রিহান ম্যাপটা ভাঁজ করে পকেটে রাখে, তাকে এই জায়গাটি আগে খুঁজে বের করতে হবে, এই রহস্যের সমাধান না করে সে মারা যেতে পারবে না।
ঘণ্টাখানেক মোটরবাইকে গিয়ে রিহান পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাল, এখান থেকে বাকিটা তার হেঁটে যেতে হবে। এবড়োখেবড়ো পাথরে পা দিয়ে সে পাহাড়ে উঠতে থাকে, কিছুক্ষণের মাঝেই সে গরমে ঘেমে ওঠে। পানির বোতলে পানি কমে আসছে। সে সাবধানে দুই এক চুমুক খেয়ে বাকি পানিটুকু বাচিয়ে রাখতে চেষ্টা করল, তাকে কতদূর যেতে হবে কে জানে। ঘণ্টাখানেক উপরে উঠে সে তার ম্যাপটি খুলে তাকাল, পথ ভুলে সে অন্য কোনোদিকে চলে যাচ্ছে না এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করার জন্যে। কনট্র ম্যাপে দেখানো আছে সামনে একটা ছোট পাহাড় ডান দিকে খাড়া নেমে যাবার কথা, রিহান তাকিয়ে সামনের ছোট পাহাড় এবং ডান দিকে খাড়া ঢালুটি দেখতে পেয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল। সামনের ছোট পাহাড়টি পার হবার পর একটা ঢালু জায়গা থাকার কথা, তারপর হঠাৎ খাড়া উপরে উঠে গেছে, সেই খাড়া বেয়ে উঠে গেলেই নির্দিষ্ট জায়গাটা পেয়ে যাবে। রিহান সূর্যের দিকে তাকাল, যদি কোনো ঝামেলা না হয় সূর্য ডুবে যাবার আগেই সে সেই রহস্যময় জায়গায় পৌঁছে যাবে।
রিহানের হঠাৎ একটা বিচিত্র কথা মনে হল, এমন যদি হয় যে সে গিয়ে দেখে যে জায়গাটি এই বিচিত্র বৃত্তের কেন্দ্র সেটি আসলে পুরোপুরি বিশেষত্বহীন একটা জায়গা তা হলে কী হবে? রিহান জোর করে চিন্তাটি মাথা থেকে সরিয়ে দেয়–এটি হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত রিহান যখন নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছেছে তখন সে কুলকুল করে ঘামছে। পাহাড়ের উপরে বেশ খানিকটা জায়গা তুলনামূলকভাবে সমতল, রিহান সেখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে ঘুরে তাকাল। অনেকটুকু উপরে উঠে এসেছে, সূর্যের শেষ রশ্মি পড়ে দূরে মরুভূমির এই এলাকাটিতে এক ধরনের লালচে আভা, হঠাৎ দেখে মনে হয় এটি বুঝি পৃথিবীর কোনো অংশ নয়–মনে হয় এটি কোনো পরাবাস্তব জগতের অংশ। রিহান পুরো এলাকাটি ঘুরে দেখতে শুরু করে। তার ভেতরে এক ধরনের আশা ছিল যে এখানে সে কোনো একটা ঘর বা দালান দেখবে, কিন্তু এখানে সেরকম কিছু নেই। সে প্রায় আশা হারিয়ে ফেলছিল কিন্তু হঠাৎ করে সে বুঝতে পারল জায়গাটি আসলে বৈশিষ্ট্যহীন নয়, এর একটা বৈশিষ্ট্য আছে–জায়গাটি তুলনামূলকভাবে সমতল এবং হঠাৎ করে প্রকৃতিতে এত বড় সমতল আর মসৃণ জায়গা পাওয়া যায় না। শুধু যে সমতল তাই নয়, জায়গাটি বৃত্তাকার, মনে হয় বেশ যত্ন করে এই অংশটুকু এভাবে তৈরি করা হয়েছে।
