রিহান অস্ত্রটা একনজর দেখল, আমাকে শিখাতে হবে না। আমি এটা চালাতে জানি।
মেয়েটা একটু অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকাল, রিহান বলল, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চল।
পাথুরে রাস্তা দিয়ে রিহান এবং অন্য তিনজন এগিয়ে যায়। প্রায় কয়েক শ মিটার দূরে বড় বড় কিছু পাথরের কাছে এসে সবাই দাঁড়াল। মধ্যবয়স্ক মানুষটি এদিক–সেদিক তাকিয়ে একটা পুড়ে যাওয়া লরির এক্সেলের সাথে রিহানের শেকলটা বেঁধে দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। রিহান বলল, আমাদের আরো সামনে যাওয়া দরকার।
মানুষটি অবাক হয়ে রিহানের দিকে তাকাল। তুরু কুঁচকে বলল, কী বললে?
বলেছি, আমাদের আরো সামনে যাওয়া দরকার।
কেন?
মোটরবাইকগুলোকে তা হলে আমরা সামনাসামনি পাব। একেবারে খোলা টার্গেট। এখানে থাকলে সেগুলো হঠাৎ করে চলে আসবে আমরা প্রস্তুত হবারও সময় পাব না।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি খানিকক্ষণ বিস্ফারিত চোখে রিহানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, আমাদের কী করতে হবে সেটা তোমার কাছ থেকে শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। সেজন্যে ঈশ্বরী প্রিমা আছেন।
রিহান অপমানটা গায়ে মাখল না, একটু পরেই এখানে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হবে, এখন মান–অপমান নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। রিহান তার বুকের ভেতর ভয় এবং অস্থিরতার এক ধরনের কাপন অনুভব করে। বহু দূরে ধুলো উড়িয়ে মোটরবাইকগুলো আসছে, মোটরবাইকের গুঞ্জন এবারে বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। রিহান কান পেতে কিছুক্ষণ শুনে একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, বেভাস্টিসি ৪৩!
মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, কী হয়েছে?
বেভাষ্টিসি ৪৩ মোটরবাইক। দুই হাজার সিসির ইঞ্জিন!
তুমি কেমন করে জান?
শব্দ শুনে বোঝা যায়। আমি চালিয়েছিলাম একবার, খুব শক্তিশালী মেশিন!
মধ্যবয়স্ক মানুষ এবং মেয়ে দুটি রিহানের উচ্ছাসে কোনো অংশ না নিয়ে দুই পাশে সরে যেতে থাকে। রিহান তবু দমে গেল না, বলল, বেভাস্টিসি ৪৩-এর খুব বড় গোলমাল আছে
মধ্যবয়স্ক মানুষটি ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, কোনো যন্ত্রপাতি নিয়ে তুমি কোনো অশোভন উক্তি করবে না। খবরদার।
রিহান থতমত খেয়ে বলল, আমি কোনো অশোভন উক্তি করছি না। যেটা সত্যি সেটা বলছি। গ্যাসোলিন ট্যাংকটা অরক্ষিত। হালকা এলুমিনিয়ামের মান্ড। বারো গ্রামের এক্সপ্রেসিভ বুলেট দিয়ে গুলি করলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি তার অন্য দুইজন সঙ্গীর দিকে তাকাল এবং সবাই মিলে রিহানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আশপাশে অস্ত্র বসানোর ভালো জায়গা খুঁজতে শুরু করে। বড় একটা। পাথরের উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি দাঁড় করিয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটি মাথা নিচু করে সেটার প্রতি সম্মান দেখাল, বিড়বিড় করে কিছু একটা উচ্চারণ করে অস্ত্রটির ব্যারেলে হাত দিয়ে স্পর্শ করে কপালে ছোঁয়াল।
ঠিক এরকম সময়ে গ্রুস্তানকে দৌড়ে আসতে দেখা যায়। পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সে কিছু একটা বলতে বলতে ছুটে আসছে। কাছাকাছি এসে গ্রুস্তান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ঈশ্বরী প্রিয়ার নির্দেশ এসে গেছে।
মধ্যবয়স্ক মানুষটা খুশি হয়ে গেল, জয় হোক ঈশ্বরী প্রিমার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে দুইজনের একজন বলল, কী বলেছেন ঈশ্বরী প্রিমা?
বলেছেন এগুলো বেভাষ্টিসি ৪৩ মোটরবাইক। এর গ্যাসোলিন ট্যাংক হালকা এলুমিনিয়ামের মোন্ড। বারো গ্রামের এক্সপ্রেসিভ বুলেট দিয়ে গুলি করতে বলেছেন।
মধ্যবয়স্ক মানুষ এবং তার সাথের মেয়ে দুজন কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তাদের মুখ দেখে মনে হল তারা গ্রুস্তানের কথা বুঝতে পারছে না। গ্রুস্তান একটু অবাক হয়ে বলল, কী হল তোমাদের?
না–না–কিছু না। বলে মধ্যবয়স্ক মানুষটি রিহানের দিকে তাকাল। হঠাৎ করে তার চোখে এক ধরনের ভীতি ফুটে উঠেছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না ঈশ্বরী প্রিমার কথাটুকু রিহান আগেই বলে দিয়েছে।
গ্রুস্তান অবিশ্যি সেটা বুঝতে পারল না, সে বলল, ঈশ্বরী বলেছেন তোমরা আরো সামনে যাও। তা হলে মোটরবাইকগুলোকে সামনাসামনি আক্রমণ করতে পারবে। একেবারে খোলা টার্গেট হিসেবে পেয়ে যাবে, যাও দেরি করো না।
গ্রুস্তান যেভাবে ছুটে এসেছিল ঠিক সেভাবে পাথরের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে কমিউনের দিকে ফিরে গেল। রিহান তার হাতের অস্ত্রটি হাত বদল করে বলল, এখন আমার কথা বিশ্বাস হল?
মধ্যবয়স্ক মানুষটি কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ রিহানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তুমি কেমন করে জেনেছ?
রিহান কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, সেটা নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। এখন তাড়াতাড়ি চল। দেরি হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
মানুষটি পোড়া লরির দিকে এগিয়ে গিয়ে শেকলের তালা খুলে আনে। সেটা শক্ত করে ধরে রেখে কঠোর দৃষ্টিতে রিহানের দিকে তাকিয়ে বলল, সামনে এগিয়ে যাও। একটু যদি বাড়াবাড়ি কর তা হলে আমি কিন্তু তোমাকে খুন করে ফেলব। ঈশ্বরী প্রিমার কসম।
শক্ত চেহারার মেয়েটি রিহানকে পিছনে ধাক্কা দিয়ে সামনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, যুদ্ধ শেষ হলে ঈশ্বরী প্রিমার কাছে তোমাকে রিপোর্ট করতে হবে।
অন্য মেয়েটি বলল, রিপোর্ট করতে হবে না। ঈশ্বরী প্রিমা নিজেই জেনে যাবেন।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, জয় হোক ঈশ্বরী প্রিমার।
অন্য দুজন যন্ত্রের মতো বলল, জয় হোক।
