কমিউনে শুধু যে যন্ত্রপাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হয়েছে তা নয়–হঠাৎ করে নূতন যন্ত্রপাতি তৈরি হতে শুরু করেছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় যন্ত্রগুলো অবশ্যই খেলনা–ঘোট ঘোট বাচ্চাদের খেলার জন্যে স্টিয়ারিং হইল লাগানো গাড়ি! সেই গাড়ি থেকে উল্টে পড়ে দুই চারজন বাচ্চার যে হাত পায়ের ছাল–চামড়া ওঠে নি তা নয়, কিন্তু তার পরেও বাচ্চাগুলোর মাঝে এগুলো অসম্ভব জনপ্রিয়। গান শোনার জন্যে যে ক্রিস্টাল ডিস্ক রিডার ছিল সেগুলো ব্যবহার করার সৌর ব্যাটারির খুব অভাব ছিল। বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র থেকে নূতন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পর এখন প্রতি লরিতেই গান শোনার ব্যবস্থা হয়েছে। সন্ধেবেলাতেই যেভাবে গান বাজতে থাকে যে নীলনকে নূতন করে আদেশ দিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাঝে আনতে হয়েছে!
রাত্রিবেলা ঠাণ্ডার কষ্ট থেকে বাচার জন্য আগুন জ্বালানোর একটা ব্যবস্থা করা হত– আজকাল আর সেটা করা হয় না। নিউক্লিয়ার রি–একটরের পাশে একটা গরম পানির ধারা থাকে, সেটাকে টিউব দিয়ে পুরো কমিউনে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত্রিবেলা সব ট্রাক লরি এবং কন্টেইনারগুলোর ভেতরে একটা আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক আবিষ্কারটি হয়েছে অন্য জায়গায়। সেটি শুরু হয়েছে এভাবে : ঈশ্বরী প্রিমার কাছ থেকে বিশেষ নির্দেশ এসেছে বলে নীলন একদিন কমিউনের সবাইকে নিয়ে একটা সভা ডেকেছে। বেশি ছোট বাচ্চাগুলোকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মায়েরা বসেছে, একটু বড় বাচ্চাগুলো হুটোপুটি করে খেলছে এবং যারা মোটামুটিভাবে বুঝতে শিখেছে তারা গম্ভীর হয়ে বাবা–মায়ের কাছে বসে আছে–কখন এই সভা শেষ হবে সেজন্যে অপেক্ষা করছে। অন্যেরা ট্রাকের চাকায় বা যন্ত্রপাতিতে হেলান দিয়ে বসে নীলনের ঘোষণার জন্যে অপেক্ষা করছে। শুধু যাদের সেন্ট্রি ডিউটি দেওয়া হয়েছে তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে বাইরে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নীলন সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে সভার কাজ শুরু করল, বলল, তোমরা সবাই জান আর কিছুদিনের ভেতরেই ঠাণ্ডা পড়ে যাবে এবং তার আগেই আমরা দক্ষিণে যাত্রা শুরু করব। এবং তোমরা এটাও জান যে যাত্রা শুরু করার আগে আমাদের শীতকালের শস্যভাণ্ডার পুরো করতে হবে।
এরকম সময়ে কমবয়সী তরুণ–তরুণীরা যন্ত্রণার একটি শব্দ করল! নীলন সেটা না শোনার ভান করে বলল, আমরা আমাদের স্কাউট বাহিনীকে আশপাশে এবং শস্যভূমিতে পাঠিয়েছি, তারা তাদের রিপোর্ট দিয়েছে। ঈশ্বরী প্রিয়া আমাদের শস্যক্ষেত্রে যাবার দিন ঠিক করে দিয়েছেন।
ঈশ্বরী প্রিমা নামটির জন্যে তরুণ–তরুণীরা এবারে যন্ত্রণার শব্দ করার সাহস পেল না। তবে শস্য কাটতে যাওয়ার এই দিনটি নিয়ে কারো মনে আনন্দের কোনো স্মৃতি নেই।
ঈশ্বরী প্রিমা বলেছেন এবার শস্যক্ষেত্রে শস্য একটু আগেই প্রস্তুত হয়েছে এবং আমাদের আগেই যেতে হবে। এলাকার অন্যান্য কমিউনের সদস্যরাও সেখানে শস্য সংগ্রহ করতে যাবে কাজেই আমাদের শস্য কাটতে হবে দ্রুত, সেজন্যে এবারে আরো অনেককে শস্য কাটতে যেতে হবে। সবাইকে সেজন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।
যন্ত্রণার মতো শব্দ করা হলে ঈশ্বরী প্রিমার প্রতি অসম্মান করা হয় বলে কমবয়সী তরুণ–তরুণীরা বেশ কষ্ট করে চুপ করে রইল। তখন পিছনে বসে থাকা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মী বাহিনীর একটি মেয়ে, নিহানা, দাঁড়িয়ে বলল, মহামান্য নীলন, আমি কি একটা প্রস্তাব করতে পারি?
কী প্রস্তাব?
শস্য কাটার জন্যে আমরা যে চাকু ব্যবহার করি সেটি খুব ভালো কাজ করে। আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয় এবং প্রত্যেকবারই আমাদের ছোটখাটো দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু আমার মনে হয় মেয়েটি কথা বন্ধ করে একটু সময়ের জন্যে অপেক্ষা করে।
কী মনে হয়?
আমার মনে হয় আমরা শস্য কাটার জন্যে একটা যন্ত্র তৈরি করতে পারি যেটা দিয়ে অনেক তাড়াতাড়ি শস্য কাটতে পারব।
যারা উপস্থিত ছিল তাদের মাঝে অনেকেই অবিশ্বাসের শব্দ করল। একজন বলল, অসম্ভব। এরকম যন্ত্র তৈরি করা যদি সম্ভব হত ঈশ্বরী প্রিমা আমাদের জন্যে সেটি খুঁজে বের করতেন।
মেয়েটি বলল, এটি অসম্ভব নয়। সত্যি কথা বলতে কী আমি যন্ত্রটা তৈরি করেছি, তবে এখনো পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পাই নি।
এবারে সবাই বিস্ময়ের একটা শব্দ করল। মেয়েটা লাজুক মুখে বলল, একটা মোটরবাইকের পিছনে এটা লাগাতে হবে। মোটরবাইকটা যখন সামনে যাবে তখন আমার যন্ত্রটা ঘুরে ঘুরে শস্য কাটতে থাকবে।।
রিহান উঠে দাঁড়িয়ে আনন্দের একটা ধ্বনি বের করে বলল, অভিনন্দন! তোমাকে একশ অভিনন্দন! এক হাজার অভিনন্দন!
অন্য অনেকে এবার হাত তালি দিতে থাকে। কাউকেই আর ভোঁতা চাকু দিয়ে শস্য কাটতে হবে না–একটা যন্ত্র সবার শস্য কেটে দেবে, দৃশ্যটি চিন্তা করেই সবাই খুশি হয়ে যায়। নীলন হাত তুলে সবার আনন্দোচ্ছাসকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আমি নিজেই খুব অবাক হয়ে দেখছি কিছুদিন আগেও যে ব্যাপারটি আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না এখন কত সহজে আমরা সেটি করতে পারি। ঈশ্বরী প্রিমার প্রতি আমাদের শত সহস্র কৃতজ্ঞতা যে তিনি আমাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে এই পরীক্ষা–নিরীক্ষা এবং গবেষণা করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
