রাফি কাঁপা হাতে দুই শ পঞ্চাশ ঘর লম্বা একটা সংখ্যা খুব সাবধানে প্রবেশ করাল। কয়েক মুহূর্তের জন্য কম্পিউটার মনিটরটি স্থির হয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ করে তার সামনে এটি উন্মুক্ত হয়ে যায়। রাফি নিঃশ্বাস বন্ধ করে কি-বোর্ডে দু-একটি অক্ষর লিখে পরীক্ষা করে। শারমিন উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, হয়েছে?
হ্যাঁ, হয়েছে। রাফি শারমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, চমৎকার শারমিন। ফ্যান্টাস্টিক। রাফি দেখল, শারমিনের মাথাটা আগুনের মতো গরম হয়ে আছে, কী আশ্চর্য!
শারমিন দুর্বল গলায় বলল, আমি একটু বিশ্রাম নিই?
নাও।
রাফির কথা শেষ হওয়ার আগেই শারমিন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। রাফি শারমিনকে ধরে ল্যাবের পেছনে রাখা সোফায় শুইয়ে দিল। তারপর নিঃশব্দে সে নিজে এনডেভারের ডেটাবেসে ঘুরে বেড়াল। অত্যন্ত জটিল একটি সিস্টেম। প্রতিটি মানুষের সব তথ্য রয়েছে। কোন মানুষের কতটুকু সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স, তা ঠিক করে দেওয়া আছে। পুরো বিল্ডিংটি অসংখ্য সিসি ক্যামেরা দিয়ে নজরে রাখা হয়েছে। ইচ্ছে করলে সে যেকোনো কিছু দেখতে পারে। রাফি ইচ্ছে করলে এখন যেটা ইচ্ছে সেটা পরিবর্তন করে দিতে পারে, কিন্তু সে কোনো কিছু স্পর্শ করল না। এনডেভারের কেউ যেন বুঝতে না পারে, সে ভেতরে ঢুকেছিল, সে জন্য তার কোনো চিহ্ন না রেখে সে আবার বের হয়ে এল।
শারমিন ঘণ্টা খানেক পর হঠাৎ করে জেগে উঠে এদিক-সেদিক তাকাতে থাকে। তাকে দেখে মনে হয়, সে বুঝতে পারছে না, সে কোথায়। রাফি বলল, কী হলো, শারমিন, তোমার ঘুম ভাঙল?
শারমিন লাজুক মুখে বলল, হায় খোদা! আমি কতক্ষণ ঘুমিয়েছি?
প্রায় এক ঘণ্টা।
এক ঘণ্টা! স্যার, আপনি আমাকে জাগিয়ে দিলেন না কেন?
রাফি বলল, তোমার ঘুমটার দরকার ছিল। মানুষের ব্রেন কীভাবে কাজ করে, এখনো মানুষ জানে না। আর তোমার মতো ব্রেন সম্পর্কে তো আরও কিছু জানে না। তুমি যখন ওই অসাধ্য কাজটা করেছ, তখন তোমার ব্রেনে খুব চাপ পড়েছে। তাই ঘুমটার দরকার ছিল।
শারমিন কিছু বলল না, মাথা নাড়ল। রাফি বলল, আমার অনুমান যদি ঠিক হয়, তাহলে তোমার অসম্ভব খিদে পাওয়ার কথা।
শারমিন আবার মাথা নাড়ল। রাফি বলল, আমার আগেই বিষয়টা খেয়াল করা উচিত ছিল। তোমার জন্য কিছু খাবার আনা উচিত ছিল।
শারমিন বলল, না না। লাগবে না। আমি বাসায় গিয়ে খাব।
বাসায় গিয়ে নিশ্চয়ই খাবে। তার আগে চলো, আমি আর তুমি অন্য কিছু খাই। আজ তো ছুটির দিন, ক্যাম্পাসে ক্যানটিন বন্ধ। বাইরে গিয়ে খেতে হবে। বলো শারমিন, তুমি কী খেতে চাও। তুমি যত বড় কাজ করে দিয়েছ, তোমাকে ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে খাওয়ানো উচিত!
