ত্রানা খুশিতে দাঁত বের করে হেসে বলল, আমি এখনই তোমাকে বলে দিতে পারি। ত্রানা এদিক–সেদিক তাকিয়ে ষড়যন্ত্রীদের মতো গলা নামিয়ে বলল, লুকদের যে মেয়েটি আছে খবরদার তাকে বিয়ে করো না। সে দেখতে সবচেয়ে সুন্দরী কিন্তু সে সবচেয়ে বেশি হিংসুটে। গত ভোজের সময় কী করেছে জান?
কী করেছে?
জানা গলা নামিয়ে লুকদের পরিবারের সুন্দর মেয়েটি কী হিংসুটেপনা করেছে তার বর্ণনা শুরু করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই আশপাশের ট্রাক, লরি, কন্টেইনার থেকে ছোট ছোট বাচ্চারা এসে রিহানের আশপাশে ভিড় জমালো–কাজেই ত্রানাকে আপাতত তার গল্পটিকে স্থগিত করতে হল।
ছোট ছোট বাচ্চাদের বহরটি রিহানকে কমিউনের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতে থাকে। তাদের রান্নাঘর, পয়ঃশোধনাগার, পানি সরবরাহ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, নিউক্লিয়ার রি–এক্টর, সৌরচুল্লি, অস্ত্রাগার শেষ করে তারা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে এসে হাজির হল। বড় একটা এলাকা জুড়ে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। ভাঙা এবং পুরোনো মোটরবাইক, ট্রাক এবং লরির ইঞ্জিন, নানা ধরনের অকেজো অস্ত্রপাতি ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রিহান তার স্বাভাবিক কৌতূহলে যন্ত্রপাতিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, ঘোট ছোট বাচ্চাগুলো খানিকটা দূরত্ব নিয়ে বেশ সম্ভ্রমের সাথে রিহান এবং যন্ত্রপাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
রিহানকে দেখে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মীরা এগিয়ে আসে–বেশিরভাগই অল্পবয়স্ক মেয়ে, ঈশ্বরী প্রিমার কাছ থেকে আসা তালিকা দেখে যন্ত্রপাতিগুলোর অকেজো অংশগুলোর সঠিক অংশগুলো পরিবর্তন করছে। রিহান একটা কাজুরা মোটরবাইক দেখে এগিয়ে গিয়ে বলল, বাহ! কী চমৎকার, এর ডুয়েল টার্বো ইঞ্জিন।
নিহানা নামে রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের একটি মেয়ে কর্মী মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, এর ডুয়েল টার্বো ইঞ্জিন।
এটি অকেজো হয়েছে কেমন করে?
ডায়াগনষ্টিক মেশিনে ফিট করে রিপোর্ট পাঠিয়েছি ঈশ্বরী প্রিমার কাছে। ঈশ্বরী প্রিমা এখনো বলেন নি, কী করতে হবে।
আমি একটু দেখি
নিহানা কিছু বলার আগেই রিহান বিশাল মোটরবাইকটা টেনে এনে তার স্টার্টারে ঝাঁকুনি দেয়। মোটরবাইকটা গর্জন করে স্টার্ট হয়ে প্রায় সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল। রিহান কান পেতে ইঞ্জিনের শব্দ শুনে আবার স্টার্টারে ঝাঁকুনি দিতেই আবার ইঞ্জিনটা ঘরঘর শব্দ করে স্টার্ট নেয়, কয়েক সেকেন্ড চালু থেকে আবার সেটা বন্ধ হয়ে গেল। রিহান ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ল তারপর নিচু হয়ে ইঞ্জিনটার উপর ঝুঁকে পড়ল। ঘোট ছোট বাচ্চারা এবারে কৌতূহলী হয়ে ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসে, তারা সবিস্ময়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে আছে। রিহান ফুয়েল পাইপটা খুঁজে বের করে সেটা ধরে মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মেয়ে কর্মীটিকে বলল, আমাকে সাইজ ফোর একটা প্লয়ার্স দেবে?
