রিহান একটা নিশ্বাস ফেলল, ঠিক কেন জানা নেই হঠাৎ কৌতূহল ছাপিয়ে তার ভেতরে একটা চাপা ভয় উঁকি দেয়। কী আছে ভিতরে? সে যদি ভেতরে আটকা পড়ে যায়, যদি আর কোনোদিন বের হতে না পারে? সে যে সবাইকে কথা দিয়ে এসেছে প্রভু ক্লডের কাছে ধরা দিয়ে ঈশ্বরী প্রিমাকে মুক্ত করে আনবে?
মাথা থেকে সব চিন্তা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে রিহান ধীরে ধীরে সিঁড়িতে পা দিলে সাথে সাথে পেছনের দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল। সে কি আর কখনো বের হতে পারবে? রিহান একমুহূর্ত অপেক্ষা করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। প্রায় চল্লিশটি ধাপ নিচে একটা চতুষ্কোণ জায়গা। একপাশে অধস্বচ্ছ কাচের দরজা। ভেতর থেকে হালকা নীলাভ আলো বের হয়ে আসছে। রিহান কান পেতে শুনল খুব হালকা এক ধরনের যান্ত্রিক গুঞ্জন, এ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। সে সাহস সঞ্চয় করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে উঠল। বড় একটি ঘরের এক কোনায় একটি চেয়ার, চেয়ারে মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বসে আছে। রিহানকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে মানুষটি মাথা তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস কল, কে?
ভয়ংকর আতঙ্কে রিহান ছুটে বের হয়ে যাচ্ছিল, অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে নিয়ে সে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
মানুষটি তাকে দেখার চেষ্টা করতে করতে উঠে দাঁড়াল, তারপর দুই পা এগিয়ে এসে সহৃদয়ভাবে বলল, এস, ভেতরে এস।
রিহান অনেক কষ্ট করে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে ঢুকল। মানুষটি তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার নাম কী ছেলে?
রিহান একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, রিহান।
রিহান?
হ্যাঁ।
চমৎকার। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হয়েছি রিহান। আমি তোমার জন্যে দুই শ তিরিশ বছর থেকে এই চেয়ারে বসে আছি।
রিহান একটা আর্ত শব্দ করে বলল, দুই শ তিরিশ বছর?
হ্যাঁ। আমার জন্যে সেটি কোনো সমস্যা নয়। কারণ আমি সত্য মানুষ নই। আমি একটা হলোগ্রাফিক ছবি। মানুষটি হাত তুলে দুই পাশে দেখিয়ে বলল, ঐ দেখো দুই পাশ থেকে লেজারের আলো এসে সুষম উপস্থাপন করে আমাকে তৈরি করেছে।
রিহান বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল, যে মানুষ নিজে দাবি করছে সে সত্যি নয় তার সাথে কথা বলা যায় কি না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়।
হলোগ্রাফিক মানুষটি বলল, তুমি খুব অবাক হচ্ছ? আমার হিসাব অনুযায়ী তোমার অবাক হবার কথা। আমার মনে হয় তোমার সাথে আমার খোলাখুলি কথা বলা দরকার।
রিহান তবু কোনো কথা বলল না। হলোগ্রাফিক মানুষটি একটু হেসে বলল, তোমার ভয় পাবার কিছু নেই রিহান। তুমি এখানে খুব নিরাপদ। আমি সবকিছু জানি, আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব।
আমাকে সাহায্য করতে পারবে?
