একজন চিৎকার করে বলল, জয় হোক ঈশ্বরী প্রিমার।
সবাই সমস্বরে বলল, জয় হোক।
নীলন আগের কথার সূত্র ধরে বলল, আমাদের নিহানা শস্য কাটার একটা যন্ত্র তৈরি করেছে সেজন্যে তাকে সবার পক্ষ থেকে অভিনন্দন। তবে সবাইকে একটা জিনিস লক্ষ রাখতে হবে–বছরের একটা সময় আমাদের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই শস্যক্ষেত্রগুলোতে প্রতি বছর নিজে শস্য জন্মায় এবং আমরা শস্য কেটে আনি। আমাদের শরীর ঠিক রাখার জন্যে কী কী খেতে হবে ঈশ্বরী প্রিমা সেটি ঠিক করে দেন–তার কাছ থেকে আমরা জেনেছি এই শস্য মজুত করে রাখতে হয়। কাজেই নিহানার যন্ত্রটি আমরা ব্যবহার করব কি না সেটি খুব ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে। যদি কোনো কারণে যন্ত্রটি ঠিকভাবে কাজ না করে এবং আমরা ঠিক সময়ে শস্য কেটে আনতে না পারি আমাদের পুরো কমিউনের ওপর ভয়ংকর দুর্যোগ নেমে আসবে।
নিহানা বলল, তুমি ঠিকই বলেছ নীলন। সেজন্যে আমি আগে আমার যন্ত্রটা পরীক্ষা করে দেখতে চাই।
কমবয়সী একজন দাঁড়িয়ে বলল, পাহাড়ের নিচে ঘাসের বন আছে। আমরা সেই ঘাসের বনে শস্য কাটার যন্ত্রটা পরীক্ষা করে দেখতে পারি।
নীলন বলল, আমি যন্ত্রটা ব্যবহার করার পক্ষে কিন্তু যদি যন্ত্রটা কোনো কারণে কাজ করে তার জন্যেও প্রস্তুতি রাখতে চাই। তা ছাড়া নীলন একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, এই এলাকার মানুষের যেসব কমিউন আছে তারা অনেকেই এখানে শস্য কাটতে আসে। কিছু কিছু কমিউন অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির। তাদের সাথে যুদ্ধ হতে পারে সেজন্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে।
কমিউনের বয়স্ক সদস্যরা তখন ঘুঁটিনাটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেয়। অনেক আলোচনা করে মোটামুটি একটা পরিকল্পনা করে সেদিনকার সতা শেষ করা হল।
নিহানার যন্ত্রটা যেরকম কাজ করবে ভাবা হয়েছিল, দেখা গেল সেটি তার থেকে অনেক ভালো কাজ করছে। পাহাড়ের নিচে কাশবনের জঙ্গলটি সেটি কয়েক মিনিটে কেটে শেষ করে ফেলল, সেটি দেখে সবাই এত উৎসাহ পেল যে তখন তখনই তারা শস্য মাড়াই করার একটা যন্ত্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করা শুরু করল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে আগে যে কাজ করতে তাদের পুরো এক সপ্তাহ লেগে যাবার কথা ছিল সেটি চব্বিশ ঘণ্টার মাঝে শেষ হয়ে যাবে বলে সবাই আশা করতে থাকে।
নির্দিষ্ট দিনে বড় কন্টেইনারসহ একটা ট্রাক এবং দশটা মোটরবাইকে করে বিশজন মানুষ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে শস্য কাটতে রওনা হৃল। কন্টেইনারের ভিতরে নিহানার শস্য কাটার এবাং শস্য মাড়াই করার যন্ত্র। শস্যক্ষেত্রটি অনেক দূর, ভোরবেলা রওনা দিয়ে পাথুরে রাস্তায় সারা দিন চালিয়ে ওরা গভীর রাতে সেখানে পৌঁছাল। সবাই ক্লান্ত, তার পরেও তারা শস্য কাটার যন্ত্রটি মোটরবাইকের সাথে লাগানোর কাজটুকু সেরে রাখল যেন খুব ভোর বেলাতেই কাজ শুরু করে দিতে পারে।
