.
দুই শ মিটার দূরে খানিকটা উঁচু চালে রিহান এবং অন্য তিনজন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো তাক করে নিয়ে মোটরবাইকগুলোর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। মুখ খুললে পরে বিপদ হতে পারে নিশ্চিত জেনেও রিহান বলল, রেঞ্জের ভিতরে না আসা পর্যন্ত গুলি করবে না। লেজার লক গ্যারান্টি হবার পর ট্রিগারে হাত দেবে। তার আগে নয়।
এটি ঈশ্বরী প্রিমার নির্দেশ নয়, তারপরেও মধ্যবয়স্ক মানুষ এবং সাথের মেয়ে দুজন সেটি গোমড়া মুখে মেনে নিল। তারা বুঝে গিয়েছে রিহানের ভেতরে কিছু একটা আছে যেটা তাদের নেই। সেটা কী তারা ধরতে পারছে না সেজন্যে তারা খুব অস্বস্তিতে আছে। রিহানের কথামতো তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে এবং মোটরবাইকের বহরটি যখন খুব কাছাকাছি হাজির হয়েছে তখন টার্গেট লক ইন করে তারা ট্রিগার টেনে ধরল, সাথে সাথে পুরো পরিবেশটি ভয়ংকর হয়ে উঠল। চোখের পলকে তিনটি মোটরবাইক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেল। মানুষের চিৎকার, গোলাগুলি এবং বারুদের গন্ধে পরিবেশটি নারকীয় হয়ে ওঠে। আক্রমণকারী দলটি বেপরোয়া, দলের অর্ধেক যোদ্ধাই মহিলা, তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে বারবার তাদের ব্যুহ ভেদ করে চলে আসতে চেষ্টা করছিল। গ্রুস্তান আরো কিছু মানুষ নিয়ে তাদের সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে। আসে। ভয়ংকর গোলাগুলিতে পুরো এলাকাটা প্রকম্পিত হতে থাকে।
যুদ্ধটা যেরকম প্রায় হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল সেরকম হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। আক্রমণকারী দলটি হঠাৎ করে পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মোটরবাইকে তাদের আহত পুরুষ এবং মেয়েদের তুলে নিয়ে গুলি করতে করতে ধুলো উড়িয়ে তারা দিগন্তে অদৃশ্য হয়ে যায়। বড় ধরনের কোনো ক্ষতি ছাড়াই শত্রুকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সবার ভেতরে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। মোটামুটিভাবে পুরো এলাকাটা একটা উৎসবের মতো আনন্দে মেতে উঠল। সবাই কমিউনে ফিরে যাবার পর রিহান আবিষ্কার করল সে একা এখানে রয়ে গেছে। শেকল দিয়ে তাকে একটা ট্রাকের এক্সেলের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল, তাকে খুলে নিয়ে যাবার কথা কারো মনে নেই।
রিহান অবিশ্যি তাতে খুশিই হল। কন্টেইনারের ছোট ঘুপচি ঘরে সে দীর্ঘদিন থেকে আটকা পড়ে আছে। বাইরে খোলা প্রান্তরে বসে থাকতে তার খারাপ লাগছে না। রিহান একটা বড় পাথরে হেলান দিয়ে দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক জানা নেই কেন তার মনটা বিষণ্ণ হয়ে আসছে। কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল জানা নেই, হঠাৎ শুনল রিহান।
বাচ্চা মেয়ের গলার স্বর। রিহান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, ত্রানা ছোট একটা পানীয়ের বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিহান নরম গলায় বলল, কী খবর ত্রানা!
তুমি এখানে একা একা কেন বসে আছ?
