আগুনের জ্বলন্ত শিখা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফাঁকা জায়গাটাতে দুর্বল হয়ে পড়ে সেখানে জ্বলার মতো কিছু নেই। কিছুক্ষণ ধিকিধিকি করে জ্বলে আগুনটা নিভে যায়। সবাই বিস্মিত হয়ে দেখে শস্যক্ষেত্রের এক অংশ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে আছে, অন্য পাশে সোনালি শস্যক্ষেত্র বাতাসে নড়ছে!
গ্রুস্তান রিহানকে জড়িয়ে ধরে বলল, রিহান তুমি আজ এখানে না থাকলে আমরা কিছুতেই শস্যক্ষেত্রটা বাঁচাতে পারতাম না। তোমার বুদ্ধিটা অসাধারণ।
রিহান মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, নিহানা যদি তার শস্য কাটার যন্ত্রটা আবিষ্কার না করত আমরা কিছুই করতে পারতাম না! যত বুদ্ধিই থাকুক কোনো কাজই হত না।
নিহানা হেসে বলল, আমার যন্ত্রটা শস্য গাছগুলো কেটেছে–কিন্তু সবাই যদি কাটা গাছগুলো সরিয়ে না নিত কোনো লাভই হত না। কাজেই কৃতজ্ঞতা জানাতে হলে সেটা জানানো উচিত তাদেরকে।
গ্ৰস্তান হেসে বলল, ঠিক আছে! বোঝা যাচ্ছে কারো একার বুদ্ধিতে এই অসাধ্য সাধন হয় নি! সবাই মিলে করা হয়েছে।
কালিঝুলি মাখা কমবয়সী একজন তরুণ বলল, ঈশ্বরী প্রিমার সাহায্য ছাড়াই আমরা কত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি দেখেছ?
সবাই মাথা নেড়ে কথাটা মেনে নিল, শুধু রিহান চমকে উঠে ভাবল, এই কথাটার কি অন্য কোনো অর্থ রয়েছে? যদি সবাই একসঙ্গে থাকে তা হলে কি ঈশ্বর ছাড়াও কমিউন বেঁচে থাকতে পারবে?
পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা ফসল কাটা, মাড়াই করা, বাক্স বোঝাই করে ট্রাকে তোলার অমানুষিক পরিশ্রমের মাঝে ঘুরেফিরে রিহানের শুধু এই কথাটা মনে হতে থাকল।
৬. কারুকার্যখচিত মুখোশ
ঈশ্বরী প্রিমা বললেন, রিহান, তুমি বস।
রিহান চমকে উঠে ঈশ্বরী প্রিমার দিকে তাকাল। একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী কখনোই সাধারণ একজন মানুষকে তার নাম দিয়ে সম্বোধন করেন না, কখনোই তাদেরকে তার সামনে বসতে অনুরোধ করবেন না। রিহান তার বিস্ময়টুকু গোপন করে ঈশ্বরী প্রিমার নির্দেশ মতো তার সামনের চেয়ারটিতে বসল। এখন তাদের দুজনের ভিতরে দূরত্ব একটি পাথরের টেবিল। ঈশ্বরী প্রিমা তার সেই কারুকার্যময় মুখোশটি দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন। হালকা নীল রঙের পোশাকটির ভেতরে কিশোরীর মতো হালকা ছিপছিপে দেহের অবয়বটি দেখা যাচ্ছে। ঈশ্বরী প্রিমার সামনে বসে রিহান এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করে, তিনি কেন তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন সে জানে না। নিশ্চয়ই সে বড় কোনো অপরাধ করে নি, তা হলে তাকে নাম ধরে ডাকতেন না, তাকে বসতে বলতেন না।
ঈশ্বরী প্রিমা দীর্ঘ সময় মুখোশের ভেতর দিয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী সম্পর্কে তুমি কতটুকু জান রিহান?
রিহান এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করে, নিচু গলায় বলে, আমি বেশি কিছু জানি না ঈশ্বরী প্রিমা।
তুমি কেন সাধারণ একজন মানুষ রিহান আর আমি কেন ঈশ্বরী প্রিয়া তুমি বলতে পারবে?
রিহান মাথা নাড়ল, বলল, পারব না ঈশ্বরী প্রিমা। শুনেছি অসংখ্য মানুষের মাঝে একজন দুইজন ঈশ্বরের ক্ষমতা নিয়ে জন্মান। তাদেরকে খুঁজে বের করে ঈশ্বরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তাদেরকে কেমন করে খুঁজে বের করা হয়?
আমি জানি না ঈশ্বরী প্রিমা। রিহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, যখন। আপনার চলে যাবার সময় হবে তখন আপনি নূতন একজন ঈশ্বরকে দায়িত্ব দেবেন। আপনি নিশ্চয়ই জানেন কে ঈশ্বর হয়ে জন্ম নিয়েছে।
ঈশ্বরী প্রিমা মুখোশের আড়ালে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠলেন, মুখোশটি হাসছে না, শুধু মানুষটি হাসছে বিষয়টি রিহানকে এক ধরনের বিভ্রান্তির মাঝে ফেলে দিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনি কেন হাসছেন ঈশ্বরী প্রিমা?
ঈশ্বরী প্রিমা হাসি থামিয়ে বললেন, কেন? শুধু তোমরা মানুষেরা হাসবে আনন্দ করবে আমরা ঈশ্বর এবং ঈশ্বরীরা চার দেয়ালের মাঝে কঠিন মুখ করে বসে থাকব সেটি কেমন নিয়ম?
আমি সেটা বলি নি ঈশ্বরী প্রিমা।
আমি জানি তুমি সেটা বলে নি।
আমি বলেছিলাম–।
তুমি বলেছিলে তুমি ঈশ্বরের কোনো অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস কর না।
রিহান মাথা নিচু করে বলল, আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন ঈশ্বরী প্রিমা।
তুমি বলেছিলে তুমি একজন ঈশ্বরীকে করুণা কর, তার জন্যে দুঃখ অনুভব কর
রিহান ব্যস্ত হয়ে বলল, আমি সেভাবে বলি নি
তুমি বলেছ একজন ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরী খুব নিঃসঙ্গ।
রিহান মাথা নিচু করে বলল, হ্যাঁ। আমি সেটা বলেছিলাম। আমার সব সময় মনে হয়েছে
ঈশ্বরী প্রিমা রিহানকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এটি কোন বিচার যে তুমি রিহান হয়ে জীবনকে উপভোগ করবে আর আমি ঈশ্বরী হয়ে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে থাকব?
রিহান কোনো কথা না বলে অবাক হয়ে ঈশ্বরী প্রিমার দিকে তাকাল। তার কারুকার্যময় মুখোশের আড়ালে এই মুহূর্তে কী অনুভূতি খেলা করছে সেটি দেখতে পাচ্ছে না। সেখানে কি ভয়ংকর ক্রোধ? তীব্র অভিমান? নাকি গভীর বিষাদ?
ঈশ্বরী অরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, তুমি জান ঈশ্বরী হবার জন্যে আমার কী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে?
না। জানি না।
আমার বাবা–মা ছিল। ছোট দুজন ভাই ছিল। সবাইকে ছেড়ে এখানে আসতে হয়েছে।
আমি দুঃখিত ঈশ্বরী প্রিমা।
দুঃখ বলতে কী বোঝায় সেটা তোমরা জান না রিহান। আমি ঈশ্বরী হয়ে এখানে আসার পর যে আমার বাবা–মা ছোট ছোট দুজন ভাই দুর্ঘটনায় মারা গেছে সেটি কি শুধু দুর্ঘটনা? নাকি হত্যাকাণ্ড?
