সেই ম্যাপে কমিউনগুলো দেখানো আছে?
নেই। কিন্তু ঈশ্বরী প্রিমার কাছে একটা তালিকা আছে। তার ঘরের দেয়ালে টাঙানো থাকে। সেখানে কমিউনগুলোর অবস্থান বলা আছে।
গ্রুস্তান ভুরু কুঁচকে নীলনের দিকে তাকাল, তুমি কেমন করে জান?
নীলন বলল, আমি জানি। আমি তার ঘরে গিয়েছি। তার ঘরের সবকিছু ভেঙেচুরে দিয়ে গেছে। কিন্তু কাগজপত্রগুলো আছে।
রিহান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, তা হলে আমাকে ম্যাপটি আর এই কমিউনের তালিকাটি দাও। আমি ঈশ্বরী প্রিমাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ধরা দেব। এই মুহূর্তে।
কেউ কোনো কথা বলল না। রিহান সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা আমার জন্যে শুভ কামনা কর যেন আমি ঈশ্বরী প্রিমাকে ফিরিয়ে আনতে পারি।
কেউ এবারেও কোনো কথা বলল না।
রিহান আবার বলল, তোমরা কি আমার জন্যে শুভ কামনা করবে না?
নীলন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, যে মানুষটি মারা যাবার জন্যে যাচ্ছে তার জন্যে শুভ কামনা করা যায় না। শুভ মৃত্যুদণ্ড বলে কিছু নেই রিহান।
কমবয়সী একটি মেয়ে হঠাৎ অপ্রকৃতস্থের মতো হেসে উঠে বলল, শুভ মৃত্যুদণ্ড হি–হি–হি।
রিহান বিস্ফারিত চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
৭. বৃত্ত
রিহান মোটরবাইকটি নিয়ে পাথুরে প্রান্তরের উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। মরুভূমির উত্তপ্ত বাতাসের হলকা চোখে–মুখে এসে লাগছে, ম্যাপ অনুযায়ী সামনে একটা উঁচু পাহাড় আসবে সেটা ঘুরে ডান দিকে যেতে হবে। কমিউনগুলো কোথায় সেটা সে কনট্যুর মেপে বসিয়ে নিয়েছে, একটার পর আরেকটা কমিউন খুঁজে খুঁজে যেতে হবে।
মোটরবাইকে ছুটে যেতে যেতে রিহান বুঝতে পারে কিছু একটা ব্যাপার তাকে খানিকটা বিচলিত করে রেখেছে কিন্তু সেটি কী সে ঠিক ধরতে পারছে না। যাকে সবাই ঈশ্বরী প্রিমা হিসেবে জানে সে যে খুব দুঃখী অসহায় বাচ্চা একটি মেয়ে সেটি রিহান ছাড়া আর কেউ জানে না। এই মুহূর্তে সে মাথা থেকে সেটি সরিয়ে রেখেছে। সে যখন প্রভু ক্লডের
কমিউনে হাজির হবে তখন তাকে যে হত্যা করা হবে কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে সেটাও তাকে সেরকম বিচলিত করছে না। একটু আগে সবাই মিলে তাকে যেভাবে অপমান এবং লাঞ্ছনা করেছে সেই গ্লানিটুকুও এই মুহূর্তে তার মাথার মাঝে নেই। সবকিছু ছাপিয়ে অন্য একটি বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটেছে বলে তার মনে হচ্ছে কিন্তু সেটা কী রিহান ঠিক ধরতে পারছে না। তার পকেটে রাখা ম্যাপের মাঝেই বিস্ময়টুকু লুকানো আছে বলে তার কাছে মনে হচ্ছে কিন্তু সেটি কোথায় ঠিক বুঝতে পারছে না। রিহান অন্যমনস্কভাবে মোটরবাইকটি ছুটিয়ে নিতে নিতে পাহাড়ের ঢালে একটা ছায়া ঢাকা জায়গা দেখে থেমে গেল। কোমরে ঝোলানো পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে সে পকেট থেকে ম্যাপটা বের করে আবার সেই ম্যাপের দিকে তাকাল। বেশ বড় একটি নিখুঁত কনট্র্যর ম্যাপ, এই পুরো এলাকাটি খুব চমৎকারভাবে দেখানো রয়েছে। রওনা দেবার আগে সে বেশ কয়েকটি কমিউনের অবস্থান ম্যাপের মাঝে বসিয়ে নিয়েছে, মোটামুটি আধবৃত্তাকারভাবে ছড়িয়ে আছে। রিহান কিছুক্ষণ ম্যাপটির দিকে তাকিয়ে থেকে পকেট থেকে অন্য কমিউনের অবস্থানগুলো বের করে ম্যাপের মাঝে বসাতে থাকে। কিছুক্ষণের মাঝেই রিহান তার। বিস্ময়ের কারণটুকু বুঝতে পারে। সবগুলো কমিউনের অবস্থান একটা নিখুঁত বৃত্তের উপর। কী আশ্চর্য!
