বলেন, কী কাজ।
কম্পিউটারে আমার কিছু কাজ ছিল, আমি সেখানে শারমিনের একটু হেল্প নিতে চাই।
বাবা হেসে ফেলল। বলল, শারমিন আপনাকে সাহায্য করতে পারবে? ও তো জীবনে কম্পিউটার দেখেই নাই।
রাফি বলল, সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। তাকে যতটুকু শেখাতে হবে, আমি সেটা শেখাব।
বাবা শারমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, এই মেয়ে তো আপনার কাছে যাওয়ার জন্যে একপায়ে খাড়া। আপনি প্রথম তার ক্ষমতাটা বের করেছেন—আপনি তার ব্রেনের সমস্যা দূর করে লেখাপড়া করতে শিখিয়েছেন, আপনি তাকে বইপত্র পড়তে দিচ্ছেন, সেদিন আপনি আপনার কম্পিউটার তাকে ব্যবহার করতে দিলেন—সবই তো আপনিই করেছেন। এই মেয়ে যতখানি আমার, ততখানি আপনার।
গুড। আপনার মেয়ের ব্রেনটাকে আমি আজকে আর কালকে একটু ব্যবহার করব!
কোনো সমস্যা নাই।
রাফি বলল, শুধু একটা ব্যাপার।
কী ব্যাপার? আমি যে শারমিনকে দিয়ে এসব কাজ করাচ্ছি, আপনি সেগুলো কাউকে বলবেন না।
শারমিনের বাবা বলল, মাথা খারাপ! ভোটকা হান্নানের পর আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি কাউকে কিছু বলি না।
হ্যাঁ, বলার দরকার নেই।
রাফি তখন তখনই শারমিনকে নিয়ে বের হতে চাইছিল, কিন্তু তাকে চা খেতে হলো এবং একটু পায়েস খেতে হলো। পায়েস রাফির প্রিয় খাবার নয়, গরিব মানুষের ঘরের পায়েসও ভালো হয় না, কিন্তু রাফি অবাক হয়ে দেখল, পায়েসটা চমৎকার।
রিকশায় উঠে রাফি শারমিনকে বলল, আমি তোমাকে এখন যে কথাগুলো বলব, তুমি সে কথাগুলো কাউকে বলবে না।
শারমিন মুখ শক্ত করে বাধ্য মেয়ের মতো বলল, বলব না।
তুমি ছোট একটি মেয়ে, কিন্তু এখন আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব বড় মানুষের মতো। বুঝেছ?
শারমিন মাথা নাড়ল। রাফি বলল, আমাদের দেশে এনডেভার নামে একটা কম্পিউটারের কোম্পানি এসেছে বিশেষ এক ধরনের কম্পিউটার বানানোর জন্য। মানুষের ব্রেন যেভাবে কাজ করে, এই কম্পিউটারগুলো সেভাবে কাজ করবে। কিন্তু এরা কম্পিউটার না বানিয়ে কী করছে, জানো?
কী?
সত্যি সত্যি মানুষকে ধরে নিয়ে তাদের ব্রেন দিয়ে কম্পিউটার বানাচ্ছে।
শারমিন চমকে উঠে বলল, সর্বনাশ!
হ্যাঁ, সর্বনাশ! রাফি বলল, ঢাকা থেকে একজন সাংবাদিক আপা এসেছিল, মনে আছে তোমার?
হ্যাঁ, ঈশিতা আপু।
সেই ঈশিতা আপু এই জিনিসটা জানতে পেরেছে, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কি, জানো?
কী?
সেটা কোনোভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। আর প্রমাণ করা না গেলে এনডেভারকে ধরা যাচ্ছে না। আর এনডেভারকে ধরা না গেলে তারা এ দেশে বসে গরিব মানুষের বাচ্চা-কাচ্চাকে ধরে ধরে তাদের ব্রেনকে ব্যবহার করবে। বুঝছো?
শারমিন মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি।
এখন আমি তোমাকে কেন নিয়ে এসেছি, বুঝেছো?