আমাকে এখানে বেঁধে রেখেছে।
ও! ত্রানা কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে তার দিকে পানীয়ের বোতলটি এগিয়ে দেয়, এইটা তোমার জন্যে এনেছি।
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ত্রানা। রিহান পানীয়ের বোতলটা খুলে ঢকঢক করে গলায় খানিকটা উত্তেজক পানীয় ঢেলে বলল, আমার কথা সবাই ভুলে গেছে মনে হয়।
উঁহু। ত্রানা মাথা নাড়ল, ভোলে নি।
রিহান একটু অবাক হয়ে তাকাল, তুমি কেমন করে জান?
আমি বাবাকে অন্যদের সাথে কথা বলতে শুনেছি।
কী কথা বলছে?
ত্রানা মাথা নাড়ল, বলল, জানি না। তোমাকে মনে হয় ঈশ্বরী প্রিমার কাছে নিয়ে যাবে।
রিহান চমকে উঠে বলল, কী বললে?
ত্রানা ভুরু কুঁচকে রিহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি খুব ভয়ংকর, তাই না?
রিহান কোনো কথা বলল না, সে মোটেই ভয়ংকর নয়। সে অন্যরকম। অন্যরকম মানে ভয়ংকর নয়। কিন্তু এই কথাটি সে কেমন করে অন্যদের বোঝাবে?
৪. ঈশ্বরী প্রিমা
রিহান হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার হাত দুটি পেছনে বাঁধা, দুপাশে দুজন কঠিন চেহারার মানুষ। একজন তার কাঁধের কাছে পোশাকটা খামচে ধরে রেখেছে, সে ছুটে যেন না যায় সেজন্যে নয়–সম্ভবত তাকে বোঝানোর জন্যে সে এখানে ঈশ্বরী প্রিমার কাছে নেহায়েত নগণ্য এবং তুচ্ছ একজন মানুষ।
বিহানের ভেতরে কোনো বোধ নেই। এই মুহূর্তে তার নিজেকে পুরোপুরি অনুভূতিহীন একটি যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে। তার ভেতরে হতাশা এবং ক্ষোভ থাকার কথা, কিন্তু সেরকম কিছু নেই। তার ভেতরে বিস্ময় এবং আতঙ্কও থাকার কথা সেরকমও কিছু নেই। বরং সে। নিজের ভেতরে সূক্ষ্ম এক ধরনের কৌতূহল অনুভব করছে। ঈশ্বরী প্রিমা তাকে কী শাস্তি। দেবে সেটি নিয়ে কৌতূহল নয়, ঈশ্বরী প্রিমা দেখতে কেমন সেটি নিয়ে কৌতূহল। রিহান চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কখন আসবে ঈশ্বরী প্রিমা?
তাকে খামচে ধরে রাখা মানুষটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চাপা গলায় বলল, কোনো কথা নয়। চুপ, একেবারে চুপ।
রিহান চুপ করে গেল এবং প্রায় সাথে সাথেই সে ঘরের ভেতরে কাপড়ের খসখস একটা শব্দ শুনতে পায়। নিশ্চয়ই ঈশ্বরী প্রিমা এসেছেন, কারণ রিহানের দু পাশের দুজন মানুষ তখন তার মতোই মাথা নিচু করে উবু হয়ে বসে গেল। ঘরের ভেতরে কিছুক্ষণের জন্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। হঠাৎ ঈশ্বরী প্রিমার গলা শোনা গেল, এটিই তা হলে সেই মানুষ!
কেউ কোনো কথা বলল না, এটি ঠিক প্রশ্ন ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের স্বগতোক্তি। তা ছাড়া কখনোই ঈশ্বরী প্রিয়ার সাথে সরাসরি কথা বলার অনুমতি নেই। রিহান আবার কাপড়ের মৃদু খসখস শব্দ শুনতে পেল, সম্ভবত ঈশ্বরী প্রিমা তাকে ভালো করে দেখার জন্যে আরো একটু কাছে এসেছেন। রিহান একটা নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল, অনেকটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। তারপর ঈশ্বরী প্রিমা আবার বললেন, মানুষটা এখানে থাকুক। তোমরা দুজন যাও।
