সম্পূর্ণ গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। নেমে আসছে অন্ধকার।
চাঁদ পুরোপুরি গ্রাস হবার পর তান্ত্রিক ওকে নির্দেশ দিলেন কঙ্কালের খুলিতে সিঁদুর মাখিয়ে দিয়ে নেমে আসতে।
জয়নাল কঙ্কালের খুলিতে সিঁদুর মাখিয়ে নেমে এল। চাঁদটাও গ্রাসমুক্ত হতে শুরু করল। আলোর রেখার মত চাঁদের সামান্য অংশ দেখা গেল। সেই রেখা ক্রমেই বিস্তার লাভ করতে থাকল।
গ্রাসমুক্ত হতে থাকা চাঁদের আলো বনভূমিতে এসে পৌঁছতেই প্রচণ্ড দমকা হাওয়া ছাড়ল। চাঁদের গ্রাসমুক্ত হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দমকা হাওয়া ধীরে-ধীরে ঝড়ো হাওয়ায় রূপ নিল। হাওয়ার তোড়ে তান্ত্রিকের সামনের আগুন নিভে। গেল। কঙ্কালটিকে ঢেকে রাখা বিয়ের শাড়িটাও উড়ে গেল।