শারমিন মাথা নাড়ল, বলল, না, বুঝি নাই।
তুমি এনডেভারের ওয়েবসাইটে ঢুকবে। তখন আমরা সেখান থেকে এনডেভারের সব তথ্য বের করে আনব।
আমি পারব?
হ্যাঁ, পারবে। আমি তোমাকে বলে দেব, কী করতে হবে। একটা ওয়েবসাইটে ঢুকতে হলে কিছু বেআইনি কাজ করতে হয়। আমরা সেই বেআইনি কাজ করব, কেউ জানবে না সেটা তুমি করেছ। যদি জানতেও পারে, সেটা হবে আমার কম্পিউটার। কাজেই দোষ হলে সেটা হবে আমার। তোমার কোনো ভয় নেই।
শারমিন হেসে বলল, আমার কথা জানলেও ক্ষতি নাই! আমি ভয় পাই।
তার পরও তোমাকে এই ঝামেলা থেকে দূরে রাখব। মাঝে মাঝে কিছু জটিল সমস্যা থাকবে, তোমাকে তার সমাধান করে দিতে হবে।
কী রকম সমস্যা?
তুমি এর মধ্যে এগুলো করেছ। বড় একটা সংখ্যাকে দুটি উৎপাদকে। বের করা। কিংবা একটা পাসওয়ার্ডকে গোপন করে রাখা আছে, সেটা বের করা। এ রকম কাজ—অন্য যেকোনো মানুষের জন্য সেটা অসম্ভব, কিন্তু আমার ধারণা, তুমি পারবে।
ছুটির দিন বলে ইউনিভার্সিটিতে মানুষজন খুব বেশি নেই। রাফি শারমিনকে নিয়ে তাদের নেটওয়ার্কিং ল্যাবে ঢুকল। বিকেলের দিকে এই ল্যাবে কাজ করার জন্য কিছু ছাত্র আসে, এখন কেউ নেই। কেউ আসার আগে রাফি এনডেভারের ওয়েবসাইটটা হ্যাক করে ফেলতে চায়। _ শারমিনকে বিষয়টা বোঝাতে খুব বেশি সময় লাগল না। কোথা থেকে হ্যাক করছে, যেন জানতে না পারে, সে জন্য আইপি অ্যাড্রেসটাকে একটু পরে পরে বানোয়াট আইপি অ্যাড্রেস দিয়ে পাল্টে দিতে হচ্ছিল। সিকিউরিটি অসম্ভব কঠিন। একবার মনে হচ্ছিল বুঝি, ডেটাবেসে ঢোকাই যাবে না, কিন্তু শারমিন কীভাবে জানি ঢুকে গেল। সেখানে সিকিউরিটির নানা পর্যায়ের এনক্রিপটেড সংখ্যাগুলো পাওয়া গেল। শারমিন সেগুলো নিয়ে কাজ করতে থাকে। একটা সুপার কম্পিউটার কয়েক মাস চেষ্টা করে যেটা বের করতে পারত, শারমিন ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সেটা করে ফেলল। শারমিন যদিও রাফিকে কিছু বলল না, কিন্তু রাফি বুঝতে পারল, তার অসম্ভব পরিশ্রম হয়েছে। সে যখন কম্পিউটার মনিটরে দীর্ঘ সংখ্যাগুলোর দিকে একদৃষ্টে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে, তখন তাকে দেখে মনে হয়, সে বুঝি অন্য জগতের মানুষ। তার চোখমুখ কঠিন হয়ে যায়, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয় এবং কখনো কখনো দুই হাত দিয়ে তার মাথা চেপে ধরে রাখে। রাফির ভয় হয়, এই অমানুষিক একটা কাজ করতে গিয়ে তার মাথার ভেতরে রক্তের কোনো ধমনি না ছিঁড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত এনক্রিপশনটা ভেঙে শারমিন বলল, স্যার, এই যে এটা করেছি। দেখেছেন, হয়েছে কি না?
দেখছি। তুমি একটু রেস্ট নাও।
আগে দেখেন, যদি হয়ে থাকে তাহলে রেস্ট নেব।
