জয়নাল নদী থেকে গোসল করে এল। তান্ত্রিক তার খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আস্ত দুটো ঝলসানো বন মোরগ, পোড়া বুনো আলু, আর নানান ধরনের বুনো ফল-মূল।
জয়নাল দেরি না করে খেতে বসল। সারা রাত ধরে হেঁটে আসায় পেটে তার কুমিরের খিদে। খাবার দেখে নিজেকে। আর সামলাতে পারল না।
জয়নাল গোগ্রাসে খাচ্ছে আর তান্ত্রিক দূরে বসে তৃপ্তি ভরা চোখে তার খাওয়া দেখছেন। খেতে-খেতে জয়নালের খেয়াল হলো তান্ত্রিক নিজে কিছুই খাচ্ছেন না। সে বুনো মোরগের রান চিবুতে-চিবুতে বলে উঠল, আপনি কিছু খাচ্ছেন না। কেন?
তান্ত্রিক বললেন, আমার খাওয়ার দরকার হয় না। মানুষ খায় কেন? শরীরে শক্তি জোগানোর জন্য। আমি ধ্যানে বসে সরাসরি সূর্যের আলো আর বাতাস থেকে শক্তি শুষে নিই।
জয়নালের খাওয়া শেষ হলে তান্ত্রিক বললেন, আমি এখন ধ্যানে বসছি। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আমাকে কখনও বিরক্ত করবি না।
জয়নাল কিছু না বলে ওপাশে মাদুরের উপর গিয়ে শুয়ে পড়ল। খুব ঘুম পাচ্ছে তার। চোখ দুটো আর মেলে রাখতে পারছে না।
পাঁচ
তান্ত্রিকের আস্তানায় জয়নালের প্রায় সপ্তাহ দুই কেটে গেছে। প্রতি বেলায়ই তান্ত্রিক তাকে যথা সম্ভব ভাল-ভাল খাবার দাবার দিচ্ছেন। ঝলসানো বন মোরগ, না হয় ঝলসানো হরিণের মাংস, পাখির মাংস, বুনো হাঁসের মাংস, বুনো মহিষের মাংস, কবুতরের মাংস, নদী থেকে ধরে আনা বড় বড় মাছ-কিছু একটা থাকছেই। সেই সঙ্গে সিদ্ধ বুনো আলু, সিদ্ধ কচি বাঁশের কাণ্ড, সিদ্ধ সবজি, মধু, বুনো কলা, আম, লিচু, কাঁঠাল, ডালিম সহ নাম না জানা অনেক বুনো ফল মূল।
তান্ত্রিক এসব খাবার কীভাবে সংগ্রহ করেন সেটা জয়নাল বুঝতে পারছে না। সব সময়ই ধ্যানে মগ্ন থাকেন, অথচ খাওয়ার বেলায় ঠিকই জয়নালের সামনে এসব খাবার পরিবেশন করছেন। অবশ্য এই জঙ্গলে এ সবই পাওয়া যায়।
তান্ত্রিকের আস্তানায় জয়নালের দিনগুলো খুব একটা খারাপ কাটছে না। বলা যায় জামাই আদর পাচ্ছে। কিন্তু তাকে কী জন্য আনা হয়েছে সেটা তান্ত্রিক এখনও বলেননি। জয়নালের মনে ভয় জাগছে, তান্ত্রিকের আস্তানাটা হচ্ছে শত বছরের পুরানো একটা শোন কালী মন্দির, শুনেছে মা কালীর সামনে অনেক সময় নরবলি দেয়া হয়-তান্ত্রিক কি তা হলে তাকে বলি দেবার উদ্দেশ্যে এনেছেন? বলি দেবার আগে খাইয়ে-পরিয়ে হৃষ্ট-পুষ্ট করে নিচ্ছেন? তবে এই মন্দিরের মূর্তির বেদির জায়গাটা খালি। সেখানে কোনও কালী মূর্তি নেই। কোনও এক সময় হয়তো ছিল। কেউ সেটাকে সরিয়ে ফেলেছে বা চুরি করে নিয়ে গেছে।
জয়নাল রাতের খাওয়া শেষ করে উঠল। একট দরেই তান্ত্রিক পদ্মাসনে বসে আছেন। জয়নাল ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার এখানে অনেক দিন হয়ে গেল, কিন্তু এখনও জানতে পারলাম না কেন আমাকে নিয়ে এসেছেন!
