শারমিন ভয়ে ভয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল। রাফি গম্ভীর মুখে বলল, তবে তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ তো, তোমার যে এ রকম ক্ষমতা আছে সেটা তুমি কাউকে বলবে না।
বলব না।
তোমার আব্বুকেও বলবে না।
বলব না।
আম্মুকে না, ভাইবোন কাউকে না।
আম্মুকে না। ভাইবোনকে না।
স্কুলের টিচার, বন্ধুবান্ধব কাউকে বলবে না।
বলব না, কাউকে বলব না।
গুড।
শারমিন দাঁড়িয়ে বলল, আমি তাহলে এখন যাই?
যাও। শারমিন, আবার দেখা হবে।
শারমিন শুকনো মুখে বের হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে তার অস্বাভাবিক একটা ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতাটা তার জন্য ভালো হলো, না খারাপ হলো সেটা এখন আর সে বুঝতে পারছে না।
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে রাফির একটা টেলিফোন এল। অপরিচিত নম্বর। এত রাতে কে ফোন করেছে ভাবতে ভাবতে রাফি টেলিফোন ধরল, হ্যালো।
রাফি? আমি ঈশিতা। এত রাতে ফোন করলাম কিছু মনে কোরো না।
মনে করার কী আছে? যতক্ষণ জেগে আছি, ফোন ধরা সমস্যা নয়। ঘুমিয়ে পড়লে অন্য কথা। কী ব্যাপার? তোমার নিজের ফোন কী হলো? কোথা থেকে ফোন করছ?
আমার ফোন ট্যাপ করছে, তাই ওটা ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছি। ওই ফোন থেকে যাকে ফোন করি, তার বারোটা বেজে যায়।
কী বলছ বুঝতে পারছি না।
প্রত্যেক দিন একটা করে নতুন সিম জোগাড় করি, কয়েকবার ব্যবহার করে ফেলে দিই! এখন বুঝতে পারছি জঙ্গিদের এতগুলো করে সিম থাকে কেন!
রাফি ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি তো আমাকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিলে! এ চিন্তারই ব্যাপার। যাই হোক, কদিন থেকে খুব চাপের মধ্যে আছি—কারও সঙ্গে কথা বলে একটু হালকা হওয়ার ইচ্ছে করছিল। সেই জন্য তোমাকে ফোন করেছি। একটু কথা বলি তোমার সঙ্গে?
বলো।
শারমিন কেমন আছে?
ভালো। আমরা শুধু তার ম্যাথ ক্যাপাবিলিটি দেখেছি। কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দিলে সে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। না বুঝে সে ওয়েবসাইট হ্যাক করে ফেলতে পারে।
সত্যি?
হ্যাঁ। কীভাবে করে সেটা একটা মিষ্ট্রি। যাই হোক, তোমার কথা শুনি। তুমি কী নিয়ে এত চাপের মধ্যে আছ?
ঈশিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ, আমার মনে হয় তোমাদের মতো কয়েকজনকে বিষয়টা বলে রাখা ভালো। আমার যদি কিছু হয় তাহলে তোমরা যেন জানো তোমাদের কী করতে হবে।
তোমার কিছু একটা হবে কেন? কী হবে?
বলছি। তোমাকে এনডেভারের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?
হ্যাঁ মনে আছে।
তোমাদের বায়োকেমিস্ট্রির টিচার সমীরের এফটি টুয়েন্টি সিক্স ভাইরাসের কথা মনে আছে?
রাফি বলল, মনে আছে।
টিঅ্যান্ডটি বস্তিতে সেই ভাইরাসের এপিডেমিক হলো মনে আছে?