কিন্তু রিহান—
কী?
যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রটিতে সপ্তম মাত্রার নিয়মকানুন। সার্টিফাইড কর্মী ছাড়া অন্য কেউ এখানে কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারবে না।
রিহান হা–হা করে হেসে বলল, আমার জন্যে কোনো নিয়ম নেই। ঈশ্বরী প্রিমা আমাকে যা খুশি তাই করার অধিকার দিয়েছেন।
মেয়ে কর্মীর একজন আরেকজনের দিকে তাকাল এবং একজন মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। এটা সত্যি কথা। নীলনের অর্ডারের কপি আছে আমার কাছে।
রিহান বলল, দেখেছ? এবারে একটা প্লায়ার্স দাও।
একজন মেয়ে কর্মী ওয়ার্কশপের ভেতরে ঢুকে একটা সাইজ ফোর প্লয়ার্স নিয়ে এল। রিহান প্লয়ার্স দিয়ে ঘুরিয়ে টিউবের একটা ছোট অংশ খুলে ভেতরে উঁকি দিতেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল, বলল, যা ভেবেছিলাম তাই!
নিহানা নামের মেয়ে কর্মীটি বলল, কী হয়েছে?
টিউবটি বালু দিয়ে বন্ধ হয়ে আছে। কাজুরা মোটরবাইকের এটা হচ্ছে সমস্যা। ফিল্টারটা ভালো না, ফুয়েল পাইপ বন্ধ হয়ে যায়। এটা পরিষ্কার করলেই ঠিক হয়ে যাবে। একটা চিকন তার আছে?
নিহানা একটু বিভ্রান্ত হয়ে বলল, চিকন তার?
হ্যাঁ। আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখি টিউব পরিষ্কার করার মতো কিছু পাওয়া যায় নাকি। রিহান টিউবটা ত্রানার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ত্রানা এটা ধর আমি একটা তার নিয়ে আসি।
ত্রানা এবং তার সাথে সাথে অন্য সবগুলো বাচ্চা সভয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। ত্রানা মাথা নেড়ে বলল, না রিহান, আমাদের বাচ্চাদের যন্ত্রপাতি ধরার নিয়ম নেই। আমরা এখনো প্রার্থনা শিখি নি।
রিহান থতমত খেয়ে থেমে গেল, সে ভুলেই গিয়েছিল যে যন্ত্রপাতিকে এক ধরনের পবিত্র জিনিস বলে বিবেচনা করা হয়। কারা এটি স্পর্শ করবে, কারা এটি নিয়ন্ত্রণ করবে সেই বিষয় নিয়ে কঠোর নিয়মকানুন আছে। সে নিজে এই নিয়ম ভেঙে যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলাধুলা করেছে, পরীক্ষা করেছে কিন্তু এই ছোট বাচ্চারা তো সেটি জানে না। রিহান একমুহূর্ত চিন্তা করল, তারপর বলল, ত্রানা তুমি এটি ধর, কিছু হবে না। তুমি দেখবে প্রার্থনা না করলেও যন্ত্রপাতি কাজ করে।
মেয়ে কর্মীরা এবং সবগুলো বাচ্চা একসাথে বিস্ময় এবং আতঙ্কের একটা শব্দ করল। রিহান আবার বলল, নাও। ধর।
ত্রানা সাবধানে কাঁপা হাত দিয়ে ফুয়েল টিউবটা ধরল এবং অন্য সবগুলো বাচ্চা এক ধরনের আতংক নিয়ে ত্রানার দিকে তাকিয়ে রইল। রিহান ওয়ার্কশপে খুঁজে খুঁচিয়ে পরিষ্কার করা যায় এরকম একটা চিকন তার এনে ত্রানার হাত থেকে টিউবটা নিয়ে সেটা পরিষ্কার করতে শুরু করে। টিউবটা আবার মোটরবাইকে লাগিয়ে সে বাচ্চাদের দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কী মনে হয়? মোটরবাইকটা কি এখন স্টার্ট নেবে?