রাতের খাবার খেয়ে সবাই শুতে গিয়েছে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলে ভোরবেলা কাজ করা সহজ হবে। নিহানার যন্ত্রটা ঠিকভাবে কাজ করলে তাদের খুব বেশি পরিশ্রম হবার কথা নয়। জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা, কন্টেইনারের ভেতর স্লিপিং ব্যাগে অন্য সবার সাথে গুটিসুটি মেরে রিহান শুয়ে পড়ল। যন্ত্রপাতি ঠিক করার জন্যে কাছাকাছি কেউ নেই বলে তাকে আনা হয়েছে, যদি কোনো সমস্যা হয় তাকে ঠিক করে দিতে হবে।
রাত্রে হঠাৎ রিহানের ঘুম ভেঙে গেল। কেন ঘুম ভেঙেছে রিহান বুঝতে পারল না, খানিকক্ষণ ঘাপটি মেরে শুয়ে থেকে তার মনে হতে থাকে কিছু একটা অস্বাভাবিক জিনিস ঘটেছে কিন্তু সেটা কী সে বুঝতে পারছে না। রিহান মাথা উঁচু করে বোঝার চেষ্টা করে। তখন সে বহু দূরে কয়েকটা মোটরবাইকের শব্দ শুনতে পেল। এই শস্যক্ষেত্রের আশপাশে কোনো কমিউন নেই, বহু দূর থেকে মানুষেরা শস্য কাটার জন্যে এখানে আসে। তাদের মতো আরো কোনো দল হয়তো শস্য কাটতে আসছে।
রিহান উঠে বসল, যারা আসছে তারা কী ধরনের মানুষ কে জানে। এসে একটা গোলাগুলি শুরু করে দিলে কী হবে? সবাইকে ডেকে তুলবে কি না রিহান বুঝতে পারল না। সবাই ক্লান্ত হয়ে এমন গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে যে রিহানের তাদের ডেকে তুলতে মায়া হল। মোটরবাইকগুলো এখনো অনেক দূরে, আরো একটু কাছে এলে ডেকে তোলা। যাবে। রিহান কন্টেইনারের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে মোটরবাইকের শব্দগুলো শুনতে থাকে। যদি কমিউনের লোকেরা শস্য কাটতে আসে তা হলে মোটরবাইকের সাথে বড় বড় ট্রাক এবং লরির শক্তিশালী ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যাবে কিন্তু সেরকম কিছু নেই। দুই থেকে তিনটি মোটরবাইকের শব্দ শোনা যাচ্ছে–কখনো আস্তে, কখনো জোরে, কখনো সেটা পাহাড়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
রিহান চুপচাপ বসে থাকে, ধীরে ধীরে মোটরবাইকের শব্দ বাড়ছে, যারা আসছে তারা কাছাকাছি এসে পৌঁছে গেছে। সম্ভবত অন্য কোনো কমিউনের স্কাউট দল, শস্যক্ষেত্রটি দেখতে এসেছে, ভোরের আলোতে দেখে আবার ফিরে চলে যাবে।
রিহান তবু ঝুঁকি নিল না, কন্টেইনারে ঘুমিয়ে থাকা গ্রুস্তানকে ডেকে তুলে সাবধানে বের হয়ে আসে। বাইরে আরো দুজন সেন্ট্রি পাহারা দিচ্ছিল, মোটরবাইকের শব্দ তারাও শুনেছে, হাতে অস্ত্র নিয়ে তারাও অপেক্ষা করছে।
গ্রুস্তান বলল, ভয়ের কিছু নেই। মনে হয় স্কাউট দল। আমরা একটু সতর্ক থাকি।