হ্যাঁ। রিহান তুমি এই চেয়ারটায় বসো। হলোগ্রাফিক মানুষটা ঘরের অন্যপাশে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, তুমি ইচ্ছে করলে আমার শরীরের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে যেতে পার।
রিহান তবু দাঁড়িয়ে রইল। হলোগ্রাফিক মানুষটি বলল, এস রিহান। তোমার সাথে আমার কথা বলা দরকার।
রিহান সাবধানে হেঁটে হলোগ্রাফিক মানুষটার কাছে গিয়ে তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল, দেখল সত্যিই সেখানে কিছু নেই, তার হাতে শুধু রঙিন আলো এসে পড়ছে।
মানুষটি হেসে বলল, দেখেছ? ভয়ের কিছু নেই। যাও, তুমি গিয়ে বস।
রিহান জিজ্ঞেস করল, কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
আমি তোমাকে বলব। এর মাঝে অলৌকিক কিছু নেই–এটি বিজ্ঞানের ব্যাপার। সহজ বিজ্ঞান। এস।
রিহান সত্যি সত্যি মানুষটার ভেতর দিয়ে হেঁটে ঘরের অন্যপাশে একটা চেয়ারে বসল। এখনো পুরো ব্যাপারটা তার বিশ্বাস হচ্ছে না। মানুষটি তার সামনে একটা চেয়ারে বসে কথা বলতে শুরু করে।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল দুই শ তিরিশ বছর আগে। পৃথিবীতে তখন ছয় বিলিয়ন মানুষ, ইকুয়িনা নামে ভয়ংকর একটা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর সব মানুষ কয়েক সপ্তাহের মাঝে মরে শেষ হয়ে গেল। ভাইরাসের সংক্রমণ হবার পর মারা যেতে দুই সপ্তাহের মতো সময় নেয়। পৃথিবীর কিছু বিজ্ঞানী তাদের জীবনের শেষ দুই সপ্তাহের সময়ে ভবিষ্যতের মানুষের জন্যে এটা তৈরি করে গিয়েছিলেন।
এই প্রজেক্টটি তৈরি করা হয়েছিল আন্তঃনক্ষত্র মহাকাশ ভ্রমণের জন্যে। মানুষ যখন আন্তঃনক্ষত্র পরিভ্রমণে যাবে সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যেতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে কী হবে কেউ জানে না, বংশানুক্রমিক ধারাবাহিকতা থাকলে ভালো কিন্তু কোনো কারণে সেই মহাকাশচারীরা যদি নিজেরা যুদ্ধবিগ্রহ করে মারা যায়, যদি শুধু কিছু ছোট শিশু বেঁচে থাকে তখন কী হবে? তারা বড় হয়ে পৃথিবীর এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের কিছুই পাবে, নিঃসঙ্গ একটি মহাকাশযানে বিচিত্র একটি পরিবেশে বড় হবে। পৃথিবীর পুরো জ্ঞানভাণ্ডার কি আবার গোড়া থেকে আবিষ্কার করতে হবে? সেটি তো হতে পারে না। এ ধরনের। পরিবেশে সেই শিশুদের সাহায্য করার জন্যে আমাদের তৈরি করা হয়েছে।
হলোগ্রাফিক মানুষটি তার চারপাশে দেখিয়ে বলল, এখানে যে যন্ত্রটি আছে প্রাথমিকভাবে এটাকে বলা হত কম্পিউটার। বিংশ শতাব্দী থেকে এটা তৈরি শুরু হয়, প্রতি বছর এর ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যেতে রু করল। একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রথম মানুষের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরি করা হল। তারপর আরো এক শতাব্দী কেটে গেল, পৃথিবীর বুকে এমন কম্পিউটার তৈরি হল যা মানুষের পুরো সভ্যতাকে নিজের ভেতরে ধরে রাখতে পারে। নিউক্লিয়ার বোমা দিয়েও সেই কম্পিউটার ধ্বংস করা যাবে না, সাইক্লোন টাইফুন ভূমিকম্প তাকে ধ্বংস করতে পারবে না। সবচেয়ে বড় কথা তার জন্যে এমন ইন্টারফেস তৈরি করা হল যেটি যে কোনো মানুষের যে কোনো ধরনের বুদ্ধিমত্তায় কাজ করতে পারে। কেন জান?
