জয়নাল বিছানা থেকে উঠে এক গ্লাস পানি পান করে আবার শুয়ে পড়ল।
.
সকালে চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল জয়নালের। আওয়াজটা আসছে বাইরে থেকে।
জয়নাল ঝট করে বিছানা থেকে নেমে বাইরে বেরোল। বাইরে তার দুই চাচাতো ভাই তাদের বাবাকে পাজাকোলা করে গোয়াল ঘরের দিক থেকে নিয়ে আসতে-আসতে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে সবাইকে ডাকছে।
জয়নালও ছুটে গিয়ে চাচাকে ধরল।
চাচাকে সাপে কেটেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি গোয়াল ঘরে গিয়েছিলেন গরু দুটোকে খড় কেটে দিতে। সেখানে কুচকুচে কালো রঙের একটা সাপ তাকে ছোবল মেরে পালিয়ে যায়। তাঁর আর্তচিৎকারে প্রথমে চাচাতো ভাইদের একজন ছুটে যায়। সেই ভাইয়ের চিৎকার শুনে অন্য ভাইটিও জেগে উঠে ছুটে যায়। ততক্ষণে তিনি একেবারে ঢলে পড়েন। সমস্ত শরীর নীলচে রঙ ধারণ করেছে। মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে।
মুহূর্তেই আশপাশের বাড়ির লোকজন জড় হয়ে যায়। একজন চলে যায় সাপের ওঝা ডেকে আনতে। কিন্তু ওঝা আসার আগেই তিনি মারা যান।
চার
মাঝ রাত। জয়নালের ঘুমের মাঝে আবার সেই অদ্ভুত লোকটা এসেছেন।
বজ্রগম্ভীর গলায় বলছেন, এবারে চাচাকেও হারালি, এখনও কি আমার কথায় রাজি হবি না?
জয়নাল বলল, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
আমার কথা না শুনলে একে-একে সবাইকে হারাবি। এরপর পর্যায়ক্রমে তোর দুই চাচাতো ভাই। প্রয়োজনে সমস্ত গ্রাম উজাড় করে ফেলব।
জয়নাল বিস্মিত গলায় বলল, আপনার কথার মানে। বুঝতে পারছি না।
তুই কী ভেবেছিস, তোর বাবার আর চাচার মৃত্যু এমনিতেই হয়েছে? তোর কারণে হয়েছে। তুই আমার কথায় রাজি হসনি বলে তাঁদের মরতে হলো।
জয়নাল অবাক গলায় বলল, আমার কারণে তাদের মৃত্যু হবে কেন?! বাবা মারা গেছেন ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে, চাচা মারা গেছেন সাপের ছোবলে।
পঞ্চবক্র হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, আমার হাতে যে আঁকা-বাঁকা লাঠিটা দেখিস, এটা কোনও সাধারণ লাঠি নয়। এটা সাক্ষাৎ মৃত্যু। এই লাঠি আমি যার নাম বলে ছুঁড়ে মারব তার মৃত্যু ঘটবে। লাঠি মাটিতে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে জীবন্ত হয়ে উঠবে। যাকে মারতে যে রূপের প্রয়োজন সেই রূপ নেবে। তোর বাবাকে মারতে চিলের রূপ, আর চাচাকে মারতে সাপের রূপ নিয়েছিল। তুই যদি আরও মৃত্যু দেখতে চাস কী আর করার! তোকে আমার চাই-ই চাই।
জয়নাল বুঝতে পারল তান্ত্রিক পঞ্চবক্র যা বলছেন ঠিকই বলছেন। তার অনেক ক্ষমতা। তিনি চাইলে সব কিছুই করতে পারেন। সে মরিয়া গলায় বলে উঠল, তারচেয়ে আপনি আমাকেই মেরে ফেলেন।
না, তোকে কিছুতেই মারা যাবে না। তোকে পাবার জন্য পৃথিবীর সবাইকে মেরে ফেললেও, তোকে কিছুতেই মারব না। না অন্য কাউকে তোক মারতে দেব।
আপনি কী চান আমার কাছে?