হ্যাঁ, মনে আছে। এনডেভারে তাদের চিকিৎসা হচ্ছে।
আমার হাইপোথিসিস এ রকম। এনডেভার যে নিউরাল কম্পিউটারের কথা বলে, সেটা আসলে ভাঁওতাবাজি। তারা নিউরাল কম্পিউটার তৈরি করে সত্যিকারের মানুষ দিয়ে। মানুষের ব্রেনে তারা কিছু একটা করে তাকে কম্পিউটার হিসেবে ব্যবহার করে।
রাফি বলল, ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কিন্তু বলতে থাকো।
কাজেই এনডেভারের হাইফাই মাইক্রোপ্রসেসর মেমোরির দরকার নেই। তাদের দরকার মানুষ। মানুষের ব্রেন। তাই তারা এসেছে বাংলাদেশে। তাদের ধারণা, এই দেশের গরিব মানুষের ব্রেন তারা ব্যবহার করতে পারবে। তারা শুরুও করেছে।
রাফি বলল, তোমার ধারণা এফটি টুয়েন্টি সিক্স ভাইরাসটা এনডেভার ছড়িয়েছে?
এক্সাক্টলি। যারা এফেক্টেড হয়েছে তাদের চিকিৎসার নাম করে নিজেদের বিল্ডিংয়ে নিয়ে গেছে। কাউকে কাউকে ভালো বলে ছেড়ে দিচ্ছে। কাউকে কাউকে রেখে দিচ্ছে।
রেখে দিচ্ছে মানে? বস্তির মানুষ গরিব থাকতে পারে, তাই বলে নিজের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজনকে রেখে দেবে? মারাও যদি যায় তাহলেও তো ডেডবডি এনে জানাজা পড়াবে।
ঈশিতা বলল, সেটা সত্যি। আর এ রকম একটা ব্যাপার দিয়েই আমি নিশ্চিত হয়েছি।
কীভাবে।
একজন মহিলার বাচ্চার কোনো খোঁজ নেই। মহিলা বলছে এনডেভারের অ্যাম্বুলেন্স তাকে নিয়ে গেছে। কিন্তু রোগীর লিস্টে তার নাম নেই। মহিলা যখন চেঁচামেচি শুরু করেছে, তখন তাকে মেরে ফেলল।
কী বললে? রাফি আর্তনাদ করে বলল, মেরে ফেলল?
হ্যাঁ। পত্রিকায় খবর এসেছে সুইসাইড, কিন্তু আমি জানি এটা মার্ডার। আমার কাছে বাচ্চার একটা ছবি আছে। মহিলা মারা যাওয়ার আগে তার কাছ থেকে নিয়েছি। আমি খোঁজ নিয়ে কনফার্মড হয়েছি, বাচ্চাটা ভেতরে আছে। ডিপ কোমায়—কিন্তু বেঁচে আছে।
তুমি কেমন করে কনফার্মড হলে?
সেটা অনেক লম্বা স্টোরি। তোমার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হলে সেটা বলব! খুবই ইন্টারেস্টিং স্টোরি।
রাফি বলল, ঈশিতা। আমি তোমাকে যতই দেখছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি।
ঈশিতা হাসল, বলল তুমি আর আমাকে কখন দেখেছ? বলো, যতই শুনছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি।
ঠিক আছে, যতই শুনছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। যাই হোক ঈশিতা, ড়ু ইউ নো—
নো হোয়াট?
এখন আমার মনে হচ্ছে তোমার হাইপোথিসিস সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তার কারণ—
কারণ?
টিঅ্যান্ডটি বস্তিতে বাচ্চাদের ভাইরাস ইনফেকশনের পর যখন তাদের এনডেভারে নিয়ে গেছে, তার পরপরই একটা প্রেস রিলিজ দিয়েছে। সেই প্রেস রিলিজে–
ঈশিতা রাফিকে কথা শেষ না করতে দিয়ে বলল, আমিও তোমাকে সেই কথাটা বলতে যাচ্ছিলাম। তারা এনাউন্স করেছে নিউরাল কম্পিউটারে তারা একটা মাইলফলক অতিক্রম করেছে। কীভাবে করেছে বুঝতে পারছ তো?