তান্ত্রিক আয়েশি গলায় বললেন, সময় হলেই জানতে পারবি। সময় প্রায় হয়ে এসেছে। আর বেশি দেরি নেই।
জয়নাল বলে উঠল, আপনি কি আমাকে বলি দেবেন?
তান্ত্রিক ধমকে উঠলেন, আহাম্মকের মত কথা বলবি না। আমি তোকে বলি দেব কেন? আগেই বলেছি না তোকে পাওয়ার জন্য পৃথিবীর সবাইকে মেরে ফেলতে পারি, কিন্তু তোকে কিছুতেই মরতে দেব না।
তা হলে কেন আমাকে নিয়ে এসেছেন? বলিও দেবেন না, আপনার কী কাজে আমি লাগতে পারি?
আমার মেয়েকে তোর কাছে বিয়ে দেব।
জয়নাল হতবাক হয়ে গেল। মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দেবার জন্য তার বাবা-চাচাকে মেরে তান্ত্রিক তাকে এভাবে নিয়ে এসেছেন!
জয়নাল বসে-যাওয়া গলায় প্রশ্ন করল, আপনার মেয়ে আছে?
তান্ত্রিক কিছুটা বিষাদগ্রস্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ, আমার একটি মেয়ে আছে। পরীর চেয়েও রূপবতী মেয়ে।
জয়নাল বলল, পৃথিবীতে কি ছেলের অভাব আছে? আপনার মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্য আমাকেই বেছে নিতে হলো?
তান্ত্রিক বললেন, তুই ছাড়া পৃথিবীর আর কেউই আমার মেয়ের যোগ্য নয়।
কী এমন আছে আমার মাঝে, যে আমার কাছেই আপনার মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে?
আমার মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্য এমন একটা ছেলের প্রয়োজন ছিল যার জন্ম শুক্লপক্ষের তেরোতম রাত্রির পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের মুহূর্তে। যে জন্মের পরপরই মাকে হারিয়েছে। বড় হয়েছে কোনও নারীর আদর-ভালবাসা আর স্পর্শ ছাড়া। বড় হয়েও কোনও নারীর সান্নিধ্য পায়নি। প্রেম-ভালবাসার সম্পর্কেও জড়ায়নি। হারায়নি কুমারত্ব। অথবা কোনও নারীকে নষ্ট করেনি বা হত্যা করেনি। কোনও মাদী জন্তু জানোয়ারও হত্যা করেনি। একজন নারীকে নষ্ট করা আর হত্যা করা একই ব্যাপার। মোদ্দা কথা, এমন একজন যার দ্বারা কোনও দিনও কোনও নারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অথচ সে কোনও দিন কোনও নারীর ভালবাসা পায়নি। এই সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে তোর মাঝে। তোর জন্ম শুক্লপক্ষের। তেরোতম রাত্রিতে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের মুহূর্তে। জন্মের পরই মা মারা গেছে। বড় হয়েছিস বাবার কোলে। মায়ের অবর্তমানে খালা, ফুপু, মামী, চাচী, নানী, দাদী বা বড় বোন সম্পর্কিত কারও কোলেই বড় হসনি। মুখচোরা লাজুক স্বভাবের বলে বড় হয়েও কোনও নারীর কাছে যাসনি। কোনও মাদী জন্তু জানোয়ারও হত্যা করিসনি। হত্যা করা তো দূরের কথা, কোনও জন্তুকে তোর সামনে অন্য কেউ হত্যা করতে গেলেও ভয়ে পালিয়ে যাস। তা মাদী বা মর্দা যে, কোনও ধরনের জন্তুই হোক।
