বাচ্চারা দুভাগে ভাগ হয়ে গেল, এক ভাগ মাথা নেড়ে বলল স্টার্ট নেবে। অন্যভাগ বলল। নেবে না। রিহান চোখ মটকে স্টার্টারে ঝাঁকুনি দিতেই বিশাল কাজুরা মোটরবাইকটি গর্জন। করে স্টার্ট নিয়ে নিল। এবং দুএক সেকেন্ড পরে বন্ধ হয়ে গেল না। ত্রানা এবং অন্য সব বাচ্চা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে এবং সেই আনন্দ ধ্বনির মাঝে রিহান মোটরবাইকটির উপর চেপে বসে। রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের ফাঁকা জায়গাতে ধূলি উড়িয়ে সে মোটরবাইকটি ঘুরিয়ে আনল তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে মোটরবাইকটি দাঁড়া করিয়ে বলল, এই মোটরবাইকটি ঠিক করার জন্য এখন আর ঈশ্বরী প্রিমাকে বিরক্ত করতে হবে না।
নিহানা ইতস্তত করে বলল, কিন্তু—
কিন্তু কী?
কে কোন কাজ করবে সেটি তো নিয়ম করা আছে।
রিহান হেসে বলল, আমার জন্যে কোনো নিয়ম নেই।
কিন্তু এই বাচ্চারা? তাদের জন্যে
এরা যদি আমার সাথে থাকে তাহলে তাদের জন্যেও কোনো নিয়ম নেই।
নিহানা নামের মেয়ে কর্মীটি এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
.
রাতে রিহান তার নিজের লরিতে শোয়ার আয়োজন করছিল, তখন হঠাৎ করে দরজায় শব্দ হল। রিহান দরজা খুলে দেখে সেখানে নীলন এবং গ্রুস্তান দাঁড়িয়ে আছে। রিহান সপ্রশ্ন। দৃষ্টিতে তাকাতেই নীলন বলল, আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি রিহান?
অবশ্যই। ভেতরে এস।
নীলন এবং গ্রুস্তান ভেতরে এসে হাত দুটো ঘষে গরম করতে করতে বলল, রিহান তুমি আজকে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে একটি খুব অস্বাভাবিক কাজ করেছ।
রিহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি জানি।
এই কমিউনের সব বাচ্চা এখন বলছে যন্ত্রপাতিকে সম্মান করতে হয় না। প্রার্থনা শেখার কোনো প্রয়োজন নেই। সব নিয়মকানুন ভুল
সব নিয়মকানুন ভুল নয়। কিছু কিছু ভুল–
কিন্তু একটা কমিউনে যদি নিয়মকানুন খুব কঠোরভাবে মানা না হয় তার শৃঙ্খলা থাকে না। শৃখলা না থাকলে কমিউন টিকে থাকতে পারে না।
রিহান বলল, নীলন, আমার বয়স তোমার থেকে অনেক কম কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা তোমার থেকে অনেক বেশি! আমি কিছু জিনিস জানি যেটা অন্য মানুষ জানে না।
নীলন একটু অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকাল। রিহান বলল, আমি সেটা তোমাদের বলতে চাই না, কিন্তু একদিন বলতে হবে। একদিন সবাইকে জানতে হবে। তার জন্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্যে নিয়মকানুনগুলো নূতন করে লিখতে হবে।
গ্রুস্তান নিশ্বাস ফেলে বলল, তুমি আজকে যেটা করেছ সেটা ঈশ্বরী প্রিমাকে জানানো হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম তিনি অনুমোদন করবেন না কিন্তু ঈশ্বরী প্রিমা সেটা অনুমোদন করেছেন।
রিহান উজ্জ্বল মুখে বলল, আমি জানতাম তিনি করবেন।
নীলন নিশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু আমাদের ভয় করে। নিয়ম ভাঙতে আমাদের খুব ভয় করে।
রিহান নীলনের হাত স্পর্শ করে বলল, ভয়ের কিছু নেই নীলন। আমরা নিয়ম ভাঙছি, আমরা নূতন নিয়ম তৈরি করছি!
৫. শস্যক্ষেত্র
রিহানের ধারণা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি সে এখন কাটাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে একটু নাস্তা করেই সে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে চলে আসে। স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা অকেজো যন্ত্রপাতি নিয়ে পুরো দিন কাটিয়ে দেয়। অচল মোটরবাইকের বেশিরভাগ সে সারিয়ে ফেলেছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলোও সে খুলে আবার জুড়ে দিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ট্রাক এবং লরির। ইঞ্জিনগুলো নিয়ে একটা সমস্যা হলেও সে মোটামুটি ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছে। কয়েকটা এক ধরনের অচল যন্ত্রপাতি দিয়ে সেএকটা যন্ত্রকে দাঁড়া করিয়ে ফেলতে পারে। শুধু যে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে অচল এবং অকেজো যন্ত্রপাতি সারিয়ে তুলেছে তা নয়– কমিউনের ট্রাক, লরি আর কন্টেইনার ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষজনের দৈনন্দিন সংসার নিয়েও সে কাজ করতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ প্রবাহকে ঠিক রাখার জন্যে সে তারগুলো ঠিক করে টানিয়ে দিয়েছে, কীভাবে কোনটা ব্যবহার করতে হবে তার নিয়ম তৈরি করে দিয়েছে। আজকাল দুর্ঘটনা হচ্ছে অনেক কম।
শুধু যে সে একা কাজ শুরু করেছে তা নয়–তার সাথে বাচ্চাকাচ্চারাও এই ব্যাপারটিতে উৎসাহ পেতে শুরু করেছে। তাদের অনেকেই ছোটখাটো কাজ করতে শিখে গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি উপকার হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মী মেয়েগুলোর। আগে অকেজো যন্ত্র সারানোর জন্যে ঈশ্বরী প্রিমাকে একটা দীর্ঘ রিপোর্ট পাঠাতে হত। ডায়াগনষ্টিক মেশিনের সেই রিপোর্টটি ঠিক করে তৈরি করা খুব কঠিন। সেই রিপোর্ট দেখে ঈশ্বরী প্রিমা সেটা সারানোর জন্যে যন্ত্রপাতির ইউনিট নম্বর লিখে দিতেন। তাদের সরবরাহ কেন্দ্রে সেই ইউনিট নম্বরের যন্ত্রপাতি থাকলে সেটি ঠিক জায়গায় লাগিয়ে সেটি ঠিক করতে হত। সঠিক ইউনিট নম্বরের যন্ত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন, যখনই রসদ সগ্রহের জন্যে তাদের বিশেষ বাহিনী বের হত। তাদেরকে প্রয়োজনীয় ইউনিট নম্বরসহ একটা তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হত। সেই তালিকার যন্ত্রপাতি কখনোই পুরোপুরি পাওয়া যেত না। তাই কখনোই যন্ত্রপাতি পুরোপুরি ঠিক হত না।
এই কমিউনে রিহান প্রথম যখন যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করল তখন কমিউনের সবাই যে সেটাকে সহজভাবে নিয়েছিল তা নয়। অনেকেই তীব্র প্রতিবাদ করেছিল–যন্ত্রকে আর সম্মান প্রদর্শন করতে হবে না, এই ব্যাপারটিতে তাদের আপত্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। বড়দের পাশ কাটিয়ে ব্যাপারটি একেবারে শিশুদের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল বলে কেউ কিছু করতে পারে নি। এখন মোটামুটিভাবে সবাই ব্যাপারটিকে মেনে নিয়েছে এবং তার চাইতে বড় কথা কমিউনের আরো নিয়মকানুন নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে।