কতবার বলেছি আমি শুধু তোকে চাই। তোকে নিয়ে যেতে চাই। ইচ্ছে করলে আমি তোকে সম্মোহন করেও নিতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমার কাজ হবে না। তোকে নিজের ইচ্ছেতে যেতে হবে। যতক্ষণ না তুই রাজি হবি, তোকে বাধ্য করার জন্য সব করব আমি।
জয়নাল হার মানা গলায় বলল, ঠিক আছে, আমি আপনার সঙ্গে যাব।
তান্ত্রিকের চেহারায় পরিতৃপ্তির ছাপ দেখা গেল। চোখ দুটো আনন্দে ঝলমল করে উঠল। আয়েশি গলায় বললেন, চল, তা হলে।
.
জয়নাল তান্ত্রিক পঞ্চবক্রের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। নিশুতি রাত। আকাশে ঘোলাটে চাঁদ। চারদিক থমথম করছে। কোথাও কেউ নেই। গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সমস্ত গ্রাম। এমনকী আশপাশে কোনও রাত জাগা কুকুর-বিড়ালও দেখা যাচ্ছে না। যেন কোনও অশুভ শক্তির ভয়ে সবাই লুকিয়ে রয়েছে।
জয়নাল তান্ত্রিকের পিছু-পিছু এগিয়ে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য! চাঁদের আলোতে জয়নালের ছায়া পড়ছে, কিন্তু তান্ত্রিকের ছায়া দেখা যাচ্ছে না।
তান্ত্রিক জয়নালকে নিয়ে গ্রামের উত্তর দিকের শেষ মাথায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। এই জঙ্গল সুন্দরবনের একটা অংশ। এখান থেকে যতই সামনে এগোবে ততই সুন্দরবনের গভীরে চলে যাবে।
তান্ত্রিক জয়নালকে নিয়ে জঙ্গল চিরে এগিয়েই যাচ্ছেন। কোথায় তার গন্তব্য কে জানে! পথ যেন আর ফুরোবার নয়! ক্লান্তিতে জয়নালের শরীর ভেঙে আসছে। বার-বার হাই উঠছে। যেন চলতে-চলতেই সে ঘুমিয়ে পড়বে।
রাত ফুরিয়ে চারদিক ফর্সা হয়ে উঠছে। পাখির কলতানে নতুন একটা দিনের সূচনা হচ্ছে। তান্ত্রিক আর জয়নাল গিয়ে পৌঁছেছে জঙ্গলের মাঝের পরিত্যক্ত এক শ্মশান কালী মন্দিরে। বিশাল জায়গা জুড়ে পলেস্তারা খসে পড়া, শেওলা ধরা, রাজ্যের আগাছা গায়ে জড়িয়ে কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা কাঠামোটা। কমপক্ষে দেড়-দুশো বছর আগে হয়তো শ্মশানের পাশ ঘেঁষে কেউ এই মন্দির নির্মাণ করেছিল। এখন অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে গত একশো বছরেও কেউ হয়তো এই মন্দিরের চাতালে পা রাখেনি। শ্মশানেও হয়নি কোনও শবদেহ পোড়ানো।
তান্ত্রিক জয়নালকে মন্দিরের ভিতরে এক গুপ্ত কামরায় নিয়ে গেলেন। এটাই বোধহয় তান্ত্রিকের ডেরা। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
তান্ত্রিক বললেন, আমার সঙ্গে এখানেই থাকবি তুই।
জয়নাল কিছু বলল না। পথশ্রমে তার শরীর ভেঙে আসছে।
তান্ত্রিক বললেন, যা, নদী থেকে স্নান করে আয়। মন্দিরের পাশ ঘেঁষেই একটা নদী বয়ে গেছে। পঞ্চাশ-ষাট হাত এগোলেই নদীটা দেখতে পাবি। ততক্ষণে আমি তোর খাওয়ার ব্যবস্থা করছি।
