ভোরবেলা খুট করে কন্টেইনারের দরজা খুলতেই রিহানের ঘুম ভেঙে গেল। সাধারণত বেশ বেলা হবার পর তার জন্যে ত্রানা একটা বাটিতে একটু খাবার নিয়ে আসে, এত সকালে কে এসেছে কে জানে। শিকল বাঁধা পাটা কাছে টেনে এনে শরীরে কম্বলটা জড়িয়ে রিহান বিছানায় উঠে বসল।
দরজা খুলে গ্রুস্তান এবং তার সাথে একজন মহিলা এসে ঢুকল। মহিলাটি মধ্যবয়স্কা, শক্ত সমর্থ চেহারা। রোদে পোড়া, নীল চোখ এবং কাঁচা-পাকা চুল। মহিলাটি কাছে এসে বলল, আমার নাম নীলন। আমি এই কমিউনের দায়িত্বে আছি। গ্রুস্তানের কাছে আমি তোমার কথা শুনেছি, কিন্তু তোমার সাথে আমার পরিচয় হয় নি।
রিহান বলল, তোমার সাথে পরিচিত হয়ে আমি খুশি হলাম নীলন।
নীলন তার পা থেকে বাধা দীর্ঘ শিকলটি দেখিয়ে বলল, তোমাকে দীর্ঘ সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ নিরাপত্তার কারণে আমরা কোনো ঝুঁকি নেই নি।
গলার স্বরে সূক্ষ্ম অপরাধবোধের ছোঁয়া আবিষ্কার করে রিহান একটু অবাক হয়ে নীলনের দিকে তাকাল। তবে কি এখন তার শেকল খুলে ফেলা হবে?
গ্রুস্তান বলল, তোমাকে আমরা যখন পেয়েছিলাম একবারও ভাবি নি তোমাকে বাঁচাতে পারব।
রিহান বলল, আমার জীবন বাঁচানোর জন্যে আমি সারা জীবন তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।
কিন্তু আমরা কেউ জানতাম না, তুমি কে, তুমি কোথা থেকে এসেছ কিংবা তোমাকে বিশ্বাস করা যায় কি না।
নীলন বলল, কিন্তু আমরা এখন জানি তোমাকে বিশ্বাস করা যায়।
রিহান অবাক হয়ে বলল, কেমন করে জান?
ঈশ্বরী প্রিমা আমাদের জানিয়েছেন। আমরা আজ তোমাকে মুক্ত করে দেব। এতদিন তোমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার জন্যে তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। আমরা তোমাকে
নীলন আরো কিছু বলতে চাইছিল, রিহান বাধা দিয়ে বলল, ঈশ্বরী প্রিমা কী জানিয়েছেন?
তিনি জানিয়েছেন আমরা যেন তোমাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে আমাদের কমিউনে গ্রহণ করি। তোমাকে যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিই।
স্বাধীনভাবে?
হ্যাঁ। এটি খুব বিস্ময়কর নির্দেশ। তুমি নিশ্চয়ই জান কমিউনে ঠিকভাবে কাজ করার জন্যে আমাদের সবাইকে খুব কঠিন নিয়ম মেনে চলতে হয়। ঈশ্বরী প্রিমা তোমাকে সেই নিয়ম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
গ্রুস্তান তার পকেট থেকে ছোট একটা চাবি বের করে রিহানের পা থেকে শিকল খুলতে খুলতে বলল, তোমাকে গত রাতে আমরা একজন অপরাধী হিসেবে বিচারের জন্যে ঈশ্বরী প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলাম।
নীলন হেসে বলল, ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার এখন খুব লজ্জা লাগছে।
গ্রুস্তান শিকলটা সরিয়ে বলল, আমার মেয়ে জানা অবিশ্যি তোমাকে খুব পছন্দ করে। এখন বোঝা যাচ্ছে ছোট শিশুরা মানুষকে ঠিকভাবে বুঝতে পারে।
রিহান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল, পায়ে শিকল নেই, অনেক দিন পর স্বাধীনভাবে দুই পা হেঁটে রিহান গ্রুস্তানের কাছে গিয়ে তার কাধ স্পর্শ করে বলল, ধন্যবাদ গ্রুস্তান।
নীলন বলল, তোমাকে আমাদের কমিউনিএকটা থাকার জায়গা করে দিতে হবে। ট্রিশির লরিটি তুমি ব্যবহার করতে পার। তোমার আর কী কী লাগবে তার একটা তালিকা করে দিও।
রিহান বলল, আমার এখন আর কিছু লাগবে না। আমার দায়িত্বটি বুঝিয়ে দিও, যেন তোমাদের বোঝা না হয়ে যাই।
নীলন একটু হেসে বলল, তোমার কোনো দায়িত্ব নেই। ঈশ্বরী প্রিমা স্পষ্ট করে বলেছেন তোমাকে যেন স্বাধীনভাবে থাকতে দিই।
কিন্তু কিছু না করে আমি কেমন করে থাকব?
সেটি তোমার ইচ্ছে। তুমি কী করতে চাও সেটি তুমি ঠিক করবে।
রিহান একটু অবাক হয়ে নীলনের দিকে তাকাল, কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে নীলন।
নীলন রিহানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, রিহান, আমি এই কমিউনের দলপতি হিসেবে তোমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কমিউনে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি।
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
এখন এস, আমাদের লরিতে, তুমি আমাদের সাথে সকালের নাস্তা খাবে।
.
নীলনের লরি থেকে নাস্তা করে বের হয়ে রিহান এই ছোট কমিউনটি ঘুরে দেখতে বের হল। সে এখানে অনেক দিন থেকে আছে কিন্তু কমিউনটি সে দেখে নি। মানুষজন ঘুম থেকে উঠে দিন শুরু করতে যাচ্ছে। রিহানকে হেঁটে বেড়াতে দেখে সবাই একটু অবাক হয়ে তার। দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণেই নিশ্চয়ই খবরটি ছড়িয়ে গেছে কারণ তাকে দেখে সবাই হাসিমুখে সম্ভাষণ করতে শুরু করল। তাকে এভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হল ত্রানা, সে ছুটে এসে তার হাত ধরে বলল, রিহান! তুমি নাকি আমাদের নতুন দলপতি!
রিহান চোখ কপালে তুলে বলল, সে কী! তুমি কোথা থেকে এই খবর পেয়েছ?
সবাই বলছে! ঈশ্বরী প্রিমা বলেছেন তুমি এখানে যা খুশি করতে পার।
সবাই আর কী কী বলেছে?
বলছে তুমি নাকি সাহসী আর বুদ্ধিমান। তেজস্বী আর সুদর্শন।
রিহান হা–হা করে হেসে বলল, বিয়ে করার জন্যে আমার একটি বউ খুঁজে পেতে তা হলে কোনো সমস্যা হবে না।
ত্রানা মাথা নেড়ে বলল, উঁহু। বরং তোমার উল্টো সমস্যা হবে। আমাদের কমিউনে যত মেয়ে আছে সবাই তোমাকে বিয়ে করতে চাইবে। কাকে ছেড়ে কাকে বেছে নেবে সেটা হবে তোমার সমস্যা।
এত বড় জটিল সমস্যা সমাধান করব কেমন করে? রিহান মাথা নেড়ে বলল, তখন তোমার কাছে পরামর্শের জন্যে আসতে হবে। কী বলো?
