রিহান হেসে বলল, আমি যদি আসলেই ভয়ংকর হতাম তা হলে কি তোমার বাবা তোমার মতো এরকম একটা ছোট মেয়েকে দিয়ে স্যুপ পাঠাত?
ত্রানা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে মাথা নেড়ে বলল, সেটা তুমি ঠিকই বলেছ।
আসলে আমাকে তো কেউ চেনে না তাই সবাই ভয় পায়। অচেনা মানুষকে সবাই ভয় পায়।
ত্রানা কিছুক্ষণ রিহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বাবা যখন তোমাকে এনেছিল আমরা সবাই ভেবেছিলাম তুমি মরে যাবে?
আমিও তাই ভেবেছিলাম।
তুমি কি তোমার কমিউন থেকে পালিয়ে এসেছ?
সেটা অনেক বড় গল্প।
ত্রানার চোখ চকচক করে ওঠে, তার খুব গল্প শোনার শখ। রিহানের আরেকটু কাছে এসে বলল, আমাকে গল্পটা বলবে?
রিহান ত্রানার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, নিশ্চয়ই বলব। কিন্তু তুমি কাউকে বলে দেবে না তো?
জানা দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, কাউকে বলব না। ঈশ্বরী প্রিমার কসম!
ঈশ্বরী প্রিমা! রিহানের বুকের ভেতর হঠাৎ ধক করে ওঠে, প্রভু ক্লডের হাত থেকে সে কোনোভাবে বেঁচে এসেছে, এখানে আছেন ঈশ্বরী প্রিমা। আবার কি নূতন করে কোনো বিপদে পড়বে? ঈশ্বরী প্রিমা যখন তার সম্পর্কে জানবে তখন কী হবে তার?
জানা একটু অধৈর্য গলায় বলল, কী হল? বলবে না?
হ্যাঁ বলব। আরো কয়দিন যাক তারপর বলব।
ত্রানার খানিকটা আশাভঙ্গ হল, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক তখন কন্টেইনারের দরজায় ছোট ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে ভিড় করে এসে ডাকাডাকি রু করে দেয়। তাদের খেলার সময় হয়েছে এবং ত্রানাকে ছাড়া খেলা কিছুতেই জমে ওঠে না!
ত্রানা চলে যাবার পর রিহান উঠে দাঁড়ায়, তাকে কয়েক মিটার লম্বা একটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, কন্টেইনারের ভেতরে সে একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারে, খোলা দরজার কাছাকাছি বসে বাইরে তাকাতে পারে কিন্তু এর কেশ কিছু করতে পারে না। রিহান কন্টেইনারের ভেতর পায়চারি করতে থাকে, ত্রানাকে বলেছে পায়ের মাঝে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকতে তার অভ্যাস হয়ে গেছে কিন্তু আসলে অভ্যাস হয় নি। একজন মানুষ সম্ভবত অন্য। অনেক কিছুতে অভ্যস্ত হতে পারে কিন্তু শেকল বাঁধা অবস্থায় বেঁচে থাকতে কখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না।
.
তালা খোলার শব্দে রিহান ঘুম থেকে জেগে ওঠে। গ্রুস্তান কন্টেইনারের তালা খুলে ভিতরে এসে ঢুকেছে। এখন খুব সকাল, ভালো করে দিনটি শুরু হয় নি। গ্রুস্তান রিহানের পায়ে বাধা শিকলটির অন্য মাথায় তালাটি খুলে বলল, চল।
রিহান আগেও লক্ষ করেছে গ্রুস্তান খুব কম কথার মানুষ। এর আগেও রিহান তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সুবিধে করতে পারে নি। তার প্রাণ রক্ষা করার জন্যে সে অনেকবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, গ্রুস্তানের কোনো ভাবান্তর হয় নি। শেকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখার ব্যাপারটি নিয়ে রিহান অনেকবার কৌতূহল কিংবা আপত্তি প্রকাশ করেছে গ্রুস্তান সেখানেও কখনো কোনো কথা বলে নি, তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে একজন মানুষকে পশুর মতো শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা সম্ভবত খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।
রিহান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কোথায়?
গ্রুস্তান উত্তর না দিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করে।
রিহান নিজের শেকলের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, আমাকে আগে খুলে দাও।
না।
কেন নয়?
আমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তোমাকে যুদ্ধ করতে হবে।
রিহান ভয়ংকরভাবে চমকে উঠল, মাথা ঘুরিয়ে গ্রুস্তানের দিকে ভালো করে তাকাল, চুপচাপ ঠাণ্ডা ধরনের মানুষটির চেহারার মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা। রিহান কান পেতে শুনতে পেল বাইরে মানুষজন ছোটাছুটি করছে, নীরব এক ধরনের ব্যস্ততা, কোনো একটা কমিউনে যখন বাইরের কোনো দল আক্রমণ করে তখন এরকম অস্থির একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রিহান জিজ্ঞেস করল, আমাকেও যুদ্ধ করতে হবে?
হ্যাঁ।
শেকল দিয়ে বেঁধে রাখলে কেমন করে যুদ্ধ করব?
তুমি যেহেতু পালাতে পারবে না তাই জানপ্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করবে। তা ছাড়া—
তা ছাড়া কী?
তোমাকে আমরা চিনি না। তোমার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না, এমনও হতে পারে যারা আসছে তারা তোমাদেরই মানুষ।
রিহান হতবুদ্ধি হয়ে গ্রুস্তানের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু গ্রুস্তান সুযোগ দিল না, শেকলে টান দিয়ে বলল, চল। তাড়াতাড়ি।
রিহান কন্টেইনারের বাইরে পা দিয়ে চারদিকে তাকায়। ট্রাকগুলো গোল করে সাজানো হয়েছে। মানুষেরা অস্ত্র হাতে ছোটাছুটি করছে। একটা ট্রাকের ছাদে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ বাইনোকুলার দিয়ে দূরে দেখার চেষ্টা করছে। রিহান কান পেতে অনেক দূর থেকে ভেসে আসা মোটরবাইকের ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন শুনতে পায়, মনে হয় বেশ বড় একটা বহর এদিকে আসছে।
গ্রুস্তান একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের হাতে রিহানের শিকলটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, একে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও। ফ্রন্ট লাইনে কোনোকিছুর সাথে বেঁধে রেখো।
ঠিক আছে।
এর কাছাকাছি থেকে তোমরা।
থাকব।
মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে একটু নার্ভাস দেখায়, সে কাঁপা গলায় বলল, ঈশ্বরী প্রিমা কী বলেছেন?
এখনো কিছু বলেন নি। তোমরা ফ্রন্ট লাইনে চলে যাও ঈশ্বরীর নির্দেশ আসা মাত্রই জানিয়ে দেব।
ঠিক আছে।
মধ্যবয়স্ক মানুষ দুজন কঠোর চেহারার মেয়েকে নিয়ে সামনের দিকে হেঁটে যেতে থাকে। রিহানের পায়ে বাধা শিকলটা গুটিয়ে নিয়ে একজন মেয়ে তার হাতে একটা মাঝারি শক্তির স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে বলল, এটা হাতে রাখ। ফ্রন্ট লাইনে গিয়ে কেমন করে চালাতে হয় শিখিয়ে দেব।