রিহান বৃত্তাকার জায়গাটির ঠিক মাঝামাঝি জায়গাটুকু খুঁজে বের করে নিচে তাকাল এবং হঠাৎ করে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করল সেখানে একটা গোলাকার ধাতব ঢাকনা। রিহান উত্তেজিত হয়ে ওঠে, কোনোভাবে ধাতব অংশটুকু টেনে তোলা যায় কি না চেষ্টা করে দেখল, কিন্তু মসৃণ ধাতব অংশটুকু পাথরের সাথে মিশে আছে, এটাকে টেনে তোলার কোনো উপায় নেই। রিহান তখন ধাতব অংশটিতে হাত দিয়ে থাবা দিল সাথে সাথে ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো একটা শব্দ ভেসে এল। রিহান নিশ্বাস বন্ধ করে আবার একবার থাবা দিতেই আবার প্রতিধ্বনির মতো শব্দটি শোনা গেল। রিহান এবারে দ্রুত দুবার থাবা দেয় সাথে সাথে ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো শব্দ শোনা যায় এবারে শব্দটি আসে চারবার। রিহান নিঃসন্দেহ হয়ে গেল যে সে সত্যি সত্যিই রহস্যময় জায়গাটি খুঁজে পেয়েছে। সে এবারে তিনবার থাবা দিল সাথে সাথে ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো শব্দ আসতে থাকে পরপর নয়বার শব্দ হয়ে থেমে গেল। সে যতবার শব্দ করছে তার বর্গ সংখ্যক শব্দ ফিরে আসছে। ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার জন্যে সে চারবার শব্দ করল, ভেতর থেকে এবার যোলবার প্রতিধ্বনি ফিরে আসার কথা। সত্যি সত্যি মোলবার প্রতিধ্বনি ফিরে এল। রিহান নিজের ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করে, এই রহস্যময় জায়গাটির সাথে যোগাযোগ করার একটি পথ হয়তো সে খুঁজে পাবে। কী করবে যখন ঠিক করতে পারছে তখন হঠাৎ করে ভেতর থেকে একবার শব্দ ভেসে এলএবার তাকে কেউ পরীক্ষা করছে। রিহান পাল্টা একবার শব্দ করল। ভেতর থেকে এবার দুবার শব্দ হল, রিহান দুয়ের। বর্গ চারবার শব্দ করল। ভেতরে কী আছে সে জানে না, কিন্তু সেটি এবারে তিনটি শব্দ করল। রিহান গুনে গুনে নয়বার শব্দ করল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা, এবারে ভেতর থেকে চারটি শব্দ হল, রিহান গুনে গুনে পাল্টা ষোলটি শব্দ করল।
সাথে সাথে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটতে থাকে, পুরো এলাকাটা থরথর করে কাঁপতে থাকে। রিহান চমকে উঠে দাঁড়ায় তারপর লাফ দিয়ে পিছনে সরে যায়। সে বিস্ফারিত চোখে দেখে পাথরের মাঝখান একটা চতুষ্কোণ জায়গা যেন ফেটে বের হয়ে উঠে আসতে শুরু করেছে। ভোঁতা একটা শব্দ করে এক মানুষ উঁচু একটা চতুষ্কোণ ধাতব অংশ বের হয়ে হঠাৎ করে থেমে যায়। রিহান নিঃশব্দে কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানে ঢোকার কোনো জায়গা আছে কি? রিহান চারপাশে একবার ঘুরে দেখল, কোনো দরজা নেই, কিন্তু এক পাশে একটা সবুজ বোতাম। খানিকক্ষণ চিন্তা করে সে বোতামটা স্পর্শ করে। কিছু হল। না দেখে বোতামটা চাপ দিল সাথে সাথে একটা যান্ত্রিক শব্দ করে তার সামনে একটা দরজা খুলে গেল, ভেতরে একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।