শারমিন বলল, কাজ হয়েছে, স্যার?
তুমি এনডেভারে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ, এখন কাজ হবে। কঠিন কাজটা শেষ। এখন বাকি শুধু ছোট ছোট কাজ। সেখানেও তোমাকে লাগবে। কালকে আবার বসব। ঠিক আছে?
ঠিক আছে।
শারমিনকে নিয়ে একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে রাফি ঈশিতাকে ফোন করল। ঈশিতা ফোন ধরল না। কিন্তু এক মিনিটের মধ্যে অন্য একটা নাম্বার থেকে তাকে ফোন করল। রাফি বলল, ঈশিতা, তুমি কোথায়?
অফিসে।
তুমি এই মুহূর্তে এখানে চলে আসো।
এই মুহূর্তে তো পারব না। আসতে আসতে কাল ভোর হয়ে যাবে। রাফি বলল, ঠিক আছে। কাল ভোরের ভেতর আসো।
কেন, বলবে?
না। শুধু জেনে রাখো, তোমার সমস্যার সমাধান হয়েছে।
আমি আসছি।
ঈশিতা খুট করে লাইন কেটে দিল।
০৭. নেটওয়ার্কিং ল্যাবের এক কোণায়
নেটওয়ার্কিং ল্যাবের এক কোণায় রাফি ঈশিতা আর শারমিনকে নিয়ে বসেছে। এটি একটা রিসার্চ ল্যাব, যেকোনো মুহূর্তে কোনো একজন শিক্ষক বা ছাত্র চলে আসতে পারে। কেউ এলেই তারা সৌজন্য দেখানোর জন্য। তাদের কাছে আসবে, কথা বলবে। ছুটির দিন ভোরবেলায় ঢাকার একজন সাংবাদিক এবং বাচ্চা একটা মেয়েকে নিয়ে রাফি কী করছে, সেটা জানার জন্য হালকা কৌতূহল দেখাবে। তখন তাদের কী বলা হবে, সেটা আগে থেকে ঠিক করে রাখা আছে। ডিসলেক্সিয়া আছে, এ রকম বাচ্চা-কাচ্চাদের লেখাপড়া নিয়ে ঈশিতা একটা রিপোর্টিং করবে এবং তার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা হচ্ছে। তাদের বলা হবে, পদ্ধতিগুলো কাজ করে কি না, সেগুলো সরাসরি শারমিনকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হচ্ছে—বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্য করানোর জন্য এ ধরনের বেশ কিছু ওয়েবসাইট খুলে রাখা হয়েছে এবং কিছু কাগজও প্রিন্ট করে রাখা আছে। এই ল্যাবে না বসে তারা দরজা বন্ধ করে রাফির অফিসে বসতে পারত, কিন্তু রাফি বড় ব্যান্ড উইথ নিশ্চিত করার জন্য এই ল্যাবে বসেছে।
ল্যাবের ভেতরে এখনো অন্য কোনো শিক্ষক বা ছাত্র আসেনি, তাই তারা মোটামটি কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই কাজ করতে পারছে। রাফি এইমাত্র ঈশিতাকে এনডেভারের পুরো সাইটটা দেখিয়েছে, যারা কাজকর্ম করে, তাদের নানা ধরনের তথ্যে চোখ বুলিয়ে তারা এখন হাসপাতালের বিভিন্ন ঘরে রোগীদের প্রোফাইল দেখছিল। দোতলাটি মূল হাসপাতাল, তিন তলার কিছু ঘরে বিশেষ কয়েকজন রোগী। তাদের সারা শরীর নানা ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। মুখে মাস্ক, অক্সিজেন টিউব, মাথার চুল কামানো, সেখানে নানা ধরনের টিউব ও মনিটর। চারপাশে নানা আকারের স্ক্রিনে নানা ধরনের তরঙ্গ এবং সংখ্যা জ্বলজ্বল করছে। ঈশিতা নিঃশ্বাস আটকে বলল, এদের ভেতর একজন নিশ্চয়ই মকবুল নামের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি।
