সাথে সাথে রিহানের দু পাশের দুজন মানুষ মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। এখন এই ছোট ঘরটিতে রিহান এবং ঈশ্বরী প্রিমা ছাড়া আর কেউ নেই। রিহানের খুব ইচ্ছে। করছিল মাথা তুলে ঈশ্বরী প্রিমাকে দেখে, কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যদি কোনো মানুষ ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরীর সত্যিকার চেহারা দেখে তা হলে সে বেঁচে থাকতে পারে না। যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় শুধু তাদেরকেই ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরী তাদের নিজের চেহারা দেখতে দেন। রিহান এটি বিশ্বাস করে না, কিন্তু তবুও সে মাথা তুলে দেখার সাহস করল না।
রিহান হঠাৎ করে ঈশ্বরী প্রিমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, তুমি জান, তুমি খুব বড় অপরাধ করেছ?
রিহানের ঠিক কী হল কে জানে, সে মাথা নেড়ে বলল, না, আমার জানা নেই ঈশ্বরী প্রিমা।
ঈশ্বরী প্রিমা রিহানের কথায় খুব অবাক হলেন, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, পৃথিবীর সব কমিউনে ঈশ্বর এবং মানুষের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তুমি সেটি অস্বীকার করেছ?
রিহান কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। মাত্র কয়েকদিন আগে হুবহু একই রকম কথা বলে প্রভু ক্লড তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। এখানে সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করে কী হবে? একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে?
ঈশ্বরী প্রিমা বললেন, যে কাজটি আমার করার কথা, তুমি কেন সেই কাজটি করছ?
রিহান কিছু বলল না।
ঈশ্বরী প্রিমা কঠিন গলায় বললেন, আমার কথার উত্তর দাও।
রিহান হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল, সাথে সাথে ঈশ্বরী প্রিমা তার হাতে ধরে রাখা কারুকার্যখচিত একটি মুখোশে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন বলে রিহান ঈশ্বরী প্রিমার চেহারাটা দেখতে পেল না। ঈশ্বরী প্রিমার মাথায় কুচকুচে কালো চুল বেণি করে বেঁধে দু পাশ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। শরীরে ধবধবে সাদা একটি পাতলা পোশাক, যার ভেতর দিয়ে আবছাভাবে দেহের অবয়ব দেখা যায়। রিহান শান্ত গলায় বলল, ঈশ্বরী প্রিমা, কোন কাজটি ঈশ্বরের এবং কোন কাজটি মানুষের সেই পার্থক্যটি খুব অস্পষ্ট। আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্যে যে কাজটি করার কথা ছিল সেটিই করেছি। অন্যকে করতে বলেছি।
তুমি ঈশ্বর এবং ঈশ্বরীর ক্ষমতায় বিশ্বাস কর না? তুমি নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়েছ? সিদ্ধান্ত নিয়েছ?
রিহান কোনো কথা না বলে ঈশ্বরী প্রিমার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশ্বরী প্রিমা বললেন, আমার কথার উত্তর দাও।
রিহান নিচু গলায় বলল, অনুগ্রহ করে আমাকে এই প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করবেন না। মহামান্য প্রিমা।
কেন নয়?
কারণ–কারণ– রিহান বুঝতে পারল তার কিছুতেই এই কথাটি বলা ঠিক হবে না কিন্তু তার পরেও সে বলে ফেলল, আমি ঈশ্বর এবং ঈশ্বরীর কোনো অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করি না।
ঈশ্বরী প্রিমা চমকে উঠে কারুকার্যখচিত মুখোশের ভিতর দিয়ে রিহানের দিকে তাকালেন। অস্পষ্ট এবং শোনা যায় না এরকম গলায় বললেন, তুমি কেন এ কথা বলছ?
কারণ–কারণ– এই কথাটিও নিশ্চয়ই কিছুতেই বলা উচিত নয়, তার পরেও রিহান বলে ফেলল, আমাকে একজন ঈশ্বর মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল কিন্তু আমি মরি নি!
রিহান দেখল ঈশ্বরী প্রিমা থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মুখোশের আড়ালে তার মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছে না কিন্তু সেটি নিশ্চয়ই ভয়ংকর ক্রোধে কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করে রিহান ভয় পেয়ে গেল, সে মাঞ্জনিচু করে বলল, আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করুন ঈশ্বরী প্রিমা।
ঈশ্বরী প্রিমা কোনো কথা না বলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। রিহান আবার বলল, আমাকে আবার মৃত্যুদণ্ড দেবেন না ঈশ্বরী প্রিমা। আমি কারো কোনো ক্ষতি করতে চাই না–আমি শুধু বেঁচে থাকতে চাই। যেটুকু কৌতূহল নিয়ে মানুষের বেঁচে থাকা উচিত আমি শুধুমাত্র সেটুকু কৌতূহল নিয়ে–
ঈশ্বরী প্রিমা রিহানকে বাধা দিয়ে বললেন, তুমি একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী সম্পর্কে কতটুকু জান?
রিহান থতমত খেয়ে বলল, আমি বেশি জানি না।
একজন সাধারণ মানুষ কেমন করে একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী হয়?
রিহান কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
আমার কথার উত্তর দাও।
আমাকে ক্ষমা করুন মহামান্য ঈশ্বরী প্রিমা। আমি বলতে পারব না।
তোমার বলতে হবে, আমি জানতে চাই। বলো, সাধারণ মানুষ কেমন করে একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী হয়?
হয় না ঈশ্বরী প্রিমা। সাধারণ মানুষ কখনো ঈশ্বর বা ঈশ্বরী হয় না।
তা হলে? তা হলে তারা কেমন করে সবাইকে রক্ষা করে।
তাদের কাছে নিশ্চয়ই কিছু তথ্য আছে যেটা অন্যদের কাছে নেই। সেই তথ্যটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কাউকে কাউকে ঈশ্বর করা হয়। আমার মনে হয়–
কী মনে হয়?
আমার মনে হয় একজন ঈশ্বর বা ঈশ্বরী খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। খুব দুঃখী একজন মানুষ।
ঈশ্বরী প্রিমা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রিহানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। রিহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, আপনি কি আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন?
ঈশ্বরী প্রিমা ফিসফিস করে বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবার কথা। কিন্তু
কিন্তু কী?
আমি তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেব না। ঈশ্বরী প্রিমা একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি যাও, তুমি এখান থেকে যাও। চলে যাও।
রিহান উঠে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে তাকে অভিবাদন করে সে পিছিয়ে যেতে থাকে। দরজা ঠেলে ঘর থেকে বের হবার সময় আরো একবার মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল ঈশ্বরী প্রিমা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কারুকার্যখচিত মুখোশের আড়ালে ঈশ্বরী প্রিমার মুখমণ্ডলটি একবার দেখার জন্যে হঠাৎ করে রিহান এক ধরনের কৌতূহল অনুভব করে। অদম্য কৌতূহল। কিন্তু রিহান তার মুখমণ্ডল দেখতে পেল না।
