.
রাত্রিবেলা রিহানের চোখে ঘুম আসছিল না। ঈশ্বরী প্রিমাকে আজ সে যেভাবে দেখে এসেছে সেটি কিছুতেই ভুলতে পারছে না। কিশোরী মেয়েটি যখন আকুল হয়ে কাঁদছিল গভীর একটি দুঃখে তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। এখনো তার বুকের ভিতরে সেই কষ্টটি রয়ে গেছে, কিছুতেই সেটা দূর করতে পারছে না।
রিহান বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে একসময় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে গেল।
কে যেন ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে–রিহান চোখ খুলে তাকাল। গ্রুস্তান উদ্বিগ্ন মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রিহান হঠাৎ ধড়মড় করে জেগে উঠল, কী হয়েছে গ্রুস্তান?
ঘুম থেকে ওঠ তাড়াতাড়ি।
কেন?
ঈশ্বরী প্রিমা জরুরি খবর পাঠিয়েছেন।
রিহান চমকে উঠে বলল, কী জরুরি খবর পাঠিয়েছেন?
এই মুহূর্তে তোমাকে যেন সরিয়ে নেওয়া হয়।
আমাকে? রিহান অবাক হয়ে বলল, কেন?
জানি না। কিন্তু ঈশ্বরী প্রিমার আদেশ এটা।
কেন এরকম আদেশ দিয়েছেন?
গ্রুস্তান গম্ভীর মুখে বলল, নিশ্চয়ই তাঁর কাছে কোনো জরুরি খবর আছে।
কীসের জরুরি খবর?
বাইরে এসে দেখ।
রিহান বাইরে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেল। চারদিকে বিন্দু বিন্দু আলো কাঁপছে, তার সাথে চাপা গুঞ্জন। তাদের কমিউনের দিকে শত শত মোটরবাইক ছুটে আসছে। বিন্দু বিন্দু আলোগুলো মোটরবাইকের হেডলাইটের আলো, গুঞ্জনটি বহুদূর থেকে ভেসে আসা শক্তিশালী ইঞ্জিনের গুঞ্জন। রিহান কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করে, কী হচ্ছে এখানে?
আমাদের আক্রমণ করতে আসছে।
কারা?
সবাই।
রিহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, সবাই?
হ্যাঁ সবাই। এই এলাকায় যতো কমিউন আছে তাদের সবাই।
সে কী? কেন?
জানি না। কিন্তু আমার ধারণা তোমার জন্যে।
আমার জন্যে?
গ্রুস্তান গম্ভীর হয়ে বলল, একজন ঈশ্বর তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল–তুমি সেই মৃত্যুদণ্ড থেকে পালিয়ে এসেছ। তোমাকে সেই মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে। যদি না পাও তা হলে সেই ঈশ্বর অর্থহীন হয়ে যায়। অসত্য হয়ে যায়। সেটি কেউ মেনে নিতে পারছে না।
রিহান কাঁপা গলায় বলল, মেনে নিতে পারছে না?
ঈশ্বরী প্রিমা ছাড়া। ঈশ্বরী প্রিমা তোমাকে বাঁচাতে চান। তাই তোমাকে সরে যেতে বলছেন।
রিহান হঠাৎ কঠিন মুখে বলল, আমি সরে যাব না।
তুমি কী করবে?
আমি এখানে থাকব।
কেন?
ওদের সাথে যুদ্ধ করব।
গ্রুস্তান কাঠ কাঠ স্বরে হেসে উঠে বলল, তুমি এই কয়েক হাজার মানুষের সাথে যুদ্ধ করবে?
তা হলে আমরা কী করব?
সেটা ঈশ্বরী প্রিমাকে সিদ্ধান্ত নিতে দাও।
ঈশ্বরী প্রিমা কী সিদ্ধান্ত নেবেন?
গ্রুস্তান কঠিন মুখে বলল, দেখ রিহান, ঈশ্বর এবং ঈশ্বরীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমি এর আগেও অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছ–এবারে সেটি না হয় নাই করলে।
রিহান গ্রুস্তানের মুখের দিকে তাকাল, হঠাৎ করে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে সে কেমন যেন অসহায় অনুভব করে। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, গ্রুস্তান। এরা সবাই যদি আমাকে ধরার জন্যে আসে তা হলে পালিয়ে না গিয়ে আমার এখানে থাকা উচিত। আমাকে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে তারা চলে যাবে। এখানে আর কারো কোনো ক্ষতি করবে না।
গ্রুস্তান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমারও তাই ধারণা।
কাজেই আমি পালিয়ে যেতে চাই না। আমি এখানে থাকতে চাই।
কিন্তু ঈশ্বরী প্রিমা চান তুমি চলে যাও। কাজেই তোমাকে চলে যেতে হবে।
আমি যাব না।
ঈশ্বরীর নির্দেশ তুমি অমান্য করতে পারবে না। তুমি যেতে না চাইলে তোমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাবার নির্দেশ আছে।
জোর করে?
হ্যাঁ। গ্রুস্তান বলল, তোমার ঠিক কোথায় আঘাত করলে তুমি দীর্ঘ সময়ের জন্যে অজ্ঞান হয়ে যাবে, ঈশ্বরী প্রিমা সেটাও বলে দিয়েছেন।
রিহান কিছু একটা বলতে চাইছিল কিন্তু তার আগেই কিছু একটা তীব্র শক্তিতে তার ঘাড়ে আঘাত করে। কিছু বোঝার আগেই হঠাৎ করে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে।
.
রিহান যখন চোখ খুলে তাকাল তখন অন্ধকার কেটে পূর্ব আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। উঠে বসতে গিয়ে হঠাৎ সে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে। দুই হাতে খানিকক্ষণ তার মাথা ধরে রেখে সে সাবধানে উঠে বসে, ভোরের শীতল বাতাসে সারা শরীর হঠাৎ একটু কেঁপে উঠল। সে কোথায় আছে কেমন আছে মনে করার চেষ্টা করল, এবং হঠাৎ করে তার পুরো ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। শত শত মোটরবাইক হিংস্র পশুর মতো তাদের কমিউনের দিকে ছুটে আসছিল এবং তার মাঝে তাকে অচেতন করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাকে কোথায় সরিয়ে নিয়েছে?
রিহান উঠে বসে চারদিকে তাকায়, পাহাড়ি একটা এলাকা–আগে কখনো এখানে এসেছে বলে মনে পড়ে না। রিহান সাবধানে উঠে দাঁড়ায়, বড় বড় কিছু পাথরের আড়ালে তাকে রেখে গেছে। পাথরগুলো ধরে সে বের হয়ে আসে, সামনে একটা বড় উপত্যকা তার অন্যপাশে বহুদূরে আবছাভাবে তাদের কমিউনটি দেখা যাচ্ছে। রিহান ভোরের আবছা আলোতে কমিউনটি ভালো করে দেখার চেষ্টা করল, তার আশঙ্কা হচ্ছিল হয়তো দেখবে পুরো কমিউনটি জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দিয়েছে, মৃত মানুষের দেহ আর কালো ধোঁয়ায় সেটি বীভৎস হয়ে আছে। কিন্তু সেরকম কিছু দেখল না। মনে হল কমিউনটির কোনো ক্ষতি হয় নি–ঠিক সেভাবেই আছে। রিহান একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, তার জন্যে পুরো কমিউনটি ধ্বংস করে দেওয়া হলে সে কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারত না।
