রিহান বলল, ঠিক আছে।
মোটরবাইকগুলো কাছে এসে হঠাৎ করে হেডলাইট নিভিয়ে ফেলে, ইঞ্জিনগুলো চাপা গর্জন করে আরো কাছাকাছি এসে থেমে যায়। গ্রুস্তান নিচু গলায় বলল, আমাদের দেখেছে।
কিন্তু হেডলাইট নিভিয়েছে কেন?
বুঝতে পারছি না।
গ্রুস্তান চাপা গলায় সেন্ট্রি দুজনকে বলল, তোমরা দুই পাশে চলে যাও। সন্দেহজনক কিছু দেখলে গুলি করতে হতে পারে।
সেন্ট্রি দুজন মাথা নেড়ে দুই পাশে সরে গেল। গ্রুস্তান আর রিহান অন্ধকারে কন্টেইনারের পিছনে লুকিয়ে থাকে। তারা কিছুক্ষণের মাঝেই কয়েকটা ছায়ামূর্তি দেখতে পেল–ছায়ামূর্তিগুলো পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে। ট্রাকের সামনে এসে সেটা পরীক্ষা করল, খুব চাপা গলায় ফিসফিস করে কথা বলল। চারদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রাখা মোটরবাইকগুলো দেখল, নিজেরা নিজেরা কিছু একটা কথা বলল, তারপর তারা ফিরে যেতে শুরু করল।
গ্রুস্তান ফিসফিস করে বলল, লোকগুলো ফিরে যাচ্ছে।
হ্যাঁ।
কোনো কমিউনের স্কাউট দল মনে হচ্ছে। চিন্তার কিছু নেই।
রিহান মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে গিয়ে থেমে গেল, লোকগুলো আবার ফিরে আসছে। তাদের হাতে বড় একটা পাত্র। রিহান ফিসফিস করে বলল, কিন্তু লোকগুলো ফিরে আসছে। কেন?
পরের দৃশ্য দেখে রিহান আর গ্রুস্তান আঁতকে উঠল, সর্বনাশ! কী একটা জানি ছিটাচ্ছে! আগুন ধরিয়ে দেবে।
কী ধরনের মানুষ অপরিচিত মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করতে পারে? কিন্তু সেই কারণ খুঁজে বের করার অনেক সময় পাওয়া যাবে, এই মুহূর্তে তাদের থামাতে হবে।
রিহান হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র উঁচু করে চিৎকার করে বলল, হাত তুলে দাঁড়াও–না হলে গুলি করব!
মানুষগুলো থমকে দাঁড়াল, মনে হল ছুটে পালানোর চেষ্টা করবে কিন্তু তার আগেই সেন্ট্রি দুজনের ক্রিপটন ফ্লাশ লাইটের তীব্র আলো তাদের ওপর এসে পড়ল। তিনজন মানুষ, মধ্যবয়স্ক পুরুষ, শরীরে কালো বায়ু নিরোধক পোশাক, মাথায় হেলমেট এবং চোখে নাইট গগলস।
গ্রুস্তান অস্ত্র উদ্যত করে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, তোমরা এক পা নড়লে গুলি করে শেষ করে দেব। আমরা চারজন মানুষ তোমাদের টার্গেট করেছি। খবরদার ভুলেও হাতে অস্ত্র নেবার চেষ্টা করবে না।
মানুষগুলো চেষ্টা করল না। ক্রিপটন ল্যাম্পের তীব্র আলোতে হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গ্রুস্তান এবং রিহান আরো একটু এগিয়ে যায়। সেন্ট্রি দুজনও কাছাকাছি এগিয়ে আসে।
গ্রুস্তান জিজ্ঞেস করল, তোমাদের হাতে ওটা কী?
মানুষগুলো কোনো কথা বলল না।
গ্রুস্তান ধমক দিয়ে বলল, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমাদের হাতে কী?
