গ্রুস্তান আর সেন্ট্রি দুজন অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রিহান হিংস্র গলায় বলল, তোমরা বেঁচে থাকবে না মরে যাবে সেটা এখন নির্ভর করছে আমার ইচ্ছের ওপর। তোমার প্রভু ক্লড তোমার প্রাণ বাঁচাতে পারবে না–তোমার প্রাণ বাঁচাতে পারব আমি!
মানুষগুলো কোনো কথা না বলে হতচকিত হয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রিহান গ্রুস্তানের দিকে তাকিয়ে বলল, গ্রুস্তান, এদের কী করবে?
গ্রুস্তান হাত নেড়ে বলল, এরা হচ্ছে চতুর্থ শ্রেণীর ঘাতক। এদের বেঁচে থাকা মরে যাওয়ায় কিছু আসে যায় না। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এদেরকে মেরে ফেললে পৃথিবীর উপকার হয়। কিন্তু আমরা মানুষ মেরে অভ্যস্ত নই।
মানুষগুলো হঠাৎ হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বলল, আমরা ক্ষমা চাই–আমাদের হত্যা করবেন না। ঈশ্বরের দোহাই।
রিহান জিজ্ঞেস করল, কোন ঈশ্বর? তোমাদের না আমাদের?
মানুষগুলো একমুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে তারপর বলে, আপনাদের ঈশ্বর।
রিহান হঠাৎ শব্দ করে হেসে ফেলল। বলল, তোমাদের মেরে ফেললে পৃথিবীর উপকার হয়। কিন্তু তোমাদের আমরা মারব না তোমাদের ছেড়ে দেব। কেন ছেড়ে দেব জান?
মানুষগুলো মাথা নাড়ল, তারা জানে না।
তোমাদের ছেড়ে দেব যেন তোমরা তোমাদের প্রভু ক্লডের কাছে গিয়ে বলতে পার যে আপনি সত্যিকারের ঈশ্বর নন। আপনি মিথ্যা। আপনি যখন কোনো মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেন সেই মানুষের মৃত্যু হয় না। শুধু যে মৃত্যু হয় না তাই না, সেই মানুষ ফিরে এসে আমাদের প্রাণ ভিক্ষা দেয়।
মানুষগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রিহান বলল, কী বলেছি তোমাদের মনে থাকবে?
মানুষগুলো মাথা নেড়ে জানাল যে তাদের মনে থাকবে। রিহান বলল, বেশ, এবারে দেখা যাক তোমাদের সাথে কী আছে। তোমাদের যন্ত্রপাতি, বিস্ফোরকগুলো রেখে দিই যেন ফিরে যাবার সময় অন্য কোনো মানুষের কোনো ক্ষতি করতে না পার।
রিহান কাছে গিয়ে বলল, দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াও, দেখি তোমাদের শরীরে কী আছে।
.
মানুষগুলোর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, গুলির বেল্ট, বিস্ফোরক সরিয়ে রেখে তাদেরকে যখন যেতে দিল তখন পূর্বের আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। সূর্য ওঠার আগেই তারা বুঝতে পারল এই মানুষগুলোকে যেতে দিয়ে তারা বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। মানুষগুলো যাবার আগে শস্যক্ষেত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে। সেই আগুন ধীরে ধীরে শস্যক্ষেত্রকে গ্রাস করতে আসছে। প্রভু ক্লডের অনুসারীরা কোনো মানুষকে এই শস্যের অংশ দেবে না প্রয়োজনে নিজের সর্বনাশ করে হলেও।
সবাই এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে শস্যক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশাল এই শস্যক্ষেত্রটিতে প্রতি বছর শস্যের জন্ম হয়। তারা ভাসা ভাসা ভাবে জানে একসময় পৃথিবীতে অনেক মানুষ ছিল তখন নিশ্চয়ই এখানে তারা এগুলোকে শস্যভূমি তৈরি করেছিল। এখনো তার কিছু অবশেষ রয়ে গেছে মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই এই বিশাল প্রান্তরে প্রতি বছর শস্য বেড়ে ওঠে। পৃথিবীতে এখন নানা কমিউনে যে মানুষেরা বেঁচে আছে তাদের অনেকে এখান থেকে শস্য কেটে নিয়ে যায়–যে পরিমাণ শস্য জন্মায় পৃথিবীর এই অঞ্চলে বেঁচে থাকা মানুষের জন্যে সেগুলো যথেষ্ট। কিন্তু আজ সেই শস্যক্ষেত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, দেখতে দেখতে পুরো শস্যক্ষেত্র আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
রিহান কাঁপা গলায় বলল, গ্রুস্তান, এই আগুনটা আসতে কতক্ষণ লাগবে বলে মনে হয়?
বাতাস নেই তাই দুই–তিন ঘণ্টা লেগে যেতে পারে। বাতাস শুরু হলে দেখতে দেখতে চলে আসবে।
আমরা শুধু শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে আগুনটা না দেখে কিছু একটা কাজ করতে পারি না?
কী করতে চাও? এখানে তো ঈশ্বর প্রিমা নেই যে তাকে জিজ্ঞেস করব।
একজন বলল, ইশ! যদি কোনোভাবে ঈশ্বর প্রিমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম!
রিহান বলল, শুধু শুধু দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা কি শস্য কাটা শুরু করতে পারি না?
গ্রুস্তান মাথা নেড়ে বলল, দুই–তিন ঘণ্টায় তুমি কতটুকু শস্য কাটবে?
রিহান খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, আগুনটা জ্বলছে শস্য গাছে। আমরা আগুনের পথে শস্যগুলো কেটে রাখতে পারি না যেন আগুন জ্বলার জন্যে কিছু না থাকে?
গ্রুস্তান বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকাল। রিহান বলল, নিহানার শস্য কাটার যন্ত্রটা শস্য গাছকে চমৎকারভাবে কাটতে পারে–আমরা সেটা ব্যবহার করে লম্বালম্বিভাবে শস্যক্ষেত্রে খানিকটা জায়গায় গাছগুলো একেবারে গোড়া পর্যন্ত কেটে সরিয়ে নেব। আগুনটা তখন এই পর্যন্ত এসে থেমে যাবে–আর এগুতে পারবে না কারণ আগুন জ্বলার জন্যে কিছু থাকবে না!
গ্রুস্তান খানিকক্ষণ অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, আমার কী মনে হয় জান?
কী?
আমরা যদি ঈশ্বরী প্রিমাকে এখন জিজ্ঞেস করতাম, তা হলে তিনিও এটাই বলতেন!
তা হলে দেরি করে লাভ কী? চল কাজ শুরু করে দিই।
চল।
নিহানার তৈরি শস্য কাটার যন্ত্রটা শস্যক্ষেত্রে নামিয়ে আনা হল। সেটা শস্য কেটে যেতে থাকল এবং দলের বিশজনের সবাই কাটা শস্যের গাছগুলো সরিয়ে নিতে লাগল। ঘণ্টাখানেকের মাঝেই প্রায় দুই মিটার চওড়া আগুনের জন্যে একটা বাধা তৈরি করা হল। ততক্ষণে আগুনটা আরো এগিয়ে এসেছে, বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ, মাঝে মাঝে আগুনের ফুলকি ছুটে আসছে। সবাইকে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল আগুনের ফুলকি থেকে যেন নূতন কোনো আগুন শুরু হয়ে না যায় তার দিকে লক্ষ রাখতে।