রিহান হতচকিত হয়ে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকে, এটি কেমন করে সম্ভব? একটি কমিউন কিছুক্ষণ এক জায়গায় থেকে স্থান বদল করে অন্য জায়গায় যায়। সব সময়েই সবাই ভেবে এসেছে এই স্থান বদলগুলোতে কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু সেটা সত্যি নয় তারা নিখুঁত একটা বৃত্তের উপর থাকে। রিহান তার হাতের তালিকাটি দেখল, বিভিন্ন কমিউন আগে কোথায় ছিল সেগুলোও এখানে দেওয়া আছে। রিহান ধৈর্য ধরে সেগুলোও ম্যাপে বসাতে থাকে এবং বিস্মিত হয়ে দেখে সেগুলোও এই বৃত্তের মাঝে! কখনোই বৃত্তের বাইরে নয়। যার অর্থ গত অর্ধশতাব্দী থেকে সবগুলো কমিউন বৃত্তাকারে ঘুরছে। কী আশ্চর্য!
রিহান ম্যাপটির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে বুঝতে পারে এটি বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনা নয়, এবং হঠাৎ করে এটি ঘটে নি এর পেছনে একটা কারণ আছে। রিহানকে কেউ বলে দেয় নি কিন্তু সে জানে কারণটি নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ। রিহান আকাশের দিকে তাকাল, সূর্যটা ঢলে পড়তে শুরু করেছে। বেলা থাকতে থাকতে পৌঁছাতে হলে তার এখনই আবার রওনা দেওয়া উচিত, কিন্তু এই বিচিত্র রহস্যটির একটা কিনারা না করে সে কেমন করে যাবে? সে তো এ জীবনে আর কখনো এই রহস্যটি সমাধান করতে পারবে না।
রিহান আবার ম্যাপের দিকে তাকাল, এই এলাকায় অসংখ্য কমিউনের মানুষেরা জানে না তারা একটি বিশাল বৃত্তের পরিধি বরাবর ঘুরছে। সেই বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো তার মনে হল এই বৃত্তটির একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র রয়েছে, আর সেই কেন্দ্রটিতেই নিশ্চয়ই রহস্যের সমাধান লুকিয়ে আছে। কমিউনের সব মানুষ যে কেন্দ্রটিকে নিয়ে ঘুরছে সেই কেন্দ্রটি নিশ্চয়ই সাধারণ জায়গা নয়–নিশ্চয়ই সেটি একটি অসাধারণ জায়গা, নিশ্চয়ই এই জায়গাটির একটা অস্বাভাবিক গুরুত্ব আছে।
রিহান ম্যাপটির ওপর ঝুঁকে পড়ল, বৃত্তের পরিধিকে সমান দুভাগে ভঁজ করে বৃত্তের একটা ব্যাস বের করে নেয়। দ্বিতীয়বার অন্য একটি অংশে ভাঁজ করে দ্বিতীয় একটা ব্যাস বের করে নেওয়ার সাথে সাথে দুটি ব্যাসের সংযোগস্থলে বৃত্তের কেন্দ্রটি বের করে ফেলল। কেন্দ্রটি পড়েছে সামনে যে পাহাড়ের সারি আছে তার ভেতরে কোনো একটি ছোট পাহাড়ের উপর। আলাদা করে সেটিকে বোঝার কোনো উপায় নেই, এর কোনো বিশেষত্ব আছে সেটাও বোঝার উপায় নেই, শুধুমাত্র এই ম্যাপটির দিকে তাকালে এই জায়গাটার গুরুত্বটা ভয়ানকভাবে চোখে পড়ে।