বিস্ফোরক। প্লাস্টিক বিস্ফোরক।
তোমরা কেন ওটা এখানে ছড়াচ্ছ?
মানুষগুলো প্রশ্নের উত্তর দিল না।
গ্রুস্তান আবার ধমক দিল, কেন?
আমরা তোমাদের কন্টেইনারটা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
রিহান হঠাৎ করে চমকে উঠল, সে আগে এই কণ্ঠস্বরটি কোথাও শুনেছে। দুই পা এগিয়ে সে তীক্ষ্ণ চোখে মানুষগুলোর দিকে তাকাল। তাদের কণ্ঠস্বর পরিচিত কিন্তু চেহারা পরিচিত নয়।
গ্রুস্তান আবার জিজ্ঞেস করল, কেন তোমরা আমাদের কন্টেইনারটি উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে? তোমরা জান এই কন্টেইনারের ভেতর আমাদের মানুষেরা ঘুমাচ্ছে?
জানি।
তা হলে?
পৃথিবীতে শস্যের অভাব। আমরা আমাদের কমিউনের জন্যে শস্য নিতে চাই।
রিহান এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করে, সে নিশ্চিত এই কণ্ঠস্বরটি আগে শুনেছে। মানুষগুলো অপরিচিত কিন্তু কণ্ঠস্বর পরিচিত সেটি কেমন করে হতে পারে? হঠাৎ রিহান বিদ্যৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল, হ্যাঁ, তার মনে পড়েছে। এই মানুষ তিনজন প্রভু ক্লডের আদেশে তাকে হত্যা করার জন্যে নিয়েছিল। অন্ধকারে তাদের চেহারা দেখতে পায় নি শুধু গলার স্বর শুনেছে। রিহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কী আশ্চর্য কিছুদিন আগে যারা তাকে হত্যা করার জন্যে নিয়ে গিয়েছিল এখন তারাই তার উদ্যত অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে?
রিহান এক পা এগিয়ে এসে বলল, তোমরা তোমাদের কমিউনের জন্যে শস্য নিতে চাও?
হ্যাঁ।
প্রয়োজন হলে অন্যদের ধ্বংস করে?
একজন মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ প্রয়োজন হলে অন্যদের ধ্বংস করে। পৃথিবীতে যারা যোগ্য তারা বেঁচে থাকবে।
তোমাদের সেটা কে শিখিয়েছে? তোমাদের ঈশ্বর? তোমাদের প্রভু?
হ্যাঁ। আমাদের প্রভু।
রিহান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, তোমাদের প্রভু ভুল জিনিস শিখিয়েছে।
মোটা গলার একজন মানুষ বলল, আমাদের প্রভু কখনো ভুল জিনিস শেখান না। আমাদের প্রভূ কখনো ভুল করেন না।
করেন, তোমার প্রভু হচ্ছে প্রভু ক্লড। এবং প্রভু ক্লড অনেক বড় ভুল করেছেন! আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তা হলে আমার দিকে তাকাও
মানুষগুলো অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকাল। ক্রিপটন ল্যাম্পের তীব্র আলোর কারণে প্রথমে তারা তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। রিহান সেন্ট্রির দিকে ইঙ্গিত করতেই সে আলোটা খানিকটা তার দিকে ঘুরিয়ে আনে। মানুষগুলো রিহানকে দেখে হতবাক হয়ে যায়, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না।
রিহান উদ্যত অস্ত্র হাতে মানুষগুলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, তোমার প্রভু আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল! সে যদি সত্যিকারের ঈশ্বর হত তার মৃত্যুদণ্ড থেকে আমি বেঁচে আসতে পারতাম না। তোমরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, হত্যা করতে পার নি। আমি বেঁচে এসেছি। শুধু যে বেঁচে এসেছি তা নয়–এখন আমি তোমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছি। ট্রিগারে একটু টান দিলেই তোমাদের রক্তাক্ত শরীর এখানে পড়ে থাকবে।
