রিহান কোনো কথা না বলে বিস্ফারিত চোখে ঈশ্বরী প্রিমার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঈশ্বরী প্রিমা ভাঙা গলায় বললেন, আমি তো ঈশ্বরী হতে চাই নি। আমি তো সাধারণ মানুষ হয়ে বড় হতে চেয়েছিলাম। আমি ছোট একটা সংসার চেয়েছিলাম, ভালোমানুষ একজন স্বামী চেয়েছিলাম। ছোট একটি সন্তান চেয়েছিলাম। তাকে গভীর ভালবাসায় বুকে চেপে ধরতে চেয়েছিলাম। তা হলে কেন আমাকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে তোমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে?
রিহান কোনো কথা না বলে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ঈশ্বরী প্রিমার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশ্বরী প্রিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমি আমার নিজের জীবনকে গ্রহণ করে ফেলেছিলাম। পুরো জীবন ঈশ্বরী হয়ে থেকে তোমাদের সুখ শান্তি আর নিরাপত্তার জন্যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলাম। নিজের ভিতরে মানুষের সব অনুভূতি মুছে সেখানে ঈশ্বরের কাঠিন্য নিয়ে এসেছিলাম। তখন, ঠিক তখন–
তখন কী ঈশ্বরী প্রিমা?
তখন তুমি এসে বললে তুমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর না! ঈশ্বর তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে নি। ঈশ্বরের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই–শুধু তাই না, তুমি বললে তুমি জান যে ঈশ্বরী আসলে নিঃসঙ্গ।
রিহান কোনো কথা না বলে ঈশ্বরী প্রিমার কারুকার্যখচিত মুখোশটির দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশ্বরী প্রিমা একটি নিশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি না জেনে আমার জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছ। আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছি। আমাদের কমিউনে তুমি যেটা করতে চেয়েছ আমি তোমাকে সেটা করতে দিয়েছি।
আমি সেজন্যে আপনার কাছে কৃতজ্ঞ ঈশ্বরী প্রিমা।
আমার ধারণা, সেটি আমাদের কমিউনের জন্যে খুব চমৎকার একটি ব্যাপার হয়েছে। ঈশ্বরীর সাহায্য না নিয়ে তোমরা বড় বড় সমস্যার সমাধান করেছ!
রিহান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। করেছি।
একজন ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরীর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে কমিউনের সব মানুষকে সর ব্যাপারে তার ওপর নির্ভরশীল রাখা, নিশ্চিত করা মানুষ যেন কখনোই নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে। কিন্তু আমি তাদেরকে পায়ে দাঁড়াতে দিয়েছি, আমি সবাইকে একজন ঈশ্বর ছাড়া, বেঁচে থাকা শেখাতে চাই।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কিন্তু রিহান আজকে আমি তোমাকে ডেকেছি একটি সত্য কথা বলার জন্য।
রিহানের বুক কেঁপে উঠল, জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
আমি এই কমিউনের মানুষকে কেন নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে দিয়েছি তুমি জান? কেন ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়া তাদের বেঁচে থাকতে শিখাচ্ছি?
তাদের ভালোর জন্যে, তাদের ভবিষ্যতের জন্যে
না–না–না। ঈশ্বরী প্রিমা তীব্র কণ্ঠে কথা বলতে বলতে মাথা নাড়লেন, আমি এটা করেছি আমার নিজের জন্যে।
নিজের জন্যে?
স্যা। আমার নিজের জন্যে! আমি আর ঈশ্বরী প্রিমা থাকতে চাই না। আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। তুচ্ছ একজন মানুষ, অকিঞ্চিতকর একজন মানুষ! আমার ছোট একটা ঘরে ছোট একটা শিশু থাকবে, সাদাসিধে একজন স্বামী থাকবে, আমরা সারা দিন খেটেখুটে একমুঠো খাবার খাব–মাথার উপর একটা আচ্ছাদন থাকবে
ঈশ্বরী প্রিমা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মুখ তুলে রিহানের দিকে তাকালেন, বললেন, রিহান, তুমি একজন ঈশ্বরীকে মানুষ হবার স্বপ্ন দেখিয়েছ! দোহাই তোমার, তোমাকে এই স্বপ্ন পূরণ করে দিতে হবে।
রিহান হতচকিত হয়ে বলল, আমাকে?
হ্যাঁ। তুমি বলেছ একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরীর কাছে কিছু তথ্য থাকে যেটা অন্য কারো কাছে থাকে না।
আমি সেটা অনুমান করেছিলাম।
তোমার অনুমান সত্যি। আমি তোমার মতো একজন সাধারণ মানুষ–শুধু একটা পার্থক্য আমার কাছে এমন তথ্য আছে যেটা কোনো মানুষের কাছে নেই!
রিহান অবাক হয়ে বলল, কোথায় আছে সেই তথ্য? কেমন করে আছে?
আমি সব তোমাকে বলব। কিন্তু তুমি আমাকে কথা দাও আমাকে আবার মানুষের মতো বাচতে দেবে।
ঈশ্বরী প্রিমা, আপনি যেটা বলছেন সেটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব। আমি কি সেটা পারব?
আমি একা যদি এতদিন সেটা পেরে থাকি তুমি সবাইকে নিয়ে সেটা পারবে না?
আমি এখনো সেটা জানি না ঈশ্বরী প্রিমা। কিন্তু আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি আমি চেষ্টা করব। আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করব।
ঈশ্বরী প্রিমা কাঁপা হাতে তার কারুকার্যময় মুখোশটি খুলে নিলেন, রিহান বিষয়ে হতবাক হয়ে গেল, মুখোশের আড়ালে একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোরী মেয়ের মুখ। বড় বড় নিষ্পাপ চোখ, সেই চোখে ব্যাকুল একটা দৃষ্টি, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, সেখানে বিষণ্ণতার একটা ছাপ। রিহান কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তু–তু–তুমি ঈশ্বরী প্রিমা?
ঈশ্বরী প্রিমা মাথা নাড়ল।
তুমি তো ছোট একটি মেয়ে!
হ্যাঁ। আমি ছোট একটি মেয়ে। আমি খুব ভীতু আর দুর্বল ছোট একটি মেয়ে। কিশোরী মেয়েটি কার গলায় বলল, বলল, তুমি আমাকে রক্ষা করবে। বলো–কথা দাও।
রিহান নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়াল, তারপর কিশোরী মেয়েটির কাছে গিয়ে তার হাত স্পর্শ করল, বলল, ঈশ্বরী প্রিমা
না। মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, ঈশ্বরী নয়, বলো প্রিমা। শুধু প্রিমা।
প্রিমা–আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি তোমাকে আমি রক্ষা করব।
কিশোরী মেয়েটি যে কিছুক্ষণ আগেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরী প্রিমা ছিল, রিহানের দুই হাত ধরে আকুল হয়ে কেঁদে উঠল। রিহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর খুব সাবধানে মেয়েটির মুখটাকে দুই হাতে ধরে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, তোমার কোনো ভয় নেই প্রিমা! কোনো ভয় নেই।
