মানুষের ব্রেনের ভেতরে কিছু একটা করে?
হ্যাঁ। যাদের ধরে নিয়েছে তাদের প্রথমবার ব্যবহার করেছে। সাকসেসফুল এক্সপেরিমেন্ট!
রাফি লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন তোমার কী প্ল্যান?
এনডেভারকে ধরিয়ে দেওয়া।
কীভাবে ধরাবে?
জানি না। কেউ আমার একটা কথাও বিশ্বাস করবে না। তার কারণ সবই আমার স্পেকুলেশন, না হয় শোনা কথা। আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। সারা দেশে এনডেভারের গুড উইল খুব উঁচুতে। কেউ যদি এনডেভারের বিরুদ্ধে একটা কথা বলে সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষ তাকে ক্রিমিনাল হিসেবে ধরে নেবে। সবচেয়ে বড় কথা—
কী সবচেয়ে বড় কথা?
এনডেভার টাকা দিয়ে অনেক বড় বড় লোককে কিনে নিয়েছে। ইন্টেলিজেন্সের লোকজন তাদের পক্ষে কাজ করছে। আমি কাউকে সন্দেহের কথাটা বলতেও পারব না। বলামাত্রই আমাকে খুন করে ফেলবে।
রাফি তার গাল ঘষতে ঘষতে বলল, তাহলে?
আমার প্রমাণ দরকার। প্রমাণ প্রমাণের জন্য আমার এনডেভারের ভেতরে ঢোকা দরকার। নিজের চোখে সবকিছু দেখা দরকার। ফটো তোলা দরকার, ভিডিও করা দরকার।
তুমি কেমন করে এনডেভারের ভেতরে ঢুকবে?
জানি না। এর থেকে বাঘের খাঁচায় ঢোকা বেশি সহজ আর বেশি নিরাপদ।
সেটা ঠিকই বলেছ।
যাই হোক রাফি, আমি টেলিফোনটা রাখি। তোমার সঙ্গে কথা বলে বুকটা একটু হালকা হলো। তুমি চিন্তা করে আমাকে একটু আইডিয়া দাও। ওপরের দিকে তোমার যদি লাইনঘাট থাকে আমাকে জানিও।
রাফি বলল, সরি ঈশিতা। ওপরের দিকে আমার কোনো লাইনঘাট নেই।
তাহলে চিন্তা করে একটা আইডিয়া দাও।
ঠিক আছে।
বাই রাফি।
বাই ঈশিতা। ভালো থেকো।
টুক করে লাইনটা কেটে গেল।
রাফি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। সে টের পাচ্ছিল তার শরীরের ভেতর এক ধরনের ক্রোধ পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে। এনডেভারের মতো একটা প্রতিষ্ঠান এই দেশে এসেছে মানুষের মস্তিষ্কের জন্য, তারা কেটেকুটে ইলেকট্রনিক ইমপ্লান্ট বসিয়ে এক ধরনের নিউরাল কম্পিউটার তৈরি করবে। কিন্তু সেই কথাটা তারা কাউকে জানাতেও পারবে না, এটি কী রকম কথা?
রাফি ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তার এই ছোট বাসাটার সামনে এক চিলতে বারান্দা আছে, সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায়। রাফি দেখল, আকাশে মেঘ এবং সেই মেঘের মাঝে বিদ্যুৎ খেলা করছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে এবং সেখান থেকে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে তার শরীরকে শীতল করে দিল। ঠিক তখন তার শারমিনের কথা মনে পড়ল! শারমিনকে ঠিক করে ব্যবহার করতে পারলে সে নিশ্চয়ই এনডেভারের ডেটাবেসে ঢুকে সব তথ্য বের করে আনতে পারবে! ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অসম্ভব, কিন্তু শারমিনের পক্ষে এটি সম্ভব হতে পারে। সারা পৃথিবীতে মনে হয় শুধু এই বাচ্চা মেয়েটিই এই অসম্ভব। কাজটি করতে পারবে। রাফির মনে হলো যে এক্ষুনি ফোন করে সে ঈশিতাকে কথাটা বলে, কিন্তু ঘড়ি দেখে সে শেষ পর্যন্ত ফোন করল না। তা ছাড়া ঈশিতা তার টেলিফোন নিয়ে যে রকম ভয়ভীতি দেখিয়েছে এভাবে হুঁট করে ফোন করা হয়তো ঠিকও হবে না। কাল পরশু উইকএন্ড, ইউনিভার্সিটি বন্ধ, কাজেই শারমিনকে নিয়ে সে এনডেভারের সাইটটাকে হ্যাক করার চেষ্টা করবে! যদি সত্যি সত্যি করতে পারে তাহলে ঈশিতার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ভোরবেলা তারা শারমিনের বাসাটি খুঁজে বের করতে হবে-কাজটি খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়।
রাফির মস্তিষ্ক নিশ্চয়ই উত্তেজিত হয়েছিল। কারণ, সারা রাত সে এনডেভারের ওয়েবসাইট স্বপ্নে দেখল। তার ভেতরে গোলকধাঁধার মতো একটা জায়গায় শারমিন আর সে আটকা পড়ে গেছে; বের হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু বের হতে পারছে না। সে শুনতে পাচ্ছে, ঈশিতা চিৎকার করছে, কিন্তু সে তার কাছে যেতে পারছে না। বারবার চেষ্টা করছে, কিন্তু অদৃশ্য একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দ্রুত নাশতা করে রাফি বের হয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসের দারোয়ানদের জিজ্ঞেস করতেই তারা শারমিনের বাসার ঠিকানা বলে দিল। রাফি রিকশা করে সেখানে হাজির হলো। ছোট টিনের ছাপড়া ঘর। কাছাকাছি। অনেক বাসা, বাইরে ছোট ছোট বাচ্চারা ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে খেলছে। শারমিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন রাফিকে তাদের বাসায় নিয়ে গেল।
শারমিন তার মায়ের সঙ্গে কলতলায় বসে থালা-বাসন ধুচ্ছিল। রাফিকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, আনন্দে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, স্যার! আপনি এসেছেন।
রাফি বলল, হ্যাঁ, আমি এসেছি। শারমিন তার মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, মা, যে স্যার আমাকে লাল রঙের চশমা দিয়ে পড়ালেখা করতে শিখিয়েছেন, ইনিই হচ্ছেন সেই স্যার।
মা শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে হাসিমুখে বললেন, আপনার লেখাপড়া শেখা মেয়ে এখন দিনরাত খালি পড়ে আর পড়ে। সংসারের কোনো কাজ করতে চায় না।
রাফি ঠিক বুঝতে পারল না এই মহিলার কি তার মেয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কি না সে হাসি হাসি মুখ করে বলল, ভালো তো! যত পড়বে তত শিখবে!
মা বললেন, আমরা গরিব ঘরের মানুষ। আমাদের এত লেখাপড়ার দরকার কী!
রাফি বলল, কী বলেন আপনি? শারমিন কত ব্রাইট একটা মেয়ে, আপনি জানেন, দেখবেন, সে কত বড় হবে!
রাফির গলার স্বর শুনে ভেতর থেকে শারমিনের বাবা বের হয়ে এল, খুব ব্যস্ত হয়ে ভেতর থেকে একটা কাঠের চেয়ার টেনে এনে তাকে বসতে দিল। রাফি চেয়ারে বসে বলল, আমি একটা কাজে এসেছি।
