রিহান একটা বড় নিশ্বাস ফেলে তার কমিউনের দিকে হেঁটে যেতে থাকে।
কমিউনের কাছাকাছি পৌঁছেই রিহান বুঝতে পারল কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। তাকে প্রথমে দেখতে পেল ত্রান, কিন্তু তাকে দেখে ত্রানা অন্যবারের মতো তার কাছে ছুটে এল না, বরং দূরে সরে গেল। রিহান আরেকটু কাছে যেতেই লরি ট্রাক থেকে মানুষজন বের। হয়ে আসতে থাকে কিন্তু কেউ তার সাথে কোনো কথা বলে না, কেমন যেন আতঙ্ক ক্রোধ এবং ঘৃণার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। রিহান কেমন যেন ভয় পেয়ে যায়, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। ঠিক এরকম সময় সে গ্রুস্তানকে দেখতে পেল, একটা ট্রাকের পাটাতনে বিষণ্ণ মুখে বসে আছে। রিহাত দ্রুত পায়ে তার কাছে হেঁটে যায়, গ্রুস্তান তার দিকে তাকাল কিন্তু তার মুখে কোনো অভিব্যক্তির ছাপ পড়ল না।
রিহান ভয় পাওয়া গলায় ডাকল, গ্রুস্তান।
গ্ৰস্তান কোন কথা না বলে শীতল চোখে তার দিকে তাকাল। রিহান জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে গ্রুস্তান?
তুমি এখনো জান না?
না।
গ্রুস্তান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ঈশ্বরী প্রিমাকে ধরে নিয়ে গেছে।
রিহান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না, বিস্ফারিত চোখে গ্রুস্তানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েকবার চেষ্টা করে বলে, ঈশ্বরী প্রিমাকে? ধরে নিয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
রিহান মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেল, কমিউনের সবাই ধীরে ধীরে তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, সবার দৃষ্টি শীতল। সবার মুখে এক ধরনের ঘৃণা। রিহান শুষ্ক গলায় জিজ্ঞেস করল, কেন তারা ঈশ্বরী প্রিমাকে ধরে নিয়ে গেছে?
তোমাকে না পেয়ে।
আমাকে না পেয়ে?
হ্যাঁ। তোমাকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটি তোমাকে পেতে হবে তাই। তোমাকে না পেলে ঈশ্বরী প্রিমাকে।
রিহান কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, এখন কী হবে?
আমাদের সবাইকে ভাগাভাগি করে অন্য সব কমিউনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
কেন?
আমাদের কোনো ঈশ্বর নেই। কোনো ঈশ্বরী নেই। আমরা কেমন করে থাকব?
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন তীব্র গলায় চিৎকার করে উঠল, সব তোমার জন্যে রিহান। তুমি এসে আমাদের কমিউনে সব নষ্ট করে দিয়েছ। সব ধ্বংস করে দিয়েছ।
রিহান চমকে উঠে তাকাল, অন্য সবাই মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ তোমার জন্যে। তোমার জন্যে নির্বোধ কোথাকার!
রিহান এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে তাকায়, সবাই কেমন যেন ক্ষিপ্ত পশুর মতো মারমুখী হয়ে উঠেছে, মনে হচ্ছে তাকে ধরে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। ঠিক তখন কোথা থেকে জানি নীলন এসে হাজির হল, ভিড় ঠেলে ভিতরে এসে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, শান্ত হও। সবাই শান্ত হাও। ঈশ্বরী প্রিমা তার শেষ কথায় তোমাদের বলে গেছেন তোমরা যেন রিহানকে ভুল না বোঝ। ঈশ্বরী বলেছেন তাকে ক্ষমা করে দিতে
না, আমরা ক্ষমা করব না। কিছুতেই ক্ষমা করব না। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা রাগে উন্মত্ত মানুষেরা চিৎকার করে বলল, আমরা খুন করে ফেলব। টুটি ছিঁড়ে ফেলব।
নীলন রিহানকে আড়াল করে রেখে বলল, তোমরা শান্ত হও। শান্ত হও–কোনো পাগলামো করো না। আমরা সভ্য মানুষ, সভ্য মানুষের মতো ব্যবহার করতে হবে।
মধ্যবয়সী একজন মানুষ চিৎকার করে বলল, আমি তখনই বলেছিলাম এই মানুষটাকে এখানে ঢুকতে দিও না
একজন মহিলা বলল, যখন আমাদের ঈশ্বরী প্রিমাকে ধরে নিয়ে শেষ করে দেবে তখন রিহান এখানে বেঁচে থাকবে, ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়াবে সেটি কেমন করে হয়?
বেশ কয়েকজন চিৎকার করে বলল, খুন করে ফেলো। খুন করে ফেলল এই হতভাগাকে
রিহান হতচকিত হয়ে এই ক্রুদ্ধ মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ক্রোধ অর্থহীন নয়, সত্যি সত্যিই তার জন্যে আজ ঈশ্বরী প্রিমাকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু শুধু কি তার জন্যে? রিহান বুকের ভিতরে এক ধরনের গভীর হতাশা অনুভব করে। গভীর দুঃখে তার বুক ভেঙে যেতে চায়। সে নীলনকে পাশ কাটিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল, সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা আমাকে একটু কথা বলার সুযোগ দাও।
কে জানি চিৎকার করে বলল, না। দেব না। খুন করে ফেলব তোমাকে।
রিহান বলল, তোমরা যদি আমাকে খুন করতে চাও আমি সেটার জন্যেও প্রস্তুত। কিন্তু আগে আমাকে দুটি কথা বলতে দাও।
কী কথা?
তোমরা সবাই বলছ পুরো ব্যাপারটার জন্যে দায়ী আমি। সত্যি কথা বলতে কী আমি এমন কিছু ব্যাপার জানি যেটা অন্য কেউ জানে না! জানলে পুরো ব্যাপারটা তোমরা। অন্যভাবে দেখতে। কিন্তু আমি সেখানে যাচ্ছি না। আমি সমস্ত দোষ স্বীকার করে নিচ্ছি। আমি আমার কাজকর্ম দিয়ে যেসব দুঃখকষ্ট তৈরি করেছি তার জন্যে ক্ষমা চাইছি। তোমরা যদি আমাকে অনুমতি দাও তা হলে আমি এই মুহূর্তে প্রভু ক্লডের কাছে ধরা দেব। তার দেওয়া মৃত্যুদণ্ড মেনে নিয়ে ঈশ্বরী প্রিমাকে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্যে অনুরোধ করব।
রিহানকে ঘিরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা কেউ কোনো কথা বলল না। রিহান নীলনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, আমাকে একটা মোটরবাইক দেবে? সাথে কিছু গ্যাসোলিন।
গ্রুস্তান বলল, সেটি সমস্যা নয়।
তা হলে সমস্যা কী?
তুমি কোথায় গিয়ে ধরা দেবে? এই বিশাল এলাকা তুমি চেন, কোন কমিউনটি কোথায় তুমি জান?
রিহান মাথা নেড়ে বলল, না। জানি না।
তা হলে?
নীলন বলল, আমার কাছে একটি ম্যাপ আছে।
